ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

র‍্যাব-পুলিশ অভিযানে মূল্যবৃদ্ধি থামবে না

বৈধ আয় বাড়লে দুর্নীতি কমবে: অর্থমন্ত্রী


  • আপলোড সময় : শনিবার ১৩ জুন, ২০২৬ সময় : ১:২৮ এএম

দেশে চলমান অর্থনৈতিক সংকট ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে র‍্যাব-পুলিশ কিংবা কোনো ধরনের প্রশাসনিক বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযানের ওপর নির্ভর না করে কার্যকর অর্থনৈতিক নীতি, বাজার ব্যবস্থার দক্ষ পরিচালনা এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো অত্যন্ত জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, বাজারে পণ্যের দাম কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সামগ্রিক বাজার সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ব্যবসায়িক অদক্ষতা দূর করা, অতিরিক্ত ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ব্যয় কমানো এবং সরকারের পক্ষ থেকে গৃহীত কাঠামোগত সংস্কারগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করার কোনো বিকল্প নেই।

শুক্রবার (১২ জুন) বিকেলে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অর্থ মন্ত্রণালয় আয়োজিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট-উত্তর এক সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ প্রতিপাদ্য নিয়ে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮頃 কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। এটি স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট এবং বর্তমান সরকারের মেয়াদকালে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি এবং দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের বা জিডিপির ১৩.৭ শতাংশ।

সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী দেশের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতি এবং সামষ্টিক অর্থনীতির নানাদিক নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ ও বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে দেশের সামষ্টিক মূল্যস্ফীতির ওপর বিভিন্ন ধরনের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ রয়েছে, যার সঙ্গে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি যুক্ত হয়েছে। এর বাইরে দেশের ব্যাংক খাতে বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি এবং বিগত সরকারের আমলে ব্যাপক হারে অর্থ পাচারের কারণে ব্যাংকগুলোর তহবিলের ব্যয় বা কস্ট অব ফান্ড অনেক বেশি রয়েছে, যার সরাসরি ও সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রতিফলন পড়ছে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ও খুচরা বাজারের ওপর। বিশ্ববাজারে আমদানিকৃত কাঁচামাল ও নিত্যপণ্যের দাম ক্রমাগত বাড়ার কারণেও দেশের বাজারে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখা যাচ্ছে। এই জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলায় বর্তমান সরকার দেশে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বা কস্ট অব ডুইং বিজনেস কমাতে বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা কিংবা আমদানি-রপ্তানির প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন পেতে বাংলাদেশে বর্তমানে অন্তত ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়, যেখানে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য ও বিভিন্ন দপ্তরে গিয়ে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত অদৃশ্য ব্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের চড়া সুদের হার, দেশের বন্দরগুলোতে পণ্য খালাস থেকে শুরু করে চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত নানা ধাপের অতিরিক্ত খরচ এবং বিভিন্ন খাতের প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতার কারণে ব্যবসার সামগ্রিক ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক কারণে যে মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়, সেখানে সরকারের সরাসরি করার খুব বেশি কিছু থাকে না মন্তব্য করে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অভ্যন্তরে যেসব কারণে ব্যবসার কৃত্রিম ব্যয় বাড়ে, সেগুলো শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে মূল্যস্ফীতির ওপর একটি বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশ্বব্যাপী ব্যবসা সহজীকরণের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত নিচের দিকে থাকায় এখানে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও অনেক বেশি, যা আমূল পরিবর্তনের জন্য সরকার বিভিন্ন ধরনের নিয়ন্ত্রক সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয় কমানোর ঐতিহাসিক উদ্যোগ নিয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থাকে পুরোপুরি কার্যকর রাখার ওপর বিশেষ তাগিদ দিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, পণ্যের মূল উৎস বা উৎপাদনস্থল থেকে শুরু করে চূড়ান্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইনকে নিয়মিত আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি, খাদ্য ও সারসহ অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ক্ষেত্রে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা থাকতে হবে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে অন্তত তিন মাসের অগ্রিম মজুত এবং খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত রাষ্ট্রীয় গুদামজাতকরণ ও সংরক্ষণ সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, অতীতে অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বাইরে গিয়ে আন্তর্জাতিক খোলা বাজার বা স্পট মার্কেট থেকে তাৎক্ষণিক ক্রয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে, যেখানে বিশ্ববাজারের মূল্যের ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না, তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত গুদাম ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং কৌশলগত রাষ্ট্রীয় মজুত গড়ে তোলা গেলে আমদানি ব্যয় অনেক কমানো সম্ভব।

একই সঙ্গে দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা আনা, আমলাতান্ত্রিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং বন্দরকেন্দ্রিক দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি কমানো গেলে সামগ্রিক ব্যবসার খরচ এবং পণ্যের পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। সংবাদ সম্মেলনে সরকারি কর্মচারীদের সম্ভাব্য বেতন বৃদ্ধি সরকারি খাতের দুর্নীতি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে কি না- এমন একটি সরাসরি প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী অত্যন্ত খোলামেলাভাবে বলেন, মানুষের যখন মৌলিক অভাব থাকে, তখন জীবনধারণের তাগিদে দুর্নীতির দিকে ঝোঁকার একটি মনস্তাত্ত্বিক ও বাস্তব প্রবণতা তৈরি হয়, এটি সমাজ বা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার একটি নির্মম সত্য এবং তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।


দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন কাঠামো বা জাতীয় পে-স্কেল প্রায় ১১ বছর ধরে নতুন করে সমন্বয় করা হয়নি এবং এই দীর্ঘ সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে। ফলে সেই কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দ্রুত পুনর্নির্ধারণ ও সমন্বয় করা জরুরি হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, বেসরকারি খাতে অনেক ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি ও বাজারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে প্রতিনিয়ত বেতন বৃদ্ধি পাওয়ায় এই দুই খাতের চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার মধ্যে একটি বড় ধরনের সামাজিক বৈষম্য তৈরি হয়েছে। নতুন বাজেটের ধারাবাহিকতায় সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর অর্থনৈতিক সমস্যা দূর করে যখন তাদের বৈধ আয় বাড়বে এবং জীবনযাত্রা উন্নত হবে, তখন মাঠপর্যায়ে ও দাপ্তরিক ক্ষেত্রে দুর্নীতি স্বাভাবিকভাবেই অনেকাংশে কমে আসবে বলে জানান তিনি।

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি পুরোপুরি সচল ও স্থিতিশীল হতে দীর্ঘ সময় লাগবে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি অত্যন্ত কঠিন এবং জটিল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং একে টেকসই ও সমৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে নিতে সময় প্রয়োজন। আগামী অন্তত দুই বছর কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় ব্যয়কে এগিয়ে নিতে হবে এবং এরপর ধীরে ধীরে সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে, যার সুফল হিসেবে চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে গিয়ে দেশের অর্থনীতি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াবে। বর্তমান সরকার অতীতে নেওয়া তথাকথিত বড় বড় ও অনুৎপাদনশীল মেগা প্রকল্পের মোহের বাইরে গিয়ে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ এবং বিনিয়োগের প্রকৃত সুফল নিশ্চিত করার দিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে এবং এখন থেকে প্রতিটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে ভ্যালু ফর মানি বা অর্থের সঠিক ব্যবহার কঠোরভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর