ঢাকা ওয়াসার এক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত কর্মকর্তার নাম মো. ফকরুল ইসলাম। সরকারি চাকরি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি বিশাল সম্পদের পাহাড় গড়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিক সমাজ। এই ঘটনায় প্রয়োজনীয় তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
দুদকে দাখিল করা অভিযোগে বলা হয়েছে, ঢাকা ওয়াসার প্রকৌশলী ফকরুল ইসলাম চাকরির আড়ালে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ, প্রকল্প বরাদ্দ এবং বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম ও কমিশন বাণিজ্যে জড়িত। সরকারি বেতনের বিপরীতে তার জীবনযাপন এবং সম্পদের তথ্যে বড় ধরনের অসংগতি পাওয়া গেছে। অভিযোগে দাবি করা হয়, রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় ফকরুল ইসলাম ও তার পরিবারের নামে-বেনামে একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট, বাণিজ্যিক ভবন এবং বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকানা রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তার অবৈধ সম্পদের পরিমাণ শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। আবেদনে ফকরুল ইসলাম এবং তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, ব্যাংক লেনদেন ও আয়ের উৎস খতিয়ে দেখার জন্য দুদকের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
ওয়াসার এই প্রকৌশলীর ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সরকারি সেবার বিভিন্ন সেক্টরে দুর্নীতি এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। পাসপোর্ট অফিস, বিআরটিএ, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস, ভূমি অফিস, পুলিশ, রাজউক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, শিক্ষা অধিদপ্তর, সিটি কর্পোরেশন, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), ঢাকা ওয়াসা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), কাস্টমস ও আয়কর অফিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে সেবা পেতে ঘুষ দেওয়া এখন অনেকটা নিয়মে পরিণত হয়েছে।
দুর্নীতি নির্মূলে দুদকের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্ন রয়েছে। দেশে প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকলেও দুর্নীতি দমন কমিশনে মাত্র ২,১৪৬ জন জনবল কর্মরত। এই সীমিত জনবল দিয়ে বিশাল এই প্রশাসনিক কাঠামোতে নজরদারি চালানো রীতিমতো অসম্ভব। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, দুদককে আরও শক্তিশালী এবং এর কাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি।
টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেগা প্রজেক্ট বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা না গেলে তার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। ঘুষের টাকায় গড়ে ওঠা বিলাসবহুল অট্টালিকা রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের বড় অন্তরায়। তাই জাতীয় স্বার্থেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।
দুর্নীতি প্রতিরোধে সচেতন নাগরিক সমাজ ও পর্যবেক্ষকরা পাঁচটি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তাব করেছেন:
১. জনবল বৃদ্ধি: দুদকের জনবল বাড়িয়ে অন্তত ২০ হাজারে উন্নীত করা, যাতে ১৫ লাখ সরকারি কর্মচারীর ওপর কার্যকর নজরদারি করা সম্ভব হয়।
২. স্বাধীন ওভারসাইট কমিশন: দুদককে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী ওভারসাইট কমিশন গঠন করা।
৩. তৃণমূল পর্যায়ে অফিস: প্রতিটি উপজেলায় দুদকের সাব-অফিস স্থাপন করে তৃণমূল পর্যায়ে দুর্নীতির অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্ত নিশ্চিত করা।
৪. দ্রুত বিচার আদালত: প্রতিটি জেলায় দুর্নীতি মামলার বিচারের জন্য বিশেষ আদালত গঠন এবং ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে রায় প্রদান বাধ্যতামূলক করা।
৫. বাজেট বরাদ্দ: দুর্নীতি দমনে বড় ধরনের আর্থিক বরাদ্দ নিশ্চিত করা, কারণ লুটপাট বন্ধ হলে তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য লাভজনক হবে।
পরিশেষে, দুর্নীতি এখন আর কোনো ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, বরং রাষ্ট্রের উন্নয়নের পথে বড় বাধা। বড়-ছোট বা দল-মত নির্বিশেষে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ‘জাতীয় যুদ্ধ’ ঘোষণা করাই এখন বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার একমাত্র পথ।
--লেখক
আব্দুল কাইয়ুম খান
বিশেষ সংবাদদাতা, ঢাকা টুডে
প্রতিষ্ঠাতা, দুর্নীতি বিরোধী অভিযান
নির্বাহী সদস্য, অ্যান্টি করাপশন মুভমেন্ট