আজহারুল হক, ময়মনসিংহ / : 50
ময়মনসিংহ প্রতিনিধি:
ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে চোখে-মুখে মরিচের গুঁড়া ছিটিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ কর্মী নাহিয়ান রবিন (২৩) নামে এক কলেজ ছাত্রকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। সে ছাত্রলীগের একজন সক্রিয় কর্মী ছিল। নাহিয়ান রবিন গফরগাঁও পৌর এলাকার শিলাসী গ্রামের রাজমিস্ত্রি মোফাজ্জল হোসেনের ছেলে এবং সে কান্দিপাড়া আব্দুর রহমান ডিগ্রী কলেজের ছাত্র। এ সময় নিহত রবিনের বন্ধু মাসুম (২৪) নামে এক যুবককে পিটিয়ে আহত করে দুর্বৃত্তরা।
রবিন তার ২৩তম জন্মদিনের কেক কেটে সোমবার (৮ জুন) রাত পৌনে ১টার দিকে বাসায় ফেরার পথে পৌর শহরের শিলাসী মাজার বাড়ি রোড এলাকায় এ হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মঙ্গলবার (৯ জুন) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে গফরগাঁও পৌর এলাকার কলেজ রোডের নিজ বাড়ি মোতালেব প্লাজা থেকে ব্যবসায়ী মোতালেব মিয়ার ছেলে নিষিদ্ধ ঘোষিত যুবলীগ কর্মী মো. রাজিব মিয়া (৪১) নামের এক যুবককে আটক করেছে পুলিশ। এ সময় তাঁর কাছ থেকে দুটি পিস্তল, ৭ রাউন্ড তাজা গুলি, ১২ রাউন্ড কার্তুজ, ১০০ পিস ইয়াবা, ১টি সুইস গিয়ার, চাকু উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়াও রাজিবের বাসার সিড়িতে রক্ত পাওয়া গেছে।
পুলিশ বলছে আটক রাজিব ও নিহত রবিন দুজনেই ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সক্রিয় কর্মী ছিল। তাদের দুজনের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ ছিল। দ্বন্দের জের ধরেই এ হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারনা করা হচ্ছে। রাজিবকে আটককালে তার বাসার সিড়িতে রক্ত ছিল। প্রত্যক্ষদর্শী, নিহত পরিবারের লোকজন ও রবিনের বন্ধুদের সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার ছিল নাহিয়ান রবিনের ২৩তম জন্মদিন। এ উপলক্ষে সোমবার রাত ১২টা ১ মিনিটে গফরগাঁও পশু হাসপাতাল রোডের বউ বাজারের পাশেই কেক কাটার আয়োজন করেন তাঁর বন্ধুরা। জন্মদিনের কেক কেটে মায়ের হাতে ভাত খাওয়ার জন্য রবিন বন্ধুদের তাগাদা দেয় দ্রুত অনুষ্ঠান শেষ করার জন্য। অনুষ্ঠান শেষে বন্ধু মাসুমের মোটরসাইকেল যোগে কাছেই বাড়ির পথে রওনা দেয় রবিন। রবিন মোটরসাইকেলের পিছনে বসা ছিল।
রবিনদের বাড়ি থেকে প্রায় ১’শ মিটার দুরে মাজারবাড়ি রোড ও কলাবাগান রোডের মোড়ে মোটরসাইকেলটি পৌছলে আগে থেকে ওৎ পেতে থাকা গামছা দিয়ে মুখ বাঁধা ৫/৬ জনের অজ্ঞাতনামা একদল দূর্বৃত্ত মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে। রবিন ও মাসুমের চোখে মুখে মরিচের গুড়া ছিটিয়ে দেয়। পরে পাইপ দিয়ে রবিন ও মাসুমকে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে রাস্তায় ফেলে দেয়। মাসুম দৌড় দিয়ে বাঁচতে পারলেও সন্ত্রাসীরা রবিনকে ধরে ফেলে। রবিনের হাত, পা ও মাথায় এলোপাথারি কোপাতে থাকে। হামলার শব্দ শুনে আশেপাশের বাসা-বাড়ির লোকজন বারান্দায় এসে ঘটনা দেখে চিৎকার দিলে সন্ত্রাসীরা মাজারবাড়ি রোড এলাকা দিয়ে পালিয়ে যায়।
এলাকাবাসী গুরুতর আহত রবিনকে উদ্ধার করে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। রাত সাড়ে তিনটার দিকে রবিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যায়। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তায় তাজা রক্ত, হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত চাপাতি, রড, পাইপ, গামছা, মরিচের গুড়া ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। রবিনের বন্ধু আহত মাসুম বলেন, রবিন তাড়া দিচ্ছিল তাড়াতাড়ি বাড়ি যাওয়ার জন্য। আমাদের বলছিল তার মা বাড়িতে খাবার নিয়ে বসে আছে। জন্মদিনে মুখে তুলে ভাত খাওয়াবে। সে আরো জানায়, দুর্বৃত্তদের মুখে গামছা বাঁধা থাকায়, জায়গাটি অন্ধকার থাকায় এবং তাদের চোখে মরিচের গুড়া দেওয়ায় কাউকে চিনতে পারেনি।
রবিনের মা শান্তা বেগম (৪২) একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায়। বিলাপ করতে করতে বলেন, "ছেলে আমাকে ফোন করে জানাল, মা আসতেছি। জন্মদিনে তোমার হাতে ভাত খাব। ছেলে তো আসলো না। ছেলের লাশ আসবো। আমি আমার ছেলের খুনীদের ফাঁসি চাই।" নিহত রবিনের পিতা মোফাজ্জল হোসেন (৪৬) কাঁদতে কাঁদতে বলেন, "বাজারের ব্যবসায়ি মোতালেবের ছেলেদের সাথে অনেক আগে আমার ছেলের শত্রুতা ছিল। আমি আমার ছেলের হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।" গফরগাঁও থানার ওসি আ.স.ম আতিকুর রহমান বলেন, ঘটনাস্থল থেকে আলামত হিসেবে চাপাতি, রড, পাইপ, মরিচের গুড়া উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়াও আটক যুবলীগ কর্মী রাজিবের নিজ বাসা থেকে ২টি পিস্তল, ৭ রাউন্ড তাজা গুলি, ১২ রাউন্ড কার্তুজ, ১০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে।
আকাশজমিন / আরআর