ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই: ড. আবদুল মঈন খান স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নেই: মীর শাহে আলম দুপুরের মধ্যেই বিদ্যুৎ পাচ্ছে বাংলাদেশ: কমবে লোডশেডিং এমপিও শিক্ষকদের নির্বাচন ভাগ্য নির্ধারণ করবে ইসি: মীর শাহে আলম সরকারি কেনাকাটায় পুকুরচুরি ঠেকাতে আসছে অভিন্ন একক দরতালিকা সাগর-রুনি হত্যার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ তারুণ্য না অভিজ্ঞতা: ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব চয়নে জটিল হিসাব-নিকাশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জের রিট খারিজ হাইকোর্টে ইন্দোনেশিয়ায় ২৪০ যাত্রী নিয়ে জাহাজ নিখোঁজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, আটক ২

গণমাধ্যমে তীব্র আতঙ্ক

ফোন দিয়ে সাংবাদিকদের রাজনৈতিক পরিচয় কেন জানতে চাচ্ছে পুলিশ?


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ২১ মে, ২০২৬ সময় : ৯:৩৪ এএম

রাজধানী ঢাকায় কর্মরত একাধিক পেশাদার সাংবাদিকের রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যক্তিগত আইডি বা লিংক, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং বিদ্যুৎ বিলের কপিসহ নানা সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করছে পুলিশ। পুলিশের বিশেষ শাখার (সিটি স্পেশাল ব্রাঞ্চ-সিএসবি) চিঠির ভিত্তিতে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা সাংবাদিকদের ফোন করে অথবা সরাসরি তাদের বাসায় গিয়ে এসব তথ্য চাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা সিটিএসবির মাঠপর্যায়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে মুঠোফোনে চরম অপেশাদার, হুমকিস্বরূপ এবং আক্রমণাত্মক সুরে কথা বলার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার পর থেকে পুলিশ সদস্য পরিচয়ে ফোন পাওয়া গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ, গভীর উদ্বেগ এবং নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের সিটি স্পেশাল ব্রাঞ্চের পূর্ব বিভাগের পক্ষ থেকে মতিঝিল, তেজগাঁও, শাহবাগ, সূত্রাপুর, পল্টন ও সবুজবাগ জোন ইনচার্জদের কাছে একটি বিশেষ গোপন চিঠি পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় কর্মরত সাংবাদিক এবং ‘সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের’ বিস্তারিত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক তথ্য পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে উল্লেখিত চাহিদার মধ্যে রয়েছে সাংবাদিকদের নাম-ঠিকানা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচিতি বা অতীতের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, সাংবাদিকতার বাইরে অন্য কোনো পেশা বা ব্যবসার বিবরণ, পারিবারিক বৃত্তান্ত এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারিত লিংক।

এই ধরনের নজিরবিহীন উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করে এবং গভীর অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আসিফ শওকত কল্লোল বলেন, তার ২৫ বছরের দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে পুলিশের পক্ষ থেকে এমন প্রশ্নের মুখোমুখি কখনো হতে হয়নি। তিনি বর্তমানে মিরর এশিয়ার হেড অব নিউজের দায়িত্বে রয়েছেন এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)-সহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। তিনি বলেন, পুলিশ তার বাসায় এসে তার বাবার রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চেয়েছে, যা অত্যন্ত ভয়ংকর একটি নজির। এটি কোনোভাবেই পুলিশের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না এবং কোনো সাংবাদিক বা নাগরিক এই তথ্য দিতে বাধ্য নন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাংবাদিকদের যাবতীয় তথ্য সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ে সংরক্ষিত থাকে। কোনো প্রয়োজনে তথ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিক সংগঠনের সহায়তা নিতে পারত। কিন্তু তা না করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে পুলিশ কেন সাড়ে তিন-শ' সাংবাদিকের তালিকা করে এমন হয়রানিমূলক ও অপেশাদার প্রশ্ন করছে, তা অত্যন্ত রহস্যজনক। এটি সরাসরি সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর বড় ধরনের আঘাত।

একইভাবে একটি বহুল প্রচারিত বেসরকারি টেলিভিশনের একজন বিশেষ সংবাদদাতা তার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, তাকে ফোন করে সরাসরি জানতে চাওয়া হয়েছে তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত কি না কিংবা অতীতে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন কি না। পুলিশের প্রশ্নের ধরন ছিল পুরোপুরি অপরাধীদের জিজ্ঞাসাবাদের মতো, যা তাকে চরমভাবে আতঙ্কিত করে তুলেছে। অতীতে বহু ভিভিআইপি ও ভিআইপি অনুষ্ঠান কাভার করার সুবাদে পুলিশের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলেও, কখনো এমন অপেশাদার ও আক্রমণাত্মক আচরণের মুখোমুখি হতে হয়নি।

অন্য একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জানান, পুলিশ সদস্য পরিচয়ে ফোন করে তাকে অফিসের বাইরে শুধু তার বাসায় গিয়েই কথা বলার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে বাসায় যাওয়ার আগে এনআইডি, ছবি এবং বিদ্যুৎ বিলের কপি প্রস্তুত রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত হুমকিস্বরূপ মনে হয়েছে। এছাড়া একটি ইংরেজি দৈনিকের একজন জ্যেষ্ঠ নারী সাংবাদিক জানান, তাদের অফিসের তিনজনকে ফোন করে একইভাবে তথ্য চাওয়া হয়েছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সাংবাদিকদের মূল কাজই হলো বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম কাভার করা। সেটাকে কোনোভাবেই কোনো সাংবাদিকের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পরিচয় হিসেবে মূল্যায়ন করার সুযোগ নেই। এই ধরনের ঢালাও তথ্য সংগ্রহ মূলত ভবিষ্যতে সাংবাদিকদের ওপর নজরদারি ও হয়রানির একটি বিপজ্জনক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

সাংবাদিক সংগঠনের শীর্ষ নেতারা এই পন্থায় সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহ করার বিষয়টিকে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার এবং গণমাধ্যমের মধ্যে ভয়-ভীতি ছড়িয়ে দেওয়ার একটি সুদূরপ্রসারী অপচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া এই বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাষ্ট্রের কোনো বিশেষ সংস্থা এভাবে সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাইতে পারে না। এটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পরিপন্থি এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। যদি সরকারের এমন কোনো সিদ্ধান্ত থাকত, তবে তারা যথাযথ পরিপত্র জারি করে কিংবা অফিসে ফরম পাঠিয়ে নিয়মমাফিক তথ্য নিতে পারত। কিন্তু বিশেষ সংস্থা দিয়ে বাসায় গিয়ে বা ফোনে ইন্টারভিউ নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনি আরও মনে করিয়ে দেন যে, রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকা আর সক্রিয় রাজনীতি করা এক বিষয় নয় এবং সাংবাদিকদের মূল কাজ রাজনীতি করা নয়।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) সভাপতি আবু সালেহ আকন জানান, তাকেও ফোন করা হয়েছিল কিন্তু ব্যস্ততার কারণে তিনি সাক্ষাৎ করেননি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বর্তমান রাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত সরকারের আমলে কেন সাংবাদিকদের রাজনৈতিক পরিচয় ও বিদ্যুৎ বিলের কপি চাওয়া হবে? বিগত স্বৈরাচারী আমলে ঢালাওভাবে দলীয় নেতাকর্মীদের পুলিশে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তাদের কেউ সরকারের অজান্তে কোনো নেতিবাচক উদ্দেশ্যে এটি করছে কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার। তবে উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন, যদি এর পেছনে কোনো ক্ষতিকর অভিসন্ধি থাকে, তবে সাংবাদিকদের সুরক্ষায় অতীতের মতো ডিআরইউ কঠোর প্রতিরোধ ও প্রতিবাদ গড়ে তুলবে। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি সাজ্জাদ আলম খান তপু বলেন, জাতি, ধর্ম বা রাজনৈতিক পরিচয়ের দোহাই দিয়ে কোনো নাগরিক বা সাংবাদিকের পেশাগত স্বাধীনতা খর্ব করার সুযোগ নেই। সাংবাদিকরা নীতি-নৈতিকতা মেনেই কাজ করেন, কিন্তু পুলিশের এমন রহস্যজনক কর্মকাণ্ডে গণমাধ্যমকর্মীরা আজ ভীতসন্ত্রস্ত। স্বাধীন গণমাধ্যমের জন্য এই পরিস্থিতি কোনোভাবেই শুভকর নয়।

এই পুরো প্রক্রিয়ার তীব্র নিন্দা ও কঠোর সমালোচনা করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তিনি এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত স্বৈরতান্ত্রিক আখ্যা দিয়ে বলেন, গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশের এই উদ্যোগ ফ্যাসিবাদের আমল তো বটেই, এমনকি নাৎসিবাদি বা উত্তর কোরিয়ার চরম স্বৈরতান্ত্রিক চর্চাকেও ম্লান করে দিয়েছে। এটি বাংলাদেশের সংবিধান স্বীকৃত চিন্তা, বিবেক ও মুক্ত গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই আন্দোলনের চেতনার মাধ্যমে গঠিত এই সরকারের মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার, তার সঙ্গে এই কর্মকাণ্ড পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, এই আত্মঘাতী উদ্যোগ যদি সরকারের সম্মতিতেই হয়ে থাকে, তবে বুঝতে হবে সরকার পতিত স্বৈরাচারের চেয়েও বেশি কর্তৃত্ববাদী আচরণ করছে। তিনি সরকারকে অবিলম্বে এই পথ থেকে সরে এসে দায়ী পুলিশ কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানান।

এদিকে, বিষয়টি নিয়ে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ ও পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলেও তারা নাম প্রকাশ করে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিটিএসবির একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, ভিভিআইপিদের নিরাপত্তা ও পাস পাসের তথ্য হালনাগাদের জন্য সাধারণত পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নিয়মিত কিছু নির্দেশনা থাকে, যা মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দারা সম্পূর্ণ গোপনে সম্পন্ন করেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ের কোনো সদস্য যদি সরাসরি সাংবাদিকদের ফোন করে বা বাসায় গিয়ে আক্রমণাত্মকভাবে বিদ্যুৎ বিলের কপি বা রাজনৈতিক তথ্য চেয়ে থাকেন, তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং এটি নির্দেশের ভুল ব্যাখ্যার কারণে হতে পারে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত নতুন নোটিশ জারি করা হচ্ছে বলে তিনি আশ্বাস দেন।


এ সম্পর্কিত আরো খবর