চলতি অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নে বড় ধরণের ঋণের বোঝা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিকূলতার মুখে পড়েছে সরকার। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় এখন থেকে আর ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না থেকে অর্থায়নের বিকল্প ও টেকসই উৎস অনুসন্ধানের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। রোববার (২১ জুন) রাজধানীর গুলশানে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত বাজেট-পরবর্তী এক আলোচনা সভায় সরকারের এমন দূরদর্শী ভাবনার কথা জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেন যে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট প্রণয়ন করা অত্যন্ত জটিল ছিল। বিশ্বজুড়ে নানামুখী অর্থনৈতিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে যে ধরণের আর্থিক অনুদান বা সহযোগিতা পাওয়ার কথা ছিল, তা আগের চেয়ে অনেকটাই সংকুচিত হয়ে এসেছে। এমন একটি প্রতিকূল ও সংকুচিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সরকারকে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ও বাস্তবসম্মত একটি বাজেট পেশ করতে হয়েছে।
বাজেটের সীমাবদ্ধতা ও বিশাল বকেয়া ঋণের বোঝা নিয়ে অর্থমন্ত্রী অকপটে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, এবারের বাজেটকে কোনোভাবেই শতভাগ নিখুঁত বা 'পারফেক্ট' বলা যাবে না। কারণ দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখা গেছে, প্রতিটি খাতেই বিপুল পরিমাণ বকেয়া পড়ে রয়েছে। যে খাতেই হাত দেওয়া হচ্ছে, সেখানেই শুধু দেনা আর বকেয়ার পাহাড়। এই বিশাল ঘাটতি মাথায় নিয়ে মাত্র দেড় মাসের একটি সংক্ষিপ্ত সময়ে সরকারকে এই বিশাল বাজেট প্রস্তুত করতে হয়েছে। অথচ একটি পূর্ণাঙ্গ ও ত্রুটিহীন বাজেট প্রণয়নের জন্য স্বাভাবিক সময়ে অন্তত ছয় মাসের প্রস্তুতিমূলক সময় প্রয়োজন হয়। সময় স্বল্পতার কারণে অনেক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সব ক্ষেত্রে নিখুঁতভাবে পরিকল্পনা সাজানো সম্ভব হয়নি।
দেশের শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষের বর্তমান অর্থনৈতিক কষ্ট লাঘবে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কথাও উল্লেখ করেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের বেতন সরাসরি নির্ধারণ বা পরিশোধ করা সরকারের কাজ নয়। তবে সাধারণ মানুষের বাজারের চাপ কমাতে এবং কিছুটা স্বস্তি দিতে ফ্যামিলি কার্ড বা পারিবারিক রেশন কার্ড কার্যক্রমকে আরও জোরদার করা হচ্ছে। এই ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের ক্ষেত্রে অতীতে যেসব অনিয়ম ছিল, তা দূর করে এবার সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও সঠিকভাবে তা প্রকৃত সুবিধাভোগীদের মাঝে বিতরণ নিশ্চিত করা হবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের খেটে খাওয়া মানুষ অন্তত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে কিছুটা আর্থিক সুবিধা পাবেন, যা এই কঠিন সময়ে তাদের দৈনন্দিন জীবনে কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দেবে।
সরকারের শীর্ষ পর্যায় এখন বাজেট বাস্তবায়নের পাশাপাশি আয়ের নতুন খাত তৈরিতে মনোযোগ দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি ঋণ ও অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যেও সেই সতর্কতার আভাস মিলেছে। করের আওতা বাড়ানো, রাজস্ব ফাঁকি রোধ করা এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণের নতুন কৌশল কাজে লাগিয়ে কীভাবে স্বনির্ভরতা অর্জন করা যায়, এখন সেটাই সরকারের মূল লক্ষ্য।