রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় করা বহুল আলোচিত মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন শিশুটির বাবা ও মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লা এবং মা পারভীন আক্তার। তাদের আবেগঘন জবানবন্দিতে উঠে এসেছে মেয়েকে খুঁজে ফেরার উৎকণ্ঠা, প্রতিবেশীদের সহায়তায় দরজা ভাঙার চেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের বিভীষিকাময় মুহূর্ত।
মঙ্গলবার (২ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। সাক্ষ্য দেওয়ার সময় বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তারা। শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ায় একপর্যায়ে তাদের বসার জন্য চেয়ার দেওয়া হয়।
সকাল ১০টা ৩৯ মিনিটে প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লা। তিনি আদালতকে জানান, ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে অফিসের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হন। বনানীর কাকলীতে অফিসে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পর তার স্ত্রী ফোন করে জানান, মেয়ে রামিসাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
খবর পেয়ে দ্রুত বাসায় ফিরে আসেন তিনি। এসে দেখেন, বাসার সামনে ও পাশের ফ্ল্যাটের সামনে বহু লোকজন জড়ো হয়েছেন। তার স্ত্রী জানান, পাশের ফ্ল্যাটে থাকা সোহেল রানা ও স্বপ্নার বাসার ভেতরে রামিসা আটকে থাকতে পারে। তখন কয়েকজন প্রতিবেশী দরজা ভাঙার চেষ্টা করছিলেন।
তিনি আদালতে বলেন, স্ত্রী অনেক ডাকাডাকি করলেও ভেতর থেকে কেউ দরজা খোলেনি। পরে নিচে গিয়ে একটি হাতুড়ি এনে দরজা ভাঙার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তালা ভেঙে যায়। ভেতরে প্রবেশের পর বাথরুমের কাছে রক্ত দেখতে পান। পরে একটি বালতির ভেতরে রামিসার মাথা দেখতে পাওয়া যায়। সেই দৃশ্য দেখে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
জবানবন্দি শেষে আসামিপক্ষের রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মূসা কলিমউল্লাহ তাকে জেরা করেন। জেরার সময় তিনি বলেন, ঘটনার বিষয়ে তিনি যা দেখেছেন, আদালতে কেবল সেটুকুই তুলে ধরেছেন। আসামিদের সঙ্গে তার কোনো পূর্বপরিচয় বা শত্রুতা ছিল না বলেও জানান তিনি।
এরপর দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে আদালতে বক্তব্য দেন রামিসার মা পারভীন আক্তার। ঘটনার দিনের বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, সেদিন তিনি বাসায় রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। বড় মেয়ে রাইসা আক্তার তার চাচার বাসায় যেতে চাইলে ছোট মেয়ে রামিসাও সঙ্গে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করে। পরে বড় মেয়ে একা ফিরে এলে তিনি বুঝতে পারেন, রামিসা সেখানে যায়নি।
মেয়েকে না পেয়ে চারদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন পারভীন আক্তার। তিনি নিচতলা, দোতলা এবং আশপাশের বিভিন্ন স্থানে খুঁজেও কোনো সন্ধান পাননি। একপর্যায়ে পাশের ফ্ল্যাটের সামনে রামিসার একটি জুতা দেখতে পান। তখন সন্দেহ আরও প্রবল হয়।
আদালতে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমি তাকে অনেকবার বলেছি, বইন দরজাটা খুলে দে, তোর কিচ্ছু হবে না। কিন্তু সে দরজা খুলে নাই।”
তিনি আরও জানান, পরে প্রতিবেশীরা জড়ো হয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। ভেতরে ঢুকে বাথরুমের সামনে রক্ত দেখতে পান। এরপর দেখতে পান, তার মেয়ের দেহ এক জায়গায় এবং মাথা আরেক জায়গায় রাখা আছে। সেই দৃশ্য আজও তার চোখের সামনে ভাসে বলে আদালতে উল্লেখ করেন তিনি।
সাক্ষ্যগ্রহণের অংশ হিসেবে পরে শিশু হওয়ায় রামিসার বড় বোন রাইসা আক্তারের জবানবন্দি ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলার আরও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের মধ্যে রয়েছেন ম্যাজিস্ট্রেট, চিকিৎসক, আলামত সংগ্রহকারী কর্মকর্তা এবং স্থানীয় কয়েকজন প্রতিবেশী। তাদের সাক্ষ্যও পর্যায়ক্রমে গ্রহণ করা হবে।
এর আগে সোমবার আদালত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। একই সঙ্গে মামলার বাদীসহ ১৮ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য সমন জারি করা হয়।
মামলার তদন্ত শেষে গত ২৪ মে দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গ্রহণ করে ট্রাইব্যুনাল। পরে মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।
মামলার এ পর্যায়ে বাবা-মায়ের সাক্ষ্যে ঘটনার ভয়াবহতা এবং একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতির চিত্র আবারও সামনে এসেছে। আদালতে দেওয়া তাদের জবানবন্দি উপস্থিত সবাইকে আবেগাপ্লুত করে তোলে।