ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
‘ট্রফি চোর’ অপবাদ মাথায় নিয়ে শান্ত মেজাজে মাঠ ছাড়লেন নাকভি ২৩ বছরের খরা কাটল না আমেরিকার, ইউএস ওপেনের ট্রফি জভেরেভের হাতে পুরুষদের পর মেয়েরাও বর্জন করল নাকভিকে, দুবাইতে আবারও ট্রফি নাটক রাজধানীর বেসরকারি হাসপাতালে শিশু মৃত্যুর পর তুলকালাম বিশ্বের দূষিত বায়ুর তালিকায় শীর্ষে সিঙ্গাপুর সিটি,ঢাকা ষষ্ঠ আসিফ মাহমুদের আমলের সব নিয়োগ ও পদোন্নতির নথি এখন দুদকে পঞ্চগড়ে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ: আহত ১৫, ২ ঘণ্টা মহাসড়ক অবরুদ্ধ অল্পের জন্য বাঁচলেন আন্তর্জাতিক নেতারা ৩৬ ঘণ্টা পর নিহত বাংলাদেশি যুবকের মরদেহ ফেরত দিলো বিএসএফ শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ

১৪ বছরে ৩ হাজার কোটি টাকা হাওয়া

অবশেষে সম্পূর্ণ বাতিলের খাতায় ঢাকা-গাজীপুর বিআরটি প্রকল্প!


  • আপলোড সময় : সোমবার ০১ জুন, ২০২৬ সময় : ৬:৩৬ পিএম

প্রকল্পটি নেওয়ার সময় বড় গলায় বলা হয়েছিল, এটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হলে দিনে প্রায় ২৫ হাজার যাত্রী কোনো ধরনের যানজট ছাড়াই বিশেষ দ্রুতগামী বাসে যাতায়াত করতে পারবেন। সড়কপথের কোনো সংকেত বা সিগন্যাল কিংবা অন্য কোনো ট্রাফিকের বাধায় এই বিশেষ বাস আটকে থাকবে না। কিন্তু দীর্ঘ ১৪ বছরে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা খরচ করার পর এখন জানা গেল, এই মূল উদ্দেশ্য কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়; বরং প্রকল্পটির কারণে ওই রুটে যানজট ও জনভোগান্তি আগের চেয়ে আরও বহু গুণ বাড়তে পারে। আর এই চরম বাস্তবতার মুখে প্রকল্পটি এখন নতুন করে আর না বাড়িয়ে পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়ার জোরালো আলোচনা শুরু হয়েছে সরকারের উচ্চপর্যায়ে। বাস কিনে এই রুটে চালাতে হলে সরকারকে আরও সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে। অথচ প্রকল্পের মোট ২৫টি নির্ধারিত স্টেশনের মধ্যে মাত্র ১৫টির অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও তা সাধারণ মানুষের কোনো কাজেই আসছে না। উল্টো স্টেশনগুলোতে লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে বসানো চলন্ত সিঁড়ি ও লিফট ক্ষয়ে পড়ছে এবং ভেঙে গেছে সুরক্ষামূলক বেষ্টনী।

মূলত এই প্রকল্পটিতে নকশা করা হয়েছিল যে, সড়কের মাঝখান দিয়ে শুধু বিশেষ বাস বা র‍্যাপিড ট্রানজিট চলাচল করবে। এতে যানজট ও সিগন্যালে যাত্রীদের আটকে থাকতে হবে না। কিন্তু চার বছরের নির্ধারিত এই প্রকল্প আজ দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে চলছে। আজ পর্যন্ত সড়কে বাসও নামেনি, আর মানুষের দুর্ভোগও যায়নি। এই হলো শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত চলমান বিআরটি প্রকল্পের বর্তমান কঙ্কালসার অবস্থা। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের গঠিত দুটি বিশেষ কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন গুরুত্বসহকারে পর্যালোচনা করে প্রকল্পটি সম্পর্কে এমন হতাশাজনক মত দিয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ দল। বুয়েটের চারজন প্রথিতযশা বিশেষজ্ঞের এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক। তাঁরা গত মাসে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে তাঁদের এই চূড়ান্ত পর্যালোচনা প্রতিবেদনটি জমা দিয়েছেন।

বিআরটি প্রকল্প সম্পর্কে বুয়েটের এই বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট মত হচ্ছে, প্রকল্পটি দেশের অবকাঠামো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে একটি ‘সিস্টেমেটিক বা পদ্ধতিগত ব্যর্থতার’ নিকৃষ্ট উদাহরণ। যথাযথ কারিগরি যাচাই, দক্ষ জনবল ও কোনো ধরনের জবাবদিহির অভাব থাকার কারণেই আজ এই ভয়াবহ পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিকল্পনার মারাত্মক ত্রুটি, নকশাগত চরম দুর্বলতা, বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং আর্থিক জবাবদিহির ব্যাপক ঘাটতি ছিল বলে প্রতিবেদনে কঠোর মন্তব্য করা হয়েছে। বুয়েটের এই বিশেষজ্ঞ দল বিআরটি কার্যক্রম বর্তমানে পুরোপুরি বাতিল করে দিয়ে বিদ্যমান নির্মিত অবকাঠামোকে উন্নত সাধারণ মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের জন্য সরকারের কাছে জোরালো সুপারিশ করেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম গতকাল রোববার সাংবাদিকদের বলেন, প্রকল্পটি এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ বাতিল করার পক্ষে সরকারের ভেতর ও বাইরে অত্যন্ত জোরালো মত আছে। আবার এটি পুরোপুরি বাতিল না করে আরও কিছু টাকা বাড়তি খরচ করে কোনোমতে সচল করা যায় কি না, যাতে পুরোপুরি না হলেও কিছুটা সুবিধা পাওয়া যাবে—এমন মতও রয়েছে। তিনি জানান, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সব পক্ষকে নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করে সড়ক মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে যে প্রকল্পটি এখানেই শেষ করা হবে, নাকি নতুন করে আরও বড় বিনিয়োগ করা হবে। এরপর বাতিল কিংবা নতুন বিনিয়োগ—যা-ই হোক না কেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য তা মন্ত্রিসভায় (ক্যাবিনেট) তোলা হবে।

সরেজমিনে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ঋণের কোটি কোটি টাকায় নির্মিত এই অবকাঠামো এখন রোদ-বৃষ্টিতে ক্ষয়ে যাচ্ছে। অথচ এই পথ দিয়ে যাতায়াতকারীদের দুর্ভোগের কোনো শেষ নেই। বিআরটি প্রকল্পের আওতায় সড়কের মাঝখানে ১৫টি স্টেশন অবকাঠামো তৈরি করা হলেও এর একটির কাজও সম্পূর্ণ শেষ হয়নি। স্টেশনগুলোর কোনো কোনোটি মাটিতে, আবার কিছু আছে উড়ালপথে। বিশেষ বাস চলাচল করলে যাত্রীরা রাস্তার দুই পাশ থেকে স্টেশনে যাতে নিরাপদে যাতায়াত করতে পারে, সে জন্য আধুনিক পথচারী পারাপার বা পদচারী-সেতু তৈরি করা হয়েছিল। এগুলোতে চলন্ত সিঁড়ি এবং কোনো কোনোটাতে আধুনিক লিফটের ব্যবস্থাও রাখা আছে। উত্তরার একটি চলন্ত সিঁড়ি কিছুদিন আগে চালু করা হয়েছিল, তবে বর্তমানে তা সম্পূর্ণ অচল। অন্য স্টেশনের পাশের চলন্ত সিঁড়ির দামি যন্ত্রপাতিগুলোতে জং ধরছে এবং বেষ্টনী ভেঙে নিচে পড়ছে।

এই ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে নিয়মিত মালামাল পরিবহন করেন কাভার্ড ভ্যানের চালক মো. সোহেল। তিনি নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, ২০২২ সালে এক প্রচণ্ড বৃষ্টির দিনে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পার হতে তাঁর দীর্ঘ ১০ ঘণ্টা সময় লেগেছিল। বিআরটি প্রকল্পের কারণে এই এক যুগে মানুষের যে কষ্ট হয়েছে, তা ভোলার নয়। তিনি আরও বলেন, এখন বিআরটি লেনের ভেতর দিয়ে সব ধরনের সাধারণ যানবাহন চলাচল করতে দেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রায়ই সেখানে তীব্র জট লেগে থাকে। রাস্তায় কোনো রোড সাইন বা ট্রাফিক সংকেত নেই, কোথাও উড়াল আবার কোথাও সমতল সড়ক, কিছু স্থানে অগোছালো বেড়া দেওয়া এবং সড়ক অত্যন্ত সরু। ফলে রাতে চলার সময় চালকেরা প্রায়ই রাস্তা ভুল করেন। বাস্তবে দেখা গেছে, বিআরটি লেন আলাদা করতে উত্তরা এলাকার কিছু স্থানে সড়কের মাঝখানে লোহার বেড়া দেওয়া হয়েছে, যার অনেকগুলো ভেঙে মানুষ ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছে। পুরো ২০ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশেই শত শত পোশাক কারখানা বা গার্মেন্টস রয়েছে। কারখানার সামনে নিজস্ব পাহারাদারদের লাল পতাকা হাতে নিয়ে মহাসড়কের দ্রুতগামী যানবাহন থামিয়ে শ্রমিকদের রাস্তা পার হতে সহায়তা করতে দেখা গেছে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত পুরো ২০ কিলোমিটার সড়কে এক ফুটের কাছাকাছি উঁচু সিমেন্টের প্রতিরোধক (কংক্রিট ব্যারিয়ার) দিয়ে বিআরটি লেন আলাদা করা হয়েছে। এখন যদি প্রকল্প বাতিল করে সব ধরনের যানবাহনের চলাচল স্বাভাবিক করতে হয়, তবে এই দীর্ঘ সিমেন্টের প্রতিরোধকগুলো কোটি কোটি টাকা খরচ করে ভাঙতে হবে।

রাজধানীর প্রবেশদ্বার আবদুল্লাহপুর চৌরাস্তায় বিআরটি প্রকল্পের অপরিকল্পিত স্থাপনাগুলো সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। পাশের অসমাপ্ত সরু লেন দিয়েই বর্তমানে যাত্রীদের ধুলোবালির মধ্যে চলাচল করতে হচ্ছে। আর উড়ালসড়কে প্রায় সার্বক্ষণিক যানজট লেগেই থাকছে। মূলত বিশেষ ধরনের বাস চলাচলের জন্য সড়কের মাঝখান দিয়ে দুটি লেন আলাদা করার নাম হচ্ছে বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট বা বিআরটি। রাজধানী ঢাকার প্রথম বিআরটি প্রকল্প নেওয়া হয় শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ি পর্যন্ত। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ১৫ দশমিক শূন্য ৭ কিলোমিটার সড়কপথ এবং বাকি অংশ উড়ালপথ। ২০১২ সালে এই মেগা প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। এই প্রকল্পের ধীরগতির কারণে গত ১৪ বছরে উত্তরা, টঙ্গী ও গাজীপুর ছাড়াও বৃহত্তর ময়মনসিংহ, উত্তরবঙ্গ ও টাঙ্গাইলে যাতায়াতকারী কোটি কোটি মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নকালে নির্মাণকাজের ক্রেন ভেঙে পড়া ও অন্যান্য নানা দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত সাতজন সাধারণ মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে। বিআরটি প্রকল্পে শুরুতে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে নির্মাণকাজ শেষ করে ২০১৭ সাল থেকে স্বয়ংক্রিয় দরজার অত্যাধুনিক বাস পরিচালনার কথা ছিল। এরপর প্রকল্প প্রস্তাব তিন-তিনবার পরিবর্তন করা হয়। প্রতিবারই সময় বেড়েছে এবং ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। কিন্তু এত টাকা বৃদ্ধির পরও কাজ শেষ হয়নি, আধুনিক বাসও নামেনি। এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। এরপর ২০২৫ সালে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ প্রকল্পটি চতুর্থবারের মতো সংশোধনের প্রস্তাব দেয়। সেই নতুন প্রস্তাবে মোট ব্যয় ধরা হয় ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ধরা হয় ২০২৯ সাল পর্যন্ত।

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) চতুর্থ সংশোধিত ওই বিশাল প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদন দেয়নি; বরং প্রকল্পটির বিকল্প কী হতে পারে এবং কীভাবে এই লোকসান কমানো যায়, তা আবার পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করার নির্দেশ দেয়। এ ছাড়া প্রকল্পের এই জঘন্য নকশাগত ত্রুটির জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে আইনি করণীয় সুপারিশ করতে বলা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিবের সভাপতিত্বে এক জরুরি বৈঠক হয়। সেখানে দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং তারা তাদের প্রতিবেদনও জমা দেয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ৯ অক্টোবর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের সভাপতিত্বে এক নীতিগত বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়ে এই দুটি কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হককে চূড়ান্ত পর্যালোচনার আইনি দায়িত্ব দেওয়া হয়। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল বিআরটি প্রকল্প নিয়ে তারা আর সামনে এগোবে না। কিন্তু এখন নতুন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রকল্পটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে তারা চট করে কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। এমনকি এই মেগা প্রজেক্টের ভাগ্য নির্ধারণে জাতীয় সংসদের মতামত নেওয়ার কথাও বলছেন নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ।

অবশ্য বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) মনে করছে, অবকাঠামোগত কাজের মাত্র ৩ শতাংশ বাকি থাকা অবস্থায় এই পর্যায়ে এসে প্রকল্পটি সম্পূর্ণ বাতিল করা ঠিক হবে না। কারণ এগুলো ভাঙতে গেলেও স্টেশন, র‍্যাম্প ও এস্কেলেটর (চলন্ত সিঁড়ি) অপসারণ এবং ঠিকাদারদের ক্ষতিপূরণ বাবদ সরকারের আরও ১ হাজার কোটি টাকার বেশি নতুন করে অপচয় হতে পারে। গত ১৮ মে রাজধানীর বিআইপি কনফারেন্স হলে আয়োজিত ‘গণপরিবহননির্ভর নগর: ঢাকা-গাজীপুর বিআরটির ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনাবিদেরা এমন অর্থনৈতিক মত তুলে ধরেন। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখন প্রকল্পটি বন্ধ করা হলে বিদেশী ঋণ করে যে হাজার হাজার টাকা খরচ করা হয়েছে, তা অনেকটাই সরাসরি পানিতে যাবে। আবার সব যানবাহনের জন্য রাস্তা উন্মুক্ত করতে গেলে আরও কয়েক শ কোটি টাকা খরচ করে নির্মিত অবকাঠামো ভাঙতে হবে। কিন্তু নতুন করে আরও সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা খরচ করে বাস কিনে চালাতে গেলে সেটিও চার লেনের সড়কে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে প্রকল্পটি এখন সরকারের জন্য একটি গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে।

মূলত বিদেশি অর্থায়নের ওপর চরমভাবে নির্ভর করে এই বিআরটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর পাশাপাশি এতে বড় অঙ্কের অর্থায়ন করছে ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা (এএফডি) এবং গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (জিইএফ)। বিআরটি প্রকল্পে বাস কিনে পরিচালনার জন্য ২০১৩ সালে ‘ঢাকা বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড’ (ডিবিআরটিসিএল) নামে একটি নতুন সরকারি কোম্পানি গঠন করা হয়। এই কোম্পানিতে এখন ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা এমডিসহ ১৮ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারী বহাল তবিয়তে রয়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগই ডেপুটেশনে এসেছেন সরকারের অন্য দপ্তর থেকে। যেহেতু আজ পর্যন্ত কোনো বাসই কেনা হয়নি, তাই বিগত এক যুগে তাঁদের টেবিলে তেমন কোনো কাজই ছিল না। সংশ্লিষ্ট বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, পূর্ণাঙ্গ কারিগরি সমীক্ষা ও চূড়ান্ত নকশা হওয়ার আগেই তড়িঘড়ি করে এই বিশাল প্রকল্প অনুমোদন নেওয়া হয়। ফলে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে প্রতি পদে পদে নানাবিধ জটিল সমস্যা তৈরি হয়। যেমন নির্মাণকাজ শুরু করার পর দেখা যায়, প্রকল্প এলাকায় কোনো যথাযথ ড্রেনেজ বা পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা নেই। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো রাস্তা তলিয়ে পানি জমে যাচ্ছে। বিভিন্ন সেবা সংস্থা বা ইউটিলিটি লাইনের পাইপ ও কেবল কীভাবে সরানো হবে, তা-ও আগে থেকে সমীক্ষায় ঠিক করা হয়নি। দেশের ব্যস্ততম এই মহাসড়কে নির্মাণকাজের সময় হাজার হাজার যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার কোনো বিকল্প ট্রাফিক চিন্তাও করেনি কর্তৃপক্ষ।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ‘গ্লোবাল বিআরটি ডাটা’ নামক একটি আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসারে, বর্তমানে বিশ্বের ১৯১টি আধুনিক শহরে অত্যন্ত সফলভাবে এই বিআরটি ব্যবস্থা চালু আছে। এসব বিআরটিতে প্রতিদিন সোয়া তিন কোটি যাত্রী যাতায়াত করেন। এমনকি আমাদের পাশের দেশ ভারতের ১৩টি শহরে বিআরটি ব্যবস্থা চমৎকারভাবে চালু আছে। দেশটির ২২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এসব বিআরটি ব্যবস্থায় প্রতিদিন যাত্রী পরিবহন করা হয় প্রায় পাঁচ লাখ। এ ছাড়া চীনে বিআরটিতে প্রতিদিন চলে প্রায় ৪৪ লাখ এবং তাইওয়ানে চলাচল করে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ যাত্রী। ২০০৫ সালে ঢাকার জন্য বিশদ কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) নিয়েছিল তৎকালীন সরকার। সেখানেই মেট্রোরেল, উড়ালসড়ক ও বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজির পাশাপাশি ঢাকায় বিআরটি চালুর জোর সুপারিশ করা হয়েছিল। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত এই নির্দিষ্ট রুটটি মূল এসটিপিতে বা কৌশলগত পরিকল্পনায় আদৌ অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ২০১১ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) তাদের নিজস্ব স্বার্থে এবং তাদের নিয়োগ করা লবিস্ট ও পরামর্শকদের মাধ্যমে এই পথকে বিআরটির জন্য উপযোগী হিসেবে সরকারের সামনে জোরপূর্বক প্রস্তাব করে এবং ঋণ গিজগিজে এই প্রকল্প চাপিয়ে দেয়। ২০১৯ সালে বিআরটি প্রকল্প থেকে করা এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, টঙ্গী কলেজ গেট থেকে ভোগরা বাইপাস পর্যন্ত অংশে দিনে গড়ে ২৪ হাজার ৭৫৪টি ভারী যানবাহন চলাচল করে। আর ২০২২ সালে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) এক বিশেষ সমীক্ষায় এসেছে, আবদুল্লাহপুর হয়ে দৈনিক প্রায় ৪০ হাজার ছোট-বড় যানবাহন চলাচল করে। এত বিপুল যানবাহনের সড়কে দুই লেনের বিআরটি করা মোটেও যৌক্তিক ছিল না।

নকশা প্রণয়নকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও গুরুতর জালিয়াতি ও গাফিলতির অভিযোগ তুলেছে বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দল। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিআরটি স্টেশন এলাকার কাছে মূল সড়ক এতটাই সরু হয়ে গেছে যে সাধারণ গাড়ি চলার জায়গা নেই। অনেক জায়গায় পদচারী-সেতু বা ফুটওভার ব্রিজের নামার অংশ সাধারণ মানুষের হাঁটার ফুটপাত সম্পূর্ণ গ্রাস বা দখল করে ফেলেছে। আবদুল্লাহপুর, ভোগরা ও গাজীপুর চৌরাস্তার মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশন বা মোড়ে এমন জঘন্য ও ত্রুটিপূর্ণ নকশা করা হয়েছে, যার কারণে সেখানে ভবিষ্যতে অন্য কোনো আধুনিক পরিবহন অবকাঠামো বা ফ্লাইওভার তৈরি করা যাবে না। এই ভজকটের বিআরটি প্রকল্পটির মূল কাজ বাস্তবায়ন করছে সরকারের তিনটি ভিন্ন ভিন্ন সংস্থা, যাদের নিজেদের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ), সেতু বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রকল্পের মূল কাজটি ভাগাভাগি করে করছে। আর বিআরটি পরিচালনা করার জন্য গঠিত হয়েছে সরকারি কোম্পানি ডিবিআরটিসিএল। পুরো প্রকল্প সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)-এর একটি কমিটিকে। এর বাইরে কাজ তদারকিতে নিয়োজিত ছিল চারটি চড়া দামের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান।

সওজের মূল দায়িত্ব ছিল ১৬ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন ও প্রশস্তকরণ, বিশেষ বিআরটি লেন নির্মাণ, ছয়টি ছোট উড়ালসড়ক এবং ২৫টি বিআরটি স্টেশন নির্মাণ করা। অন্যদিকে সাড়ে চার কিলোমিটার উড়ালপথ নির্মাণ, এর মধ্যে বিআরটি লেন তৈরি, ফ্লাইওভারের ওপর স্টেশন নির্মাণ এবং বিদ্যমান জরাজীর্ণ টঙ্গী সেতুর জায়গায় ১০ লেনের একটি বিশাল নতুন আধুনিক সেতু নির্মাণের দায়িত্ব ছিল সেতু বিভাগের ওপর। আর এলজিইডির ভাগের দায়িত্ব ছিল সার্ভিস লেন বা সংযোগ সড়ক ও গাজীপুরে একটি আধুনিক বাস ডিপো নির্মাণ, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রপাতি এবং উন্নত সড়কবাতি বসানো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বে যেসব দেশে বিআরটি প্রকল্প সফল হয়েছে, এর বেশির ভাগই ১২ থেকে ১৪ লেনের চওড়া সড়কে করা হয়েছে। আর আমাদের গাজীপুরে মূল সড়ক মাত্র চার লেনের এবং বিমানবন্দরে ছয় লেনের। এই সরু সড়কের মাঝখান থেকে দুটি লেন স্থায়ীভাবে আলাদা করে দেওয়া চরম বোকামি। এ ছাড়া কোথাও উড়ালপথে, আবার কোথাও মাটির সমতলে বিআরটির পথ করার জোড়াতালির ধারণাটিও সম্পূর্ণ ভুল ছিল। এ ধরনের ব্যস্ত সড়কে বিআরটির পুরোটা উড়ালপথে বা ডেডিকেটেড ফ্লাইওভার করা দরকার ছিল। প্রকল্প-সংক্রান্ত নথি অনুসারে, উড়ালপথ ও সড়ক নির্মাণের মূল দায়িত্ব পালন করছে তিনটি চীনা ঠিকাদারি কোম্পানি। আর গাজীপুরে বাস ডিপো নির্মাণের দায়িত্বে রয়েছে একটি দেশীয় কোম্পানি।

বুয়েটের এই জমা দেওয়া প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো একক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে দায়ী করা হয়নি। তবে তারা স্পষ্ট করে বলেছে, এই হাজার কোটি টাকার জাতীয় প্রকল্প ব্যর্থ হওয়ার পেছনে দায়ীদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন প্রাথমিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রস্তুতকারী পরামর্শক সংস্থা, ভুল নকশা প্রণয়নকারী বিদেশি ডিজাইনার এবং এর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে যুক্ত সরকারের উচ্চপদস্থ আমলা ও প্রকৌশলীরা। দেশের টাকা অপচয়ের জন্য তাঁদের অবশ্যই কঠোর আইনি জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। এ ছাড়া অর্থায়নকারী সংস্থা এডিবি, প্রকল্প পরিচালনা কমিটি, সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এবং পরিকল্পনা কমিশনও এই দায় এড়াতে পারে না। বুয়েটের প্রতিবেদনে এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য ১৭টি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা-গাজীপুর রুটে কমিউটার বা লোকাল ট্রেনের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া, অসমাপ্ত পদচারী-সেতু দ্রুত শেষ করা, শ্রমিক ও পথচারীর চাহিদা অনুযায়ী নতুন নিরাপদ জেব্রা ক্রসিং বা ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা। এ ছাড়া বিআরটি স্টেশনের জন্য কেনা দামি লিফট ও চলন্ত সিঁড়িগুলো নষ্ট হওয়ার আগেই অন্য কোনো সচল সরকারি স্থাপনায় বা মেট্রো স্টেশনে স্থানান্তর করা অথবা উন্মুক্ত নিলামে বিক্রি করে দেওয়ার বাস্তবসম্মত প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান অধ্যাপক সামছুল হক এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিআরটি মূলত একটি চাপিয়ে দেওয়া প্রকল্প ছিল। এর মূল নকশায় গলদ ছিল, সম্ভাব্যতা যাচাই বা ফিজিবিলিটি স্টাডি মোটেও ঠিক ছিল না। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, এসব স্পষ্ট অসংগতি ও জালিয়াতি আমাদের দেশের কোনো বাস্তবায়নকারী সংস্থা, চড়া মূল্যের পরামর্শক, এমনকি পরিকল্পনা কমিশনও শুরুতে ধরেনি বা ধরার চেষ্টা করেনি। এটা দেশের উন্নয়ন ইতিহাসে একটি খুবই বাজে এবং অন্ধকার দৃষ্টান্ত হয়ে রইল। এই অধ্যাপক আরও বলেন, এ ধরনের বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট প্রকল্প বাংলাদেশে প্রথম। ফলে আমাদের দেশীয় প্রকৌশলীদের অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকতেই পারে, সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু পৃথিবীতে তো এই বিষয়ে শত শত অভিজ্ঞ দেশ ও মানুষ ছিল। তাদের পরামর্শ সঠিকভাবে এনে কাজটা করা যেত। এই চরম অপরিপক্ব ও চাপিয়ে দেওয়া প্রজেক্ট এক যুগ ধরে এই রুটের লাখ লাখ মানুষকে নরকযন্ত্রণার মতো দুর্ভোগে ফেলেছে। ঋণের হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু জনগণকে যে দ্রুত যাতায়াতের আশার বাণী শোনানো হয়েছিল, তার এক আনাও তারা পায়নি। এটাকে ভবিষ্যতের জন্য আমাদের একটা মস্ত বড় শিক্ষা হিসেবে নিতে হবে, যাতে আমলা ও বিদেশি সংস্থার স্বার্থে এমন ভুল ও আত্মঘাতী প্রকল্প আর কখনো দ্বিতীয়বার না নেওয়া হয়।


এ সম্পর্কিত আরো খবর