ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

২০২৬-২৭ বাজেট

ফ্রিজ-টিভি-এসি এবং কম্পিউটার ও মোবাইলের দাম কমানোর মেগা পরিকল্পনা


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ০৯ জুন, ২০২৬ সময় : ৬:৪৬ পিএম

দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফেরানোর এক মহৎ লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হচ্ছে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। আসন্ন এই বাজেটে দেশের শিল্পায়ন, নতুন বিনিয়োগ এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে যাচ্ছে সরকার। এই দূরদর্শী লক্ষ্যকে সামনে রেখে দেশীয় উৎপাদনমুখী শিল্পের বিকাশ ঘটানোর জন্য নজিরবিহীন করছাড়, ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর অব্যাহতি এবং কাঁচামাল আমদানি পর্যায়ে শুল্ক সুবিধা দেওয়ার এক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় শিল্পকে একচেটিয়া সুরক্ষা দিতে এবং ডলারের ওপর চাপ কমাতে বেশ কিছু আমদানিনির্ভর ও বিলাসী পণ্যের ওপর শুল্ক-কর বহুগুণ বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের বাজেটের অন্যতম প্রধান ও আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হতে যাচ্ছে ‘উৎপাদনমুখী করনীতি’। এর অর্থ হলো, যারা দেশের ভেতরে পণ্য উৎপাদন করবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং বিদেশের মাটিতে রফতানি বাড়াবে, তারা ঢালাও কর সুবিধা পাবে। অপরদিকে যেসব পণ্য বিদেশ থেকে প্রস্তুত অবস্থায় আমদানি হয় এবং দেশীয় শিল্পের বাজারে তীব্র নেতিবাচক প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করে, সেসব পণ্যের ওপর করের চাপ অনেকাংশে বাড়ানো হবে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক বিনিয়োগ স্থবিরতার মধ্যে থাকা বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করতে সরকারের এই যুগোপযোগী করনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই করছাড়ের প্রকৃত সুফল সাধারণ ভোক্তার পকেট পর্যন্ত কতটা পৌঁছাবে, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবসায়ীদের সামগ্রিক আচরণের ওপর। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা আশা করছেন, এবারের বাজেটে সবচেয়ে বড় ও অভাবনীয় সুবিধা পেতে যাচ্ছে দেশীয় ইলেকট্রনিক্স ও ইলেকট্রিক্যাল পণ্য উৎপাদন খাত। দেশে উৎপাদিত টেলিভিশন, ফ্রিজ বা রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার (এসি), ওয়াশিং মেশিন এবং অন্যান্য গৃহস্থালি ও ইলেকট্রনিক পণ্যের ওপর বিদ্যমান ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে এক লাভে কমিয়ে মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ করার একটি যুগান্তকারী পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে এসব পণ্য তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-কর ছাড়ের মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। সরকারের প্রবল ধারণা, এতে দেশীয় ইলেকট্রনিক্স পণ্যের উৎপাদন খরচ নাটকীয়ভাবে কমবে, দেশীয় শিল্প আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে এবং ভোক্তারাও বাজারে অনেক কম দামে এই পণ্যগুলো কিনতে পারবেন। বর্তমানে দেশে অন্তত ২২টি বড় ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদন করছে, যেখানে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। সরকার এই খাতকে ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম প্রধান রফতানিমুখী শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে চায়।

তথ্যপ্রযুক্তি বা আইটি খাতেও এবারের বাজেটে বড় ধরনের ডিজিটাল প্রণোদনা থাকছে। দেশে উৎপাদিত ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মনিটর ও মোবাইল ফোনের ওপর থাকা ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা আরও কয়েক বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হচ্ছে। এছাড়া কম্পিউটার যন্ত্রাংশ, প্রিন্টার, ফ্ল্যাশ মেমোরি ও মনিটর উৎপাদনে ব্যবহৃত আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর থাকা অগ্রিম কর (এটি) উল্লেখযোগ্য হারে কমানো হচ্ছে। মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ২২ ধরনের পার্টস ও কাঁচামাল আমদানিতেও করহার কমানোর প্রস্তাব রয়েছে, যার ফলে বাজারে কম্পিউটার ও মোবাইলের দাম বেশ কমতে পারে। স্বাস্থ্যখাতেও রোগীদের জন্য থাকছে স্বস্তির বার্তা। জীবনরক্ষাকারী ওষুধ তৈরির ৬৮ ধরনের কাঁচামালের ওপর থাকা সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হতে পারে। পাশাপাশি হৃদরোগীদের হার্টের রিং, চোখের লেন্স এবং ক্যান্সারের কয়েকটি অত্যন্ত দামি জীবনরক্ষাকারী ওষুধ আমদানিতে ভ্যাট ও কর রেয়াতের প্রস্তাব রয়েছে, যা চিকিৎসার ব্যয় কমাতে ভূমিকা রাখবে।

সবচেয়ে বড় স্বস্তি আসছে নিত্যপণ্যের বাজারে। দেশের বাজারে মূল্যস্ফীতির লাগামহীন চাপ কমাতে ধান, চাল, গম, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মাছ, মাংস, চিনি ও ভোজ্যতেলসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎসে কর কমানোর মেগা পরিকল্পনা করা হয়েছে। বর্তমানে এসব পণ্যের উৎসে কর ১ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে, যা নতুন বাজেটে কমিয়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হচ্ছে। এর ফলে নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত করের চাপ কমবে এবং সাধারণ মানুষ স্বস্তি পাবে। এছাড়া পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌর বিদ্যুৎ ও ব্যাটারি খাতে দীর্ঘমেয়াদি কর সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। সৌর বিদ্যুতের যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক অব্যাহতির মেয়াদ ২০৩১ সাল পর্যন্ত এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে করমুক্ত সুবিধা ২০正৫ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর চিন্তা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ইলেকট্রিক গাড়ি ও ই-বাইক উৎপাদনে বিশেষ কর সুবিধা এবং হাইব্রিড গাড়ি আমদানিতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহারের চিন্তা করা হচ্ছে, যা পরিবেশবান্ধব যানবাহনের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত করবে।

ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে এবার কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য বড় সুখবর থাকছে। ইউটিউবার, ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা এবং অনলাইন সৃজনশীল পেশাজীবীদের ওপর থাকা সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট এবং ৭ শতাংশ আয়কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব বিবেচনা করা হচ্ছে। এছাড়া স্বর্ণালঙ্কারের বাজারে স্বচ্ছতা আনতে স্বর্ণ বিক্রিতে শতাংশভিত্তিক ভ্যাটের পরিবর্তে নির্দিষ্ট পরিমাণ ভ্যাট (ফিক্সড ভ্যাট) আরোপের প্রস্তাব রয়েছে, যা ক্রেতাদের খরচ কমাবে। তবে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে আমদানি করা কাজু বাদাম, বিদেশি প্রসাধনী বা কসমেটিকস, উচ্চমূল্যের হিমায়িত মাছ, সিগারেট ও তামাকজাত পণ্য, নিকোটিন পাউচ, বিদেশি মদ ও বিলাসী খাদ্যপণ্যের দাম বাজেটের কারণে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে। বিশেষ করে প্রতি প্যাকেট সিগারেটের দাম ৫ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এবারের বাজেটের মূল দর্শনই হলো—‘আমদানির পরিবর্তে দেশে উৎপাদন’। সরকার চাইছে দেশের ভেতরে শিল্প স্থাপন হোক, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হোক এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমুক। যদি বাজারে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা যায়, তবে এই দ্বিমুখী কৌশলের মাধ্যমে দেশের শিল্পায়নের এক নতুন ও সমৃদ্ধ দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর