ফিরোজ আলম মিলন
গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগ, আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগের পাশাপাশি গণমাধ্যমও জনগণের অধিকার রক্ষা, ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং সত্য প্রকাশের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের দেশের গণমাধ্যমের সেই কাঙ্ক্ষিত শক্তি, স্বাধীনতা ও সাহস কতটুকু রয়েছে? গণমাধ্যমের মেরুদণ্ড সত্যিকার অর্থে শক্ত হবে কবে? স্বাধীনতা উত্তর গণমাধ্যমে প্রথম খড়গ নেমে আসে ১৯৭৪ সালে। গুটিকয়েক সংবাদপত্র চালু রেখে বাকি সকল সংবাদ মাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া হয়। ইতোপূর্বে সরকারের আমলেও অনেক গণমাধ্যম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। যা সম্পূর্ণরূপে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত। গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সচেষ্ট হয়ে কোন তথ্যগত ভুল থাকলে তা শুধরে নেওয়ার সতর্কতা দেওয়াই শ্রেয় বলে মনে করেন গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজনেরা। সত্য প্রকাশে নির্বিকতায় বাধার সৃষ্টি করা হয়ে ছিল বারংবার।।তারই ধারাবাহিকতায় গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী অনেক গণমাধ্যমের উপরে তথাকথিত আক্রোশের কারণে বন্ধ বড় ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে সংবাদ মাধ্যম নয় শুধু এর সাথে সংশ্লিষ্ট অনেক সংবাদ কর্মী।সত্য প্রকাশের সাহসই একটি গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় শক্তি। অথচ বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক গণমাধ্যম নানামুখী চাপ, প্রভাব, রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক সংকট এবং মালিকানাগত স্বার্থের কারণে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। ফলে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠতা অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
গণমাধ্যমের কাজ কারও পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া নয়। বরং সত্য তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা, অনিয়ম-দুর্নীতি প্রকাশ করা, সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করাই সংবাদমাধ্যমের প্রধান দায়িত্ব। যখন কোনো গণমাধ্যম সত্যকে আড়াল করে, পক্ষপাতমূলক সংবাদ প্রকাশ করে কিংবা আর্থিক বা রাজনৈতিক স্বার্থে নীরব থাকে, তখন শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, পুরো সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে সংবাদ পরিবেশনের ধরন বদলে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত বিস্তারের কারণে যে কেউ তথ্য প্রচার করতে পারছে। কিন্তু তথ্য আর সংবাদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। যাচাই-বাছাই ছাড়া প্রচারিত তথ্য অনেক সময় গুজব, বিভ্রান্তি ও সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দেয়। এই পরিস্থিতিতে পেশাদার গণমাধ্যমের দায়িত্ব আরও বেড়েছে। কারণ জনগণ এখন এমন একটি সংবাদমাধ্যম চায়, যেখানে থাকবে সত্যতা, নির্ভুলতা, দায়িত্বশীলতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক সময় দেখা যায় গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুর চেয়ে তুচ্ছ বিষয়কে বড় করে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আবার কিছু স্পর্শকাতর বিষয় নানা কারণে যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে প্রেস বিজ্ঞপ্তিনির্ভর সাংবাদিকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে সমাজের প্রকৃত সমস্যা অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়।সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একজন সাংবাদিক যদি নিজের চাকরি, নিরাপত্তা কিংবা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত কাজ করতে বাধ্য হন, তাহলে তাঁর কাছ থেকে শতভাগ স্বাধীন সাংবাদিকতা আশা করা কঠিন। তাই সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য বেতন, আইনি সুরক্ষা এবং পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব।অন্যদিকে গণমাধ্যমের মালিকানার প্রশ্নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন কোনো সংবাদমাধ্যমের মালিকের ব্যবসায়িক, রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ সংবাদ পরিবেশনে প্রভাব ফেলে, তখন সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়। সংবাদকক্ষের সিদ্ধান্ত যদি সংবাদমূল্য নয়, বরং স্বার্থের ভিত্তিতে নেওয়া হয়, তাহলে জনগণের আস্থা ধীরে ধীরে কমে যায়।
সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় সম্পদ হচ্ছে জনগণের বিশ্বাস। এই বিশ্বাস একদিনে তৈরি হয় না, আবার একদিনেই হারিয়েও যেতে পারে। তাই প্রতিটি সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, একাধিক সূত্র নিশ্চিত করা এবং নৈতিক সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি।
আজ অনেক সাংবাদিক প্রতিকূল পরিবেশেও সাহসিকতার সঙ্গে সত্য তুলে ধরছেন। দুর্নীতি, অনিয়ম, মাদক, সন্ত্রাস, পরিবেশ ধ্বংস, নারী ও শিশু নির্যাতন, সড়ক দুর্ঘটনা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরে তারা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে ভূমিকা রাখছেন। তাদের এই অবদান নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে একই সঙ্গে কিছু অসাধু ব্যক্তি সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেন, যা পুরো সাংবাদিক সমাজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। এই প্রবণতা বন্ধে সাংবাদিক সংগঠনগুলোকেও আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে দায়িত্বহীনতা নয়। যেমন সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে, তেমনি মিথ্যা সংবাদ, অপপ্রচার, মানহানি কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য প্রচারের বিরুদ্ধে যথাযথ জবাবদিহিও থাকতে হবে। স্বাধীনতা ও দায়িত্ব একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।রাষ্ট্রেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে নয়, বরং উন্নয়নের সহায়ক হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। কারণ একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী গণমাধ্যম সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরলেও একই সঙ্গে ভালো উদ্যোগগুলোকেও জনগণের সামনে তুলে ধরে। সমালোচনা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে না, বরং আরও শক্তিশালী করে।
গণমাধ্যমের আর্থিক সংকটও আজ বড় বাস্তবতা। বিজ্ঞাপন বাজারের পরিবর্তন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রতিযোগিতা এবং পাঠকের অভ্যাস বদলে যাওয়ার কারণে অনেক সংবাদমাধ্যম টিকে থাকার লড়াই করছে। এই আর্থিক দুর্বলতা অনেক সময় সম্পাদকীয় স্বাধীনতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই গণমাধ্যম শিল্পকে টেকসই করার জন্য সময়োপযোগী নীতিমালা, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই।বর্তমান যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সাংবাদিকতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তবে প্রযুক্তি কখনোই সাংবাদিকতার বিবেক হতে পারে না। তথ্য সংগ্রহে প্রযুক্তি সহায়তা করতে পারে, কিন্তু সত্য-মিথ্যা যাচাই, মানবিক মূল্যবোধ এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দায়িত্ব মানুষকেই পালন করতে হবে।
গণমাধ্যমের শক্তি বাড়াতে সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় বিনিয়োগ, তথ্য অধিকার আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ আরও সহজ করতে হবে। একই সঙ্গে পাঠকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। গুজব ছড়ানো নয়, বরং যাচাইকৃত সংবাদ পড়া, শেয়ার করা এবং সচেতন নাগরিক হিসেবে সংবাদ বিশ্লেষণের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম কখনো রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ নয়। বরং এটি রাষ্ট্রের আয়না। সেই আয়নায় সমাজের ভালো-মন্দ, সফলতা-ব্যর্থতা, দুর্নীতি-সাফল্য সবকিছুই প্রতিফলিত হয়। আয়না ভেঙে ফেললে যেমন মুখের দাগ দূর হয় না, তেমনি সংবাদমাধ্যমকে দুর্বল করলেও সমাজের সমস্যাগুলো দূর হয় না।
গণমাধ্যমের মেরুদণ্ড তখনই শক্ত হবে, যখন সাংবাদিকরা ভয়মুক্ত পরিবেশে সত্য প্রকাশ করতে পারবেন, সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে, মালিকানাগত ও রাজনৈতিক প্রভাবে সম্পাদক পরিবর্তনের মিউজিক্যাল চেয়ার খেলা কমবে, পেশাগত নৈতিকতা কঠোরভাবে অনুসরণ করা হবে এবং জনগণও দায়িত্বশীল সংবাদকে মূল্যায়ন করবে। একটি স্বাধীন, নির্ভীক, বস্তুনিষ্ঠ ও জবাবদিহিমূলক গণমাধ্যমই পারে গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, স্বচ্ছ ও মানবিক বাংলাদেশ গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে। গণমাধ্যমের মেরুদণ্ড শক্ত হওয়া শুধু সাংবাদিক সমাজের দাবি নয়, এটি পুরো জাতির প্রয়োজন।
লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট
আকাশজমিন / আরআর