ভাঙ্গা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি
বিয়েবাড়ির আনন্দঘন অনুষ্ঠানে সামান্য খাবার কম হওয়াকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে এবার ফরিদপুরের ভাঙ্গায় বিয়েবাড়ির অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদের পাতে গরুর মাংস কম দেওয়াকে কেন্দ্র করে কনেপক্ষ এবং তাদেরই নিজস্ব গ্রামবাসীর মধ্যে এক ভয়াবহ ও লঙ্কাকাণ্ড ঘটে গেছে। মাংস কম দেওয়ার এই তুচ্ছ অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় লাঠিসোঁটা ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপের মাধ্যমে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও বর্বরোচিত ঘটনায় দুই পক্ষের কমপক্ষে ১১ জন মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে রক্তাত্ব ও আশঙ্কাজনক অবস্থায় চারজনকে উদ্ধার করে স্থানীয় ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। বাকিরা বিভিন্ন ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। সোমবার বিকেল ৩টার দিকে ভাঙ্গা উপজেলার কালামৃধা ইউনিয়নের দেওড়া নয়াকান্দি গ্রামে এই হুলস্থুল কাণ্ড ও মারামারির ঘটনাটি ঘটেছে।
স্থানীয় এলাকাবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, সোমবার কালামৃধা ইউনিয়নের দেওড়া নয়াকান্দি গ্রামের বাসিন্দা লাভলু শেখের মেয়ের বিয়ের রাজকীয় অনুষ্ঠান চলছিল। বরযাত্রী আসার পর এবং অন্যান্য অতিথিদের আপ্যায়নের সময় খাওয়ার টেবিলে কনেপক্ষের নিজস্ব আমন্ত্রিত গ্রামবাসীর কয়েকজন যুবক হঠাৎ করে পাতে গরুর মাংস কম দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। কনেপক্ষের পরিবেশনকারীরা এই নিয়ে কথা বললে উভয় পক্ষের মধ্যে প্রথমে তীব্র বাকবিতণ্ডা ও গালাগালি শুরু হয়। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সেই সাধারণ তর্কাতর্কি এক ভয়াবহ রূপ নেয় এবং দুই পক্ষই দেশীয় লাঠিসোঁটা ও ইট-পাটকেল নিয়ে পরস্পরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়া এই সংঘর্ষে পুরো বিয়েবাড়িতে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অতিথিরা দিকবিদিক ছুটতে থাকেন। ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন চারজন হলেন আরিফ মিয়া, শহীদ মাতুব্বর, সোহরাব মাতুব্বর এবং মমতাজ বেগম।
এই বিষয়ে কালামৃধা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল মাতুব্বর ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, বিয়েবাড়িতে গরুর মাংস কম দেওয়ার অভিযোগটি কেবল একটি উছিলা মাত্র। মূলত ওই গ্রামে স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার ও গ্রাম্য দলাদলি নিয়ে পূর্ব থেকেই কিছু অভ্যন্তরীণ সমস্যা বা কোন্দল ছিল। যার জের ধরে দুই পক্ষের মধ্যে এই তুমুল সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এখানে মেয়েপক্ষের সঙ্গে বরপক্ষের কোনো ধরনের ঝামেলা বা ভুল বোঝাবুঝি হয়নি। যাদের সঙ্গে ঝামেলা হয়েছে, তারা সবাই মেয়েপক্ষের নিজেদেরই আমন্ত্রিত অতিথি। সংঘর্ষের পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পর বরসহ বরপক্ষের লোকজন অত্যন্ত নিরাপদে মেয়ের বাড়িতে আসেন এবং কোনো বাধা ছাড়াই মূল বিয়েটি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়।
মেয়ের বিয়েতে এমন বিশৃঙ্খল ঘটনায় কান্নাভেজা কণ্ঠে কনের বাবা লাভলু শেখ বলেন, আমার মেয়ের বিয়েটা ছিল আমাদের পুরো পরিবারের জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও স্বপ্নের একটি দিন। কিন্তু স্থানীয় নোংরা গ্রাম্য দলাদলি ও আধিপত্য বিস্তারের রাজনীতির বলি হতে হলো আমাদের পুরো পরিবারকে। গ্রামের মধ্যে আমরা যাদের অত্যন্ত সম্মান করে দাওয়াত দিয়েছিলাম, তারা শুধু মাংস কম পাওয়ার মতো সামান্য বিষয় নিয়ে এই ঝামেলা করেনি, বরং পূর্বপরিকল্পিতভাবে আমার মেয়ের জীবনের এই বিশেষ আনন্দঘন অনুষ্ঠানটিকে পণ্ড করার জন্যই এই ন্যাক্কারজনক হামলা চালিয়েছে।
পুরো ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান বলেন, মেয়েপক্ষের বাড়িতে গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে তাদের আমন্ত্রিত কিছু অতিথিকে মাংস কম দেওয়া হয়েছে—এমন একটি হাস্যকর অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে এই মারামারি ও সংঘর্ষ হয়েছে। খবর পাওয়া মাত্রই ভাঙ্গা থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও শান্ত রয়েছে। তবে এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই থানায় এসে কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করেননি। লিখিত অভিযোগ পেলে পুলিশ পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।