ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপে পার পেয়ে গেলেন ট্রান্সকমের সিমিন রহমান!


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ২১ মে, ২০২৬ সময় : ৭:৪৮ পিএম

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে ট্রান্সকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সিমিন রহমান ভাই হত্যাসহ বিভিন্ন গুরুতর মামলা থেকে রেহাই পেয়েছেন বলে বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে। স্ট্যাম্প জালিয়াতির মাধ্যমে কোম্পানির কোটি কোটি টাকার শেয়ার আত্মসাতের অভিযোগে তার ছোট বোন শাযরেহ্ হকের করা মামলায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কর্তৃক সুনির্দিষ্ট অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিলের পরও সিমিন রহমানসহ সব আসামিকে আদালত থেকে রহস্যজনকভাবে অব্যাহতি দেওয়ায় দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

তীব্র অভিযোগ উঠেছে যে, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের ইশারায় এই স্পর্শকাতর মামলার গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে যায় এবং অনৈতিক আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে তিনি এই বিচারিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করেন। খামখেয়ালি এই কর্মকাণ্ডে ট্রান্সকম গ্রুপের দুই শীর্ষ পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমান ও মাহফুজ আনাম পর্দার আড়াল থেকে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছেন বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। মামলার বাদী ও ট্রান্সকম গ্রুপের পরিচালক শাযরেহ্ হক অভিযোগ করেন, অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি তৃতীয় পক্ষের নগ্ন হস্তক্ষেপে বাদীপক্ষকে আদালাতে ন্যূনতম শুনানির সুযোগ না দিয়েই মামলাটি খারিজ করা হয়েছে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বিষয়টি বর্তমানে উচ্চ আদালতে (হাইকোর্টে) গড়িয়েছে।

উল্লেখ্য, ট্রান্সকম গ্রুপের দূরদর্শী প্রতিষ্ঠাতা লতিফুর রহমানের মৃত্যুর পর তার বড় মেয়ে সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে ‘হত্যা, অর্থ আত্মসাৎ, পৈতৃক সম্পত্তি দখল ও অবৈধভাবে শেয়ার হস্তান্তর’-এর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে ট্রান্সকম গ্রুপের পরিচালক শাযরেহ্ হক ২০২৪ সালে প্রথম আইনি লড়াই শুরু করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে এই পারিবারিক চরম দ্বন্দ্ব প্রথম প্রকাশ্যে আসে। অভিযোগ রয়েছে, মামলার তদন্ত ও বিচারকাজ নিজেদের অনুকূলে রাখতে সিমিন রহমান বিভিন্ন মহলে বিপুল প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের ঘনিষ্ঠ অ্যাডভোকেট তৌফিকা করিমকে ব্যবহার করে আদালত থেকে নিজেদের পক্ষে আদেশ নেওয়া হয়। তৌফিকা করিম নেপথ্যে থেকে তার বিশ্বস্ত আইনজীবী শাহীন ও বাহারুলের মাধ্যমে আদালতের বিভিন্ন পর্যায়ে সিমিন রহমানের পক্ষে একের পর এক আদেশ করিয়ে নেন। পরবর্তীতে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে সিমিন রহমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রভাবশালী উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তিনি এই মামলায় হস্তক্ষেপ করেন বলে দাবি করা হচ্ছে।

মামলার নথিপত্রে উল্লেখ করা হয়, ট্রান্সকম গ্রুপের অধিকাংশ শেয়ার সম্পূর্ণ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে আপন ভাই ও বোনের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে ব্যবহার করেন সিমিন রহমান। পাশাপাশি একটি ভুয়া ও বানোয়াট পারিবারিক ‘ডিড অব সেটেলমেন্ট’ তৈরি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানে লতিফুর রহমানের নামে থাকা ২ বিঘা ২ কাঠা জমির মধ্যে ৩৫ কাঠা জমি সম্পূর্ণ ভুয়া ‘হেবা দলিল’-এর মাধ্যমে নিজের নামে নেওয়ার অপচেষ্টা চালান সিমিন রহমান। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কাছে জমা দেওয়া ওই হেবা দলিলেও প্রয়াত বাবা ও ছোট বোন শাযরেহ্ হকের স্বাক্ষর জালিয়াতির গুরুতর প্রমাণ মেলে। পরবর্তীতে রাজউকের তদন্তে বিষয়টি ধরা পড়লে দলিলের কার্যক্রম সাময়িকভাবে আটকে যায়।

সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের আইনি ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১ জুলাই লতিফুর রহমানের মৃত্যুর পর থেকেই গ্রুপটিতে জালিয়াতি, প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা শুরু হয়। ২০২৩ সালের শুরুতে লতিফুর রহমানের একমাত্র ছেলে আরশাদ ওয়ালিউর রহমান ও ছোট মেয়ে শাযরেহ্ হক এই জঘন্য বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে জানতে পারেন। এরপর একে একে বিভিন্ন করপোরেট জালিয়াতির তথ্য সামনে আসতে থাকে। এরপরই মামলা করেন লতিফুর রহমানের ছোট মেয়ে শাযরেহ্ হক। মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)। এই মামলায় পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা শাজেদুর রহমান দীর্ঘ তদন্ত শেষে সিমিন রহমানসহ ছয়জনকে সরাসরি অভিযুক্ত করে আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়, ২০২০ সালে ঢাকায় শেয়ার ট্রান্সফার সংক্রান্ত যে বোর্ড মিটিং অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেই মিটিংয়ে শাযরেহ্ হক ও তার ভাই আরশাদ ওয়ালিউর রহমান সশরীরে উপস্থিত না থাকলেও নথিতে তাদের জাল স্বাক্ষর দেখানো হয়। একইভাবে প্রয়াত লতিফুর রহমানের ভুয়া অনুমোদনের স্বাক্ষর দেখানো হয়েছে ওই মিটিংয়ের এজেন্ডায়। অথচ এত সব অকাট্য তথ্য-প্রমাণ থাকার পরও এই চার্জশিট থেকে সিমিন রহমানসহ সব আসামিকে নজিরবিহীনভাবে অব্যাহতি দেয় নিম্ন আদালত।

এ বিষয়ে শাযরেহ্ হক সংবাদমাধ্যমকে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আদালত আমাদের কোনো আইনগত আবেদন বা বক্তব্য না শুনেই একতরফাভাবে মামলাটি খারিজ করে দিয়েছেন। একটি প্রভাবশালী তৃতীয় পক্ষের অনৈতিক হস্তক্ষেপে মামলাটি খারিজ করা হয়েছে। বিচার ব্যবস্থার এমন আচরণে আমি চরমভাবে বিস্মিত ও স্তব্ধ হয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘তারা ক্ষমতার অপব্যবহার ও হস্তক্ষেপ করে যেভাবে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজেদের পক্ষে আদেশ নিয়ে যাচ্ছে, তা কোনো স্বাধীন দেশে হওয়া উচিত নয়। সব তথ্য-প্রমাণের ওপর ভিত্তি করেই পিবিআই কর্মকর্তা আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছিলেন। কিন্তু আমাদের ন্যায়বিচারের অধিকার খর্ব করে সব আসামিকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আমরা আস্থার সাথে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল আবেদন করেছি।’ এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত সংশ্লিষ্টদের ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কাউকে পাওয়া যায়নি।

শেখ হাসিনাকে ‘১০০ কোটি টাকা ঘুষ’ দেওয়ার অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান: এদিকে ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘১০০ কোটি টাকা ঘুষ’ দেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগের গভীর অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই লক্ষ্যে গত বছর নভেম্বরে রাষ্ট্রীয় এই সংস্থার একজন উপপরিচালককে প্রধান অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা হিসেবে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এরপরই মাঠপর্যায়ে মূল অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ট্রান্সকম গ্রুপের সিইওর বিরুদ্ধে ওঠা ‘হত্যা, শেয়ার জালিয়াতি ও করপোরেট প্রতারণার’ একাধিক হাই-প্রোফাইল মামলা ‘ধামাচাপা দিতে’ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নগদ ‘১০০ কোটি টাকা ঘুষ’ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের কথা বলেছে খোদ দুদক। সংস্থার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দেশের অর্থনীতির স্বার্থে অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান করা হচ্ছে এবং এই অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের আইনি সম্পৃক্ততা নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।


এ সম্পর্কিত আরো খবর