অনলাইন ডেস্ক:
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপকহারে বাংলাদেশি মুসলমানদের বহিষ্কার ও পুশ ইনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সীমান্তসহ পুরো রাজ্যে নতুন করে তীব্র সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। রাজ্যটিতে বসবাসরত বাংলাদেশি মুসলমানদের অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করে এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে, ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর এই প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজ্য সরকার ‘ডিটেক্ট, ডিলেট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ তথা ‘শনাক্তকরণ, ভোটার তালিকা থেকে বাদ এবং বহিষ্কার’ নীতি গ্রহণ করেছে। এরই অংশ হিসেবে প্রতিনিয়ত শত শত মুসলিম অভিবাসীকে ধরে বাংলাদেশ সীমান্তে জড়ো করা হচ্ছে।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে, যা বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম সীমান্ত। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বাংলা ভাষা ব্যাপকভাবে প্রচলিত। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে দরিদ্র শ্রমিকদের বাংলাদেশ থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত ও বসতি স্থাপনের ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি সরকার অবৈধ মুসলিম অভিবাসীদের বিরুদ্ধে চিরুনি অভিযান শুরু করেছে। এমনকি তাদের সাময়িকভাবে আটকে রেখে দেশে ফেরত পাঠাতে ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা বন্দিশিবির নির্মাণের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকারের এমন পদক্ষেপ বাংলাদেশিসহ পশ্চিমবঙ্গের বহু ভারতীয় মুসলমানের মনেও চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, সরকারের এই অভিযান কেবল আইনি অবস্থানের ভিত্তিতে নয়, বরং ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতেও পরিচালিত হচ্ছে। এর আগে ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে বিজেপি-শাসিত আসাম রাজ্যেও বহু ভারতীয় মুসলমানকে জোরপূর্বক অবৈধ বাংলাদেশি সাজিয়ে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, যা নিয়ে দীর্ঘ উত্তেজনা চলে। বর্তমান পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গেও একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সম্প্রতি অবৈধ বাংলাদেশি মুসলিম অভিবাসীদের বহিষ্কারের নির্দেশ দেওয়ার পর মে মাসের শেষ দিক থেকে হাকিমপুরসহ বিভিন্ন সীমান্ত চেকপোস্টে প্রতিদিন শত শত বাংলাদেশি অভিবাসীর ভিড় বাড়ছে। শুভেন্দুর এই ঘোষণায় মূলত মুসলিম বাংলাদেশিদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যেখানে বিতর্কিত সাংবিধানিক সংশোধনীর আওতায় হিন্দু ও অন্যান্য অমুসলিম ধর্মাবলম্বী অভিবাসীদের ছাড় দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আটক ব্যক্তিদের আদালতে না নিয়ে সরাসরি দেশে ফেরত পাঠানো হবে। ইতিমধ্যেই প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশি নাগরিককে বহিষ্কার করার কথা জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, রাজ্যের প্রতিটি জেলায় হোল্ডিং সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। সেখান থেকে ৪ হাজার ৮০০ অনুপ্রবেশকারীকে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং বাকিদেরও শিগগির বহিষ্কার করা হবে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে এই পুশ ইন প্রক্রিয়া নতুন সংকট তৈরি করেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, পুশ ইন ঠেকাতে ভারতের কাছে ইতিমধ্যে ১২-১৩টি চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং অবৈধ অভিবাসীদের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য নির্ধারিত আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, ৪ জুনের পর থেকে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) অন্তত ১৮ বার প্রায় ১৮০ জনকে বাংলাদেশে জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, তবে সবগুলো চেষ্টা সফলভাবে প্রতিহত করেছে বিজিবি। অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, ভারতে অবৈধভাবে অবস্থানকারী সব বিদেশি নাগরিকের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং নাগরিকত্ব যাচাই সম্পন্ন হলেই বহিষ্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে। এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া পরিচালক ইলাইন পিয়ারসন এবং মানবাধিকারকর্মী তিস্তা সেতালভাদ তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে এই বহিষ্কার কার্যক্রমকে ‘অবৈধ’ ও নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে টার্গেট করার রাজনৈতিক এজেন্ডা বলে অভিহিত করেছেন।