সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 109
পবিত্র ঈদুল আজহা তথা কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় গরু-ছাগলসহ গৃহপালিত পশু চুরি, ডাকাতি ও অন্যান্য অপরাধ প্রবণতা ঠেকাতে গ্রামবাসী ও পুলিশের সমন্বয়ে এক অভূতপূর্ব ও ব্যাপক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে এখন স্থানীয় বাসিন্দারা লাঠি ও টর্চলাইট হাতে রাত জেগে পালাক্রমে পাহারা দিচ্ছেন। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থানা পুলিশের টহল বহুগুণ জোরদার করা হয়েছে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথে বসানো হয়েছে অস্থায়ী চেকপোস্ট।
সরেজমিনে দেখা যায়, তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ ইউনিয়নের সাকোদিঘী, বিনোদপুর, খালকুলা ও নওগাঁ বাজারসহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর এলাকায় স্থানীয় সচেতন যুবক ও গ্রামবাসীরা দলবদ্ধভাবে রাতের বেলা পাহারায় স্বতঃস্ফূর্ত অংশ নিচ্ছেন। চোর-ডাকাতদের প্রতিরোধ করতে গ্রামের প্রধান প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে বাঁশের তৈরি শতাধিক অস্থায়ী ব্যারিকেড বা চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। গভীর রাতে যেকোনো সন্দেহজনক যানবাহন ও অপরিচিত মানুষকে থামিয়ে সেখানে পুঙ্খানুপুঙ্খ জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
স্থানীয় খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোরবানির ঈদ ঘনিয়ে এলে প্রতি বছরই প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবুঝ গরু-ছাগল চুরির ঘটনা জ্যামিতিক হারে বেড়ে যায়। বিশেষ করে সংঘবদ্ধ চোরচক্র রাতের অন্ধকারে পিকআপ ভ্যান বা ট্রাক নিয়ে বিভিন্ন গ্রামে প্রবেশ করে খামারিদের বছরের শ্রেষ্ঠ সম্বল গোয়াল থেকে চুরি করে নিয়ে যায়। এ কারণে এবার আগে থেকেই খামারিদের রক্ষায় সতর্ক অবস্থান নিয়েছে গ্রামবাসী। নিজেদের কষ্টার্জিত সম্পদ রক্ষায় তারা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় এই শক্তিশালী নৈশ পাহারার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন।
এ বিষয়ে নওগাঁ ইউনিয়নের একাধিক বাসিন্দা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, “গত কয়েক বছর ধরে ঈদের ঠিক আগ মুহূর্তে এলাকাগুলোতে সুপরিকল্পিতভাবে গরু-ছাগল চুরির ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। অনেক খামারি সর্বস্বান্ত হয়েছেন। তাই এবার আমরা কোনো ঝুঁকি না নিয়ে নিজেরাই রাত জেগে গ্রাম পাহারা দিচ্ছি। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনও আমাদের সার্বিক সহযোগিতা করছে। সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধ থাকলে চোর-ডাকাতেরা আর সুযোগ পাবে না।”
উপজেলা প্রশাসন ও তাড়াশ থানা পুলিশের বিশেষ উদ্যোগে পুরো উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট ৯টি বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। এসব চৌকস টিমে পুলিশ সদস্য ও গ্রাম পুলিশের সমন্বয়ে ৩ থেকে ৮ জন করে সক্রিয় সদস্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। তারা রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা পালা করে উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, পশুর হাট, বাজার ও ঘনবসতিপূর্ণ জনপদ এলাকায় নিয়মিত বিশেষ টহল দিচ্ছেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এই টহল টিমগুলো শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই কাজ করছে না, পাশাপাশি প্রান্তিক খামারিদের মধ্যে জোরালো সচেতনতাও তৈরি করছে। তারা গভীর রাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের গোয়ালঘরগুলো মজবুত করা, পশু নিরাপদ স্থানে রাখা এবং যেকোনো সন্দেহজনক ব্যক্তি বা দ্রুতগতির গাড়ি দেখলে দ্রুত পুলিশকে জানানোর বিষয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। এতে স্থানীয়দের মধ্যে দারুণ নিরাপত্তাবোধ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন অনেকে।
তাড়াশ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. হাবিবুর রহমান দুর্ঘটনার ভয়াবহতা ও নিরাপত্তার বিষয়ে স্পষ্ট করে বলেন, "বিগত বছরগুলোতে কোরবানির ঈদের আগে বিভিন্ন এলাকায় পশুপাখি ও গরু-ছাগল চুরির একাধিক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। খামারিদের সেই জানমালের ক্ষয়ক্ষতি রোধে এবার আগে থেকেই সর্বোচ্চ কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।" তিনি আরও বলেন, “সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মহোদয়ের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী এবার আমরা পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় সাধারণ গ্রামবাসীদের সরাসরি সম্পৃক্ত করে সম্মিলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছি। ৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ৯টি শক্তিশালী টিম নিয়মিত হাইওয়ে ও গ্রামীণ সড়কে টহল দিচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য শুধু চুরি প্রতিরোধ নয়, বরং যেকোনো ধরনের অপরাধ দমনে আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে আছি। এই কড়া নজরদারি ঈদের আগ পর্যন্ত আরও কঠোর থাকবে।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও পুলিশের এই প্রশংসনীয় উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তাঁরা মনে করছেন, পুলিশের পাশাপাশি জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণে গঠিত এই যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এলাকায় চুরি-ডাকাতি অনেকাংশে কমিয়ে আনবে এবং সাধারণ মানুষের মাঝে পরম স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে।
আকাশজমিন / আরআর