ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

৭ বছরের রামিশার জন্য বিচার চাই

আর যেন বিচারের বাণী নীরবে না কাঁদে


  • আপলোড সময় : শুক্রবার ২২ মে, ২০২৬ সময় : ৬:২৪ পিএম

রাজধানীর মিরপুর পল্লবীতে ঘটে যাওয়া শিশু রামিশা হত্যার ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের জীবনে শোকের ছায়া নামিয়ে আনেনি, এটি পুরো জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। সাত বছরের নিষ্পাপ এক শিশুর ওপর পাশবিক নির্যাতন, ধর্ষণ এবং পরে গলা কেটে হত্যার অভিযোগ এমন এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি আমাদের দাঁড় করিয়েছে, যেখানে প্রশ্ন উঠছে— আমরা আসলে কতটা নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি?

একটি শিশু, যে এখনো পৃথিবীকে পুরোপুরি চিনে ওঠেনি, যে স্কুলের খাতা, খেলনা আর ছোট ছোট স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকার কথা ছিল, সেই শিশুর জীবন এমন নিষ্ঠুরভাবে কেড়ে নেওয়া শুধু অপরাধ নয়; এটি সভ্যতা, মানবতা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য এক ভয়ংকর ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

রামিশা ছিল একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের একমাত্র স্বপ্ন। হাজারো কষ্টের মধ্যেও বাবা-মা মেয়েকে মানুষ করার স্বপ্ন দেখতেন। ক্লাস টুতে পড়া ছোট্ট মেয়েটিকে ঘিরে তাদের ছিল ভবিষ্যতের অসংখ্য আশা। কিন্তু পরিবারের বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েই অভিযুক্ত ভাড়াটিয়া সোহেল সেই স্বপ্নকে রক্তাক্ত করে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, সমাজে এমন অপরাধীরা অনেক সময় পরিচিত মানুষের ছদ্মবেশেই ঘুরে বেড়ায়। ফলে সাধারণ মানুষের ভরসার জায়গাগুলোও আজ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে।

এই ঘটনার পর দেশজুড়ে মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ ও বেদনা তৈরি হয়েছে, তা সাম্প্রতিক সময়ের অনেক ঘটনার চেয়েও গভীর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজপথ— সর্বত্র মানুষ এক কণ্ঠে বলছে, “রামিশার হত্যাকারীর দ্রুত বিচার চাই।” সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, মানবাধিকারকর্মী, এমনকি প্রবাসী বাংলাদেশিরাও এ ঘটনায় সোচ্চার হয়েছেন।

বিদেশে থাকা প্রবাসীদের ক্ষোভও ছিল স্পষ্ট। তারা বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বলেছেন, শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের বিচার যদি বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমে যাবে। অনেকেই দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে স্বল্প সময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন।

আমাদের সমাজে একটি ভয়ংকর প্রবণতা তৈরি হয়েছে— কোনো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটলে কিছুদিন আলোচনা হয়, প্রতিবাদ হয়, তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু স্তব্ধ হয়ে যায়। কিন্তু বিচার আর বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অপরাধীরা বুঝে যায়, সময় পেরিয়ে গেলে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। এই সংস্কৃতি বন্ধ না হলে শিশু ও নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা কমানো সম্ভব নয়।

এখানে রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। দ্রুত তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার এবং রায়ের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। কারণ বিচার বিলম্বিত হওয়া মানেই অনেক ক্ষেত্রে বিচার অস্বীকার করা।

এই ঘটনায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। রামিশার বাবা-মা তাদের বেদনা ও ক্ষোভের কথা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেছেন। পরিবারের দাবি, প্রধানমন্ত্রীর মানবিক আচরণ তাদের কিছুটা মানসিক শক্তি জুগিয়েছে। একটি শোকাহত পরিবারের পাশে রাষ্ট্রপ্রধানের এমন উপস্থিতি নিঃসন্দেহে মানবিকতার পরিচয় বহন করে।


তবে একই সময়ে সরকারের কিছু দায়িত্বশীল ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল, এমন একটি ঘটনায় সরকারের সব পর্যায় থেকে শক্ত ও দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়া আসবে। কারণ শিশু হত্যা ও ধর্ষণের মতো ঘটনা কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; এটি পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা।

শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে শুধু আইন করলেই হবে না, তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং প্রশাসন— সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। শিশুদের নিরাপত্তা বিষয়ে অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে সমাজে মাদক, অপরাধ ও বিকৃত মানসিকতার বিস্তার রোধেও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

বর্তমান সময়ে মাদক ও অপরাধের বিস্তার সমাজকে ভয়াবহ সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। নৈতিকতার অবক্ষয়, সামাজিক দায়িত্ববোধের অভাব এবং আইনের শিথিল প্রয়োগ অনেক অপরাধীকে সাহস জোগাচ্ছে। ফলে ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন ও হত্যার মতো ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, শুধু কঠোর আইন নয়, সামাজিক মূল্যবোধ পুনর্গঠনও এখন সময়ের দাবি।

অনেকে মেজর সিনহা হত্যা মামলার প্রসঙ্গ টেনে বলছেন, আদালতের রায় ঘোষণার পরও যদি তা কার্যকর হতে দীর্ঘ সময় লাগে, তাহলে মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। কারণ সাধারণ মানুষ দেখতে চায়— অপরাধ করলে তার দ্রুত ও দৃশ্যমান শাস্তি হয়। অন্যথায় “বিচারের বাণী নীরবে কাঁদে” — এই কথাটি বাস্তব সত্যে পরিণত হয়।

রামিশার ঘটনায় দেশের সচেতন মহল কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে— বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুত তদন্ত ও বিচার সম্পন্ন করা, শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা, ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রদান করা এবং বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা বন্ধ করা।

এছাড়া শিশুদের জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে প্রতিটি এলাকায় সামাজিক নজরদারি বাড়ানোরও দাবি উঠেছে। সন্দেহজনক কার্যক্রম, মাদক ব্যবসা ও অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনকে আরও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।

রামিশার মৃত্যু আজ শুধু একটি পরিবারের কান্না নয়; এটি পুরো জাতির বিবেকের পরীক্ষা। একটি রাষ্ট্র তখনই সভ্য ও মানবিক হিসেবে পরিচিতি পায়, যখন সে তার শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। কিন্তু যদি একটি শিশু নিজের ঘর কিংবা পরিচিত পরিবেশেও নিরাপদ না থাকে, তাহলে আমাদের উন্নয়ন, অগ্রগতি কিংবা সভ্যতার দাবি প্রশ্নের মুখে পড়ে।

দেশবাসীর প্রত্যাশা, রামিশার ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত হবে এবং অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর করা হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্র ও সমাজ এমন কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো বাবা-মাকে সন্তানের লাশ বুকে নিয়ে আহাজারি করতে না হয়।

আর যেন কোনো রামিশা অকালে ঝরে না যায়।
আর যেন কোনো শিশুর স্বপ্ন রক্তে ভেসে না যায়।
আর যেন কোনো বিচারের বাণী নীরবে না কাঁদে।

লেখক, আব্দুল কাইয়ুম খান  

প্রতিষ্ঠাতা, দুর্নীতি বিরোধী অভিযান  

নির্বাহী সদস্য, অ্যান্টি করাপশন মুভমেন্ট  


এ সম্পর্কিত আরো খবর