ফারজাদ আরহান রাজু
আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে জেগে থাকা পর্তুগালের এক ছোট্ট, অনুন্নত দ্বীপ মাদেইরা। সেই দ্বীপের এক জরাজীর্ণ, ভাঙা ঘরে জন্ম নেওয়া এক কৃশকায় বালক আজ বিশ্ব ফুটবলের একচ্ছত্র সম্রাট। তিনি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো দস সান্তোস আভেইরো—বিশ্ব যাকে চেনে 'CR7' নামে। যার গোল উৎসবের চেনা গর্জন ‘সিউউউ’ (Siuuu) আজ টোকিও থেকে নিউ ইয়র্ক, ঢাকা থেকে রিয়াদ—কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর কণ্ঠের হুঙ্কার।
কিন্তু
এই ঝকঝকে সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে আছে এক বুক
ভাঙা কান্না, চরম দারিদ্র্য, হৃদরোগের
সাথে লড়াই এবং একরোখা
এক জেদ। এটি কেবল
একজন ফুটবলারের গল্প নয়; এটি
হলো মানুষের ইচ্ছাশক্তি ও কঠোর পরিশ্রমের
চূড়ান্ত সীমানা ছোঁয়ার এক অবিশ্বাস্য মহাকাব্য।
মাদেইরার সেই অন্ধকার ঘর:
গর্ভপাতের চেষ্টা থেকে জন্ম নেওয়া
এক ‘অবাঞ্ছিত’ শিশু
১৯৮৫
সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি। মাদেইরার
রাজধানী ফুঞ্চালের সাও পেদ্রো প্যারিশের
এক দরিদ্র পরিবারে যখন মারিয়া ডোলোরেসের
কোল আলো করে quarto (চতুর্থ)
সন্তানটি এলো, তখন আনন্দের
চেয়ে চিন্তার রেখাই বেশি ছিল মায়ের
কপালে। ঘরে তীব্র অভাব,
আতিথেয়তা শিল্পে বাবুর্চি আর পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করা
মায়ের পক্ষে আরেকটি সন্তানের মুখে অন্ন তুলে
দেওয়া ছিল অসম্ভব। বাবা
জোসে দিনিস অ্যাভেইরো ছিলেন জান্তা দে ফ্রেগুসিয়ার একজন
সাধারণ মিউনিসিপ্যাল মালি। পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক войне অংশ নিয়ে মানসিকভাবে
বিধ্বস্ত দিনিস ডুবে থাকতেন মদ্যপানের
অতল অন্ধকারে।
দারিব্র্য
আর স্বামীর মদ্যপানের কারণে মা ডোলোরেস এই
সন্তানকে পৃথিবীতেই আনতে চাননি। তিনি
ডাক্তারের কাছে গিয়ে গর্ভপাত
করানোর আকুতি জানিয়েছিলেন। কিন্তু ডাক্তার সাফ মানা করে
দেন। নিরুপায় মা ঘরে এসে
গরম বিয়ার খেয়ে তীব্র দৌড়ঝাঁপ
করেছিলেন, যাতে গর্ভের সন্তানটি
নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু
বিধাতার লিখন কে বদলাবে?
সব বাধা উপেক্ষা করে
পৃথিবীতে এলেন ক্রিশ্চিয়ানো। মার্কিন
প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগানের অন্ধ ভক্ত বাবা
ছেলের নাম রাখলেন 'রোনালদো'। সব ভাইবোনের
সাথে একটি ছোট্ট স্যাঁতসেঁতে
ঘরে বড় হতে লাগলেন
তিনি, যেখানে নুন আনতে পান্তা
ফুরাত।
বন্ধুর এক মহান আত্মত্যাগ:
আলবার্ট ফানত্রাউ ও বদলে যাওয়া
জীবন
কিশোর
ক্রিশ্চিয়ানোর ফুটবলার হয়ে ওঠার পেছনে
রয়েছে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম সেরা ও আবেগঘন
এক বন্ধুত্বের গল্প। রোনালদো তখন মাদেইরার স্থানীয়
অ্যাকাডেমিতে খেলেন। একদিন পর্তুগালের অন্যতম শীর্ষ ক্লাব স্পোর্টিং সিপির স্কাউটরা লিসবন থেকে দ্বীপে এলেন
নতুন প্রতিভার খোঁজে। তারা রোনালদো ও
তাঁর পরম বন্ধু আলবার্ট
ফানত্রাউ-এর খেলা দেখে
একটি শর্ত দিলেন—আজকের
ম্যাচে যে সবথেকে বেশি
গোল করতে পারবে, তাকেই
লিসবনের মূল একাডেমিতে নিয়ে
যাওয়া হবে।
সেই
ঐতিহাসিক ম্যাচে রোনালদোর দল ৩-০
গোলে জয়লাভ করে। প্রথম গোলটি
করেন রোনালদো নিজেই। দ্বিতীয় গোলটি চমৎকার হেডে করেন আলবার্ট।
ম্যাচের শেষ মুহূর্তে তৈরি
হলো এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য।
আলবার্ট উইং দিয়ে বল
কাটিয়ে গোলকিপারকে একা পেয়ে যান।
ফাঁকা পোস্ট, আলবার্ট চাইলেই শট নিয়ে গোল
করে নিজের ভাগ্য বদলে নিতে পারতেন।
কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে
আলবার্ট নিজে গোল না
করে বলটি পাশে থাকা
রোনালদোকে পাস দেন এবং
রোনালদো সহজ গোল করেন।
ম্যাচ
শেষে রোনালদো যখন অবাক হয়ে
আলবার্টকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করেছিলেন,
"তুই নিজে গোল না
করে আমাকে কেন দিলি?" আলবার্ট
পরম মমতায় বন্ধুর পিঠে হাত রেখে
বলেছিলেন, "কারণ তুই আমার
চেয়ে অনেক ভালো খেলোয়াড়,
তোর বিশ্বসেরা হওয়া উচিত।" আলবার্ট
নিজে আর বড় ফুটবলার
হতে পারেননি, পরবর্তীতে ফুটবল ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু
রোনালদো তাঁর বন্ধুর সেই
অবদান ভুলে যাননি। বিশ্বসেরা
হওয়ার পর রোনালদো আলবার্টের
পুরো সংসারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। আলবার্টকে
তিনি উপহার দিয়েছেন বিলাসবহুল বাড়ি, দামী গাড়ি এবং
আজীবন রাজকীয়ভাবে বেঁচে থাকার সব ব্যবস্থা। এই
এক আত্মত্যাগই বদলে দিয়েছিল বিশ্ব
ফুটবলের ইতিহাস।
চোখের জল আর ছেঁড়া
জুতো: লিসবনের নিঃসঙ্গ প্রবাস
১২
বছর বয়সে এই বিস্ময়
বালকের যখন স্পোর্টিং সিপি-তে পাকাপাকিভাবে ডাক
এলো, তখন তা আনন্দের
চেয়ে বেশি মানসিক যন্ত্রণা
বয়ে এনেছিল। মাত্র ১,৫০০ পাউন্ডের
বিনিময়ে কিশোর রোনালদোকে চুক্তিবদ্ধ করে তারা। কিন্তু
এই চুক্তি রোনালদোর জীবনে বয়ে এনেছিল চরম
মানসিক কষ্ট। ১২ বছরের এক
শিশুকে তার চেনা মাদেইরা
দ্বীপ, প্রিয় মা আর পরিবার
ছেড়ে চলে আসতে হলো
সম্পূর্ণ অচেনা শহর লিসবনে।
মাদেইরার
আঞ্চলিক টানে কথা বলার
কারণে স্পোর্টিংয়ের একাডেমিতে অন্য ছেলেরা এবং
শিক্ষকেরা তাকে নিয়ে প্রতিনিয়ত
উপহাস করত। একা একা
বাথরুমে গিয়ে ঘণ্টার পর
ঘণ্টা কাঁদতেন এই কিশোর। বাড়ি
ফেরার জন্য ছটফট করতেন।
কিন্তু তার চোখজুড়ে ছিল
একটাই স্বপ্ন—মাকে এই চরম
দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করা।
১৪
বছর বয়সে লিসবনের স্কুলে
এক শিক্ষক তার আঞ্চলিক টান
এবং দারিদ্র্য নিয়ে তীব্র কটূক্তি
করলে অপমানে ও ক্ষোভে রোনালদো
শিক্ষকের দিকে চেয়ার ছুঁড়ে
মারেন। ফলে স্কুল থেকে
তাকে বহিষ্কার করা হয়। মা
ডোলোরেস তখন ছেলের চোখের
দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, "পড়াশোনা লাগবে না বাবা, তুমি
ফুটবলটাই খেলো।" সেই থেকে শুরু
হলো ফুটবলের সাথে রোনালদোর অবিচ্ছেদ্য
এক আত্মার মিতালি।
যখন থেমে যেতে পারত
হৃদস্পন্দন: মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরা
ফুটবল
যখন রোনালদোর ধ্যানজ্ঞান, তখনই তার জীবনে
নেমে আসে এক চরম
আঘাত। মাত্র ১৫ বছর বয়সে
ডাক্তাররা পরীক্ষা করে জানালেন, রোনালদোর
'ট্যাকিকার্ডিয়া'
(Tachycardia) নামক এক জটিল হৃদরোগ
রয়েছে। এর অর্থ, যখন
সে বিশ্রামে থাকে, তখনও তার হার্টবিট
বা হৃদস্পন্দন স্বাভাবিকের চেয়ে বহুগুণ দ্রুত
চলে। ফুটবল খেলার মতো তীব্র পরিশ্রমের
কাজ তার জন্য যেকোনো
মুহূর্তে মৃত্যুর কারণ হতে পারত।
ফুটবল ক্যারিয়ার তো বটেই, জীবনটাই
পড়ে গেল চরম ঝুঁকিতে।
কিন্তু
রোনালদো হেরে যাওয়ার পাত্র
ছিলেন না। চিকিৎসকদের পরামর্শে
এক ঝুঁকিপূর্ণ লেজার হার্ট সার্জারির (Cardiac Ablation)
সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। লেজার দিয়ে
তার হৃদপিণ্ডের অতিরিক্ত রক্ত চলাচলের পথ
পুড়িয়ে এক করা হয়।
মা ডোলোরেস হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে শুধু ঈশ্বরের কাছে
প্রার্থনা করছিলেন। অস্ত্রোপচার সফল হলো। আর
অবিশ্বাস্য ব্যাপার হলো, হাসপাতাল থেকে
ছাড়া পাওয়ার মাত্র কয়েকদিন পরেই সেই কিশোর
বুকে বল নিয়ে আবার
নেমে পড়লেন স্পোর্টিং সিপির প্র্যাকটিস গ্রাউন্ডে। যে হার্ট তাকে
থামিয়ে দিতে চেয়েছিল, সেই
হার্টই যেন তাকে বিশ্বের
দ্রুততম মানবদের একজন বানানোর শক্তি
জোগাল।
স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের জাদুকরী চোখ ও সেই
বিখ্যাত ‘১০০ পাউন্ড’-এর
বাজি
২০০৩
সালের ৬ই আগস্ট। স্পোর্টিং
সিপির নতুন স্টেডিয়াম এস্তাদিও
হোসে আলভালাদের উদ্বোধনী ম্যাচ। প্রতিপক্ষ বিশ্বখ্যাত ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। ১৭ বছর বয়সী
এক রোগা পটকা তরুণ
সেদিন স্পোর্টিংয়ের উইংয়ে দাঁড়িয়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিশ্বসেরা ডিফেন্ডারদের নাচিয়ে ছাড়লেন। তার চোখের পলকে
করা স্টেপ-ওভার, গতি আর ড্রিবলিংয়ে
বোকা বনে গেলেন গ্যারি
নেভিল, জন ও'শিয়ারা।
ম্যাচ
শেষে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কিংবদন্তি ম্যানেজার স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন ড্রেসিংরুমে গিয়ে ক্লাব কর্মকর্তাদের
স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, "এই ছেলেকে না
নিয়ে আমরা ইংল্যান্ডে ফিরছি
না।" মাত্র ১২.২৪ মিলিয়ন
পাউন্ডের বিনিময়ে ইংল্যান্ডের রেকর্ড কিশোর ফুটবলার হিসেবে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে পা
রাখলেন রোনালদো। ফার্গুসন তার পিঠে চাপিয়ে
দিলেন ক্লাবের ঐতিহাসিক ‘৭ নম্বর’ জার্সি,
যা এর আগে পরেছেন
ডেভিড বেকহ্যামের মতো কিংবদন্তিরা।
ম্যানচেস্টারে
যোগ দেওয়ার পর রোনালদো বড্ড
বেশি ড্রিবলিং বা কারুকাজ করতেন,
কিন্তু গোল পেতেন না।
স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন রোনালদোর ভেতরের গোলক্ষুধা ও আসল প্রতিভা
জাগানোর জন্য ড্রেসিংরুমে একটি
বিখ্যাত বাজি ধরেন। ফার্গুসন
বলেন, "তুমি যদি এই
প্রিমিয়ার লিগ মৌসুমে ১৫টি
গোল করতে পারো, আমি
তোমাকে ১০০ পাউন্ড পুরস্কার
দেব। আর যদি না
পারো, তবে তুমি আমাকে
১০০ পাউন্ড দেবে।" রোনালদো সেই চ্যালেঞ্জ লুফে
নেন। তিনি কেবল বাজিই
জেতেননি, বরং নিজেকে দলের
মূল গোলমেশিনে রূপান্তর করেন।
ম্যানচেস্টার
ইউনাইটেডে রোনালদোর প্রথম যুগের অর্জন (২০০৩-২০০৯):
├── প্রিমিয়ার
লিগ শিরোপা: ৩টি (টানা)
├── উয়েফা
চ্যাম্পিয়নস লিগ: ১টি (২০০৮)
├── এফএ
কাপ: ১টি
├── প্রথম
ব্যালন ডি'অর: ২০০৮
(২৩ বছর বয়সে)
└── ইউরোপীয় গোল্ডেন
শু: ১টি
ফার্গুসন
কেবল তার ম্যানেজার ছিলেন
না, ছিলেন মেন্টর ও একজন পিতা।
২০০Client৫ সালে যখন
রোনালদোর বাবা দিনিস অতিরিক্ত
মদ্যপানের কারণে লিভার নষ্ট হয়ে লন্ডনের
এক হাসপাতালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন,
তখন চেলসির বিরুদ্ধে ম্যানচেস্টারের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
ম্যাচ ছিল। রোনালদো খেলতে
চেয়েছিলেন, কিন্তু ফার্গুসন তাকে জড়িয়ে ধরে
বলেছিলেন, "ফুটবল একটা খেলা মাত্র,
পরিবার সবকিছুর ঊর্ধ্বে। তুমি এখনই তোমার
বাবার কাছে যাও।" বাবার
মৃত্যুর সেই শোক রোনালদোকে
মানসিকভাবে চিরদিনের জন্য বদলে দেয়।
তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, নিজের শরীরকে সবসময় বিষমুক্ত রাখবেন।
সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর রাজপুত্র: রিয়াল মাদ্রিদ ও মেসির সাথে
ঐতিহাসিক দ্বৈরথ
২০০৯
সাল। রিয়াল মাদ্রিদ তৎকালীন বিশ্বরেকর্ড ৮০ মিলিয়ন পাউন্ডের
(৯৪ মিলিয়ন ইউরো) বিনিময়ে রোনালদোকে ওল্ড ট্র্যাফোর্ড থেকে
স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে নিয়ে আসে। সান্তিয়াগো
বার্নাব্যু স্টেডিয়ামে তাকে স্বাগত জানাতে
উপস্থিত হয়েছিল রেকর্ড ৮০,০০০ ভক্ত,
যা ফুটবল ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব দৃশ্য।
মাদ্রিদে
গিয়ে রোনালদো নিজেকে এক ভিন্ন উচ্চতায়
নিয়ে গেলেন। করিম বেনজেমা এবং
গ্যারেথ বেলের সাথে মিলে তৈরি
করলেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম ধ্বংসাত্মক ত্রয়ী "BBC"। লা লিগায়
বার্সেলোনার লিওনেল মেসির সাথে তার যে
দ্বৈরথ শুরু হলো, তা
ফুটবল বিশ্বকে এক দশকেরও বেশি
সময় মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল। একজন
আরেকজনকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এই প্রতিযোগিতায় ফুটবল
পেয়েছে তার ইতিহাসের সেরা
সোনালী সময়।
রিয়াল
মাদ্রিদে রোনালদোর রূপকথা (২০০৯-২০১৮):
┌───────────────────────────────┬───────────────────────────────┐
│ দলীয়
সাফল্য │ ব্যক্তিগত
অর্জন │
├───────────────────────────────┼───────────────────────────────┤
│ ৪টি
উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ │ ৪টি
ব্যালন ডি'অর
│
│ ২টি
লা লিগা শিরোপা │ ৩টি
ইউরোপীয় গোল্ডেন শু │
│ ২টি
কোপা দেল রে
│ সর্বকালের সেরা গোলদাতা (৪
১৫০)│
└───────────────────────────────┴───────────────────────────────┘
২০১৪
সালের 'লা দেসিমা' (দশম
চ্যাম্পিয়নস লিগ) থেকে শুরু
করে ২০১৬, ২০১৭ এবং ২০১৮
সালে টানা তিনটি চ্যাম্পিয়নস
লিগ জিতে রিয়াল মাদ্রিদকে
ইউরোপের অপরাজিত সাম্রাজ্যে পরিণত করেন সিআরসেভেন। জুভেন্টাসের
বিপক্ষে তার সেই অবিশ্বাস্য
২.৩১ মিটার উঁচুতে
লাফিয়ে করা অ্যাক্রোব্যাটিক বাইসাইকেল
কিক গোলটি দেখে প্রতিপক্ষের সমর্থকেরাও
দাঁড়িয়ে তালি দিতে বাধ্য
হয়েছিল।
ইতালি জয়, ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে
প্রত্যাবর্তন ও ব্যক্তিগত জীবনের
ট্র্যাজেডি
২০১৮
সালে এক নতুন চ্যালেঞ্জের
খোঁজে ১০০ মিলিয়ন ইউরোর
রেকর্ড ফিতে জুভেন্টাসে যোগ
দেন ৩৩ বছর বয়সী
রোনালদো। সেখানেও তিনি জুভেন্টাসকে টানা
দুটি সেরি আ শিরোপা
জেতান এবং ইতালি, স্পেন
ও ইংল্যান্ড—তিনটি ভিন্ন দেশের লিগেই শীর্ষ গোলদাতা ও সেরা খেলোয়াড়
হওয়ার অনন্য কীর্তি গড়েন।
২০এপ্রিল
২০২১ সালে তিনি আবার
ফিরে আসেন তাঁর পুরনো
ঘর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে। তবে এই দ্বিতীয়
অধ্যায়টি তাঁর জীবনে এক
বিশাল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি বয়ে নিয়ে আসে।
২০২২ সালের এপ্রিল মাসে রোনালদো ও
তাঁর সঙ্গী জর্জিনা রদ্রিগেজের সদ্যজাত যমজ সন্তানের মধ্যে
নবজাতক পুত্রসন্তানটি জন্মের পরপরই মারা যায়। এই
তীব্র শোক এক বাবার
বুক ভেঙে চুরমার করে
দিয়েছিল। কিন্তু এক সপ্তাহেরও কম
সময়ের মধ্যে তিনি ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে
আর্সেনালের বিরুদ্ধে মাঠে নামেন। সেই
ম্যাচে গোল করার পর
রোনালদো কোনো উল্লাস করেননি;
বরং অশ্রুসজল চোখে ডান হাতের
আঙুল আকাশের দিকে উঁচিয়ে গোলটি
উৎসর্গ করেছিলেন তাঁর প্রয়াত সন্তানকে।
পুরো স্টেডিয়াম তখন স্তব্ধ হয়ে
গিয়েছিল এই বাবার শোকে।
মরুভূমির বুকে নতুন সাম্রাজ্য
এবং ২০২৬ সালের লিগ
জয়
ম্যানচেস্টার
ইউনাইটেডের পরবর্তী ম্যানেজমেন্টের সাথে কিছু বিতর্কের
জেরে ২০২২ সালের শেষে
তাঁর চুক্তি বাতিল করা হয়। অনেকেই
ভেবেছিলেন রোনালদোর ক্যারিয়ার শেষ। কিন্তু ফিনিক্স
পাখির মতো ধ্বংসস্তূপ থেকে
জেগে ওঠাই যার স্বভাব,
তিনি কীভাবে থামবেন?
২০২৩
সালের শুরুতে ৩৭ বছর বয়সে
রোনালদো পাড়ি জমান সৌদি
আরবের ক্লাব আল-নাসরে। তাঁর
এই দলবদল পুরো এশিয়ান ফুটবল
এবং সৌদি প্রো লিগের
মানচিত্র বদলে দেয়। ২০২৪
ও ২০২৫ সালে টানা
দুইবার লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পর এলো সেই
মাহেন্দ্রক্ষণ। ২০২৬ সালে রোনালদোর
জাদুকরী পারফরম্যান্স ও অধিনায়কত্বে আল-নাসর সৌদি প্রো
লিগের শিরোপা জয় করে। আল-নাসরের হয়ে লিগের শেষ
ম্যাচে তাঁর পা থেকে
আসা চমৎকার জোড়া গোল পুরো
সৌদি আরবকে উৎসবের নগরীতে পরিণত করে। ৪০ বছর
পার করার পরও এশিয়ান
ফুটবলের মঞ্চে ট্রফি উঁচিয়ে ধরে রোনালদো প্রমাণ
করলেন—তিনি অপরাজেয়।
পর্তুগালের লাল-সবুজ জার্সি:
ট্র্যাজেডি থেকে ট্রফি জয়ের
কান্না
ক্লাব
ফুটবলে সব জিতলেও দেশের
হয়ে রোনালদোর কোনো ট্রফি ছিল
না। ২০০৪ সালের ইউরো
ফাইনালে গ্রিসের কাছে হেরে ১৯
বছর বয়সী রোনালদোর সেই
কান্নার ছবি পর্তুগালবাসীর হৃদয়ে
দাগ কেটেছিল। দীর্ঘ ১২ বছর পর,
২০১৬ সালের ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত ইউরো কাপের ফাইনালে
পর্তুগালকে নিয়ে যান অধিনায়ক
রোনালদো।
কিন্তু
ফাইনালের প্রথমার্ধেই ফরাসি ডিফেন্ডার দিমিত্রি পায়েতের এক ট্যাকলে মারাত্মকভাবে
আঘাত পেয়ে মাঠ ছাড়তে
হয় তাকে। স্ট্রেচারে করে মাঠ ছাড়ার
সময় রোনালদোর চোখ দিয়ে ঝরছিল
অশ্রুধারা। কিন্তু তিনি দমে যাননি।
হাঁটুতে ব্যান্ডেজ বেঁধে ডাগআউটে দাঁড়িয়ে কোচের চেয়েও বেশি চিৎকার করে
সставитьদের নির্দেশনা দিতে
লাগলেন। পর্তুগাল যখন অতিরিক্ত সময়ে
গোল করে ইউরো চ্যাম্পিয়ন
হলো, তখন রোনালদোর সেই
আনন্দের কান্না ছিল এক জাদুকরী
মুহূর্ত। পরবর্তীতে ২০১৯ এবং ২০২৫
সালে পর্তুগালকে উয়েফা নেশনস লীগ শিরোপাও জেতান
তিনি। দেশের হয়ে ২৩০টিরও বেশি
আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে এবং ১৪৫টিরও
বেশি গোল করে তিনি
আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বকালের সেরা গোলদাতা।
কঠোর ফিটনেস, অবিশ্বাস্য ডায়েট ও ‘কোকা-কোলা’
বিতর্ক
কীভাবে
একজন মানুষ ৪০ বছর বয়স
পার করার পরও মাঠে
২০ বছরের তরুণের গতিতে ছুটে বেড়াতে পারেন?
এর উত্তর রোনালদোর অতিমানবীয় লাইফস্টাইল। তিনি দিনে কোনো
ভারী খাবার একবারে খান না, বরং
চিনি ও লবণ ছাড়া
প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার ছোট ছোট ৬টি
মিল বা অংশে ভাগ
করে নেন। দিনে ৫
বার ২০ মিনিট করে
বিশেষ পদ্ধতিতে (Naps) ঘুমান। পেশীর ক্লান্তি দূর করতে তাঁর
বাড়িতে রয়েছে বিশেষ 'ক্রায়োথেরাপি' চেম্বার, যেখানে মাইনাস ১৬০ ডিগ্রি তাপমাত্রার
বরফ স্নান নেন তিনি।
ফিটনেসের
প্রতি তাঁর এই একরোখা
মনোভাবের একটি বড় প্রমাণ
মিলেছিল ইউরো ২০২০-এর
এক সংবাদ সম্মেলনে। টেবিল থেকে দুটি নামী
কোমল পানীয় 'কোকা-কোলা'-র
বোতল সরিয়ে দিয়ে রোনালদো একটি
সাধারণ পানির বোতল উঁচিয়ে ধরে
বলেছিলেন, "পানি পান করুন,
কোকা-কোলা নয়।" একজন
অ্যাথলেটের এই সামান্য সচেতনতার
কারণে সেই কোমল পানীয়
কোম্পানির শেয়ার বাজারে এক ধাক্কায় বিলিয়ন
ডলার লোকসান হয়েছিল, যা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন
তৈরি করে।
মাঠের বাইরের রোনালদো: এক মানবিক বিলিয়নেয়ার
২০২৬
সালের সবশেষ অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো বিশ্বের প্রথম ফুটবলার এবং ইতিহাসের তৃতীয়
ক্রীড়াবিদ হিসেবে $১.২ বিলিয়ন
সম্পদের মালিক হয়ে ফোর্বসের বিলিয়নেয়ারদের
তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। সোশ্যাল
মিডিয়ায় (ফেসবুক, এক্স, ইউটিউব এবং ইনস্টাগ্রাম) তাঁর
মোট ফলোয়ারের সংখ্যা ১ বিলিয়নেরও বেশি,
যা পৃথিবীর ইতিহাসে যেকোনো মানুষের জন্য প্রথম ও
সর্বোচ্চ রেকর্ড।
কিন্তু
এই বিপুল ঐশ্বর্যের আড়ালে রোনালদো একজন পরম দয়ালু
মানুষ। তিনি ফিলিস্তিনের যুদ্ধপীড়িত
শিশুদের জন্য মিলিয়ন ডলার
অনুদান দিয়েছেন, নেপালের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং
ক্যান্সারে আক্রান্ত শত শত শিশুর
চিকিৎসার খরচ একা বহন
করেছেন। প্রথম আয়ের টাকা দিয়ে
মাকে অন্যের বাড়ির কাজ থেকে মুক্তি
দেওয়া সেই ছেলেটি আজ
কোটি কোটি মানুষের আশার
আলো।
কেন তিনি সর্বকালের অন্যতম
সেরা? (পরিসংখ্যানের চোখে CR7)
ক্রিশ্চিয়ানো
রোনালদোর ক্যারিয়ার কোনো সাধারণ মানুষের
গল্প নয়, এটি গাণিতিক
নিখুঁততার এক অনন্য দলিল।
নিচে তার ক্যারিয়ারের কিছু
অবিশ্বাস্য বিশ্বরেকর্ড তুলে করা হলো:
|
রেকর্ডের
খাতায় CR7 |
মোট
সংখ্যা / অর্জন |
|
অফিসিয়াল
ক্যারিয়ার গোল |
৯৭০+
(ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ) |
|
ব্যালন
ডি'অর জয় |
৫টি |
|
উয়েফা
চ্যাম্পিয়নস লিগ গোল |
১৪০টি
(সর্বকালের সর্বোচ্চ) |
|
আন্তর্জাতিক
ম্যাচ (পর্তুগাল) |
২৩০+
(বিশ্ব রেকর্ড) |
|
আন্তর্জাতিক
গোল |
১৪৫+
(বিশ্ব রেকর্ড) |
|
মোট
ক্যারিয়ার ট্রফি |
৩৫টি |
আল-নাসরের হয়ে ২০২৬ সালের সবশেষ ট্রফি জয়ের রোমাঞ্চ (কারেন্ট আপডেট)
রোনালদোর
আল-নাসর ক্যারিয়ারে ২০২৪
ও ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ
গোলদাতা হওয়ার পর, ২০২৬ সালের
মে-জুন মাসে আল-নাসরকে যে লিগ শিরোপাটি
তিনি জেতালেন, সেই ফাইনাল ম্যাচের
বা শেষ পর্বের টানটান
উত্তেজনা ও তাঁর অবদান
আরও একটু বিস্তারিত যোগ
করা দরকার। এটি তাঁর ক্যারিয়ারের
৩৫তম ট্রফি, যা এই বয়সেও
তাঁর অপরাজেয় মানসিকতার প্রমাণ।
প্রথম
ভালোবাসার আত্মত্যাগ: আলবার্ট ফানত্রাউ-এর গল্প
রোনালদোর
জীবনের অন্যতম সেরা ও আবেগঘন
গল্প এটি। শৈশবে স্পোর্টিং
সিপির স্কাউটরা যখন ট্রায়াল নিতে
আসে, তখন শর্ত ছিল—যে ম্যাচে বেশি
গোল করবে তাকেই একাডেমিতে
নেওয়া হবে। রোনালদো এবং
তাঁর বন্ধু আলবার্ট ফানত্রাউ দুজনেই একটি করে গোল
করেন। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে আলবার্ট
গোলকিপারকে একাই পেয়েছিলেন, কিন্তু
নিজে গোল না করে
তিনি বলটি রোনালদোকে পাস
দেন এবং রোনালদো গোল
করেন।
পরবর্তীতে
রোনালদো যখন আলবার্টকে জিজ্ঞেস
করেছিলেন, "তুমি নিজে গোল
না করে আমাকে কেন
দিলে?" আলবার্ট বলেছিলেন, "কারণ তুই আমার
চেয়ে ভালো খেলোয়াড়, তোর
বিশ্বসেরা হওয়া উচিত।" আলবার্ট
ফুটবল ছেড়ে দিলেও রোনালদো
আজীবন তাঁর বন্ধুর পুরো
সংসারের দায়িত্ব পালন করছেন এবং
তাঁকে বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়ি উপহার
দিয়েছেন।
স্যার
অ্যালেক্স ফার্গুসনের সাথে সেই বিখ্যাত '১০০ পাউন্ড'-এর বাজি
ম্যানচেস্টার
ইউনাইটেডে যোগ দেওয়ার পর
রোনালদো বড্ড বেশি ড্রিবলিং
করতেন, কিন্তু গোল পেতেন না।
স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন রোনালদোর ভেতরের গোলক্ষুধা জাগানোর জন্য একটি বাজি
ধরেন। ফার্গুসন বলেন, "তুমি যদি এই
মৌসুমে ১৫টি গোল করতে
পারো, আমি তোমাকে ১০০
পাউন্ড দেব। আর না
পারলে তুমি দেবে।" রোনালদো
সেই বাজি জিতেছিলেন এবং
প্রিমিয়ার লিগের সেরা স্ট্রাইকার হয়ে
উঠেছিলেন। এই গল্পটি রোনালদোর
গড়ে ওঠার পেছনে দারুণ
অনুপ্রেরণামূলক।
ব্যক্তিগত
জীবনের ট্র্যাজেডি এবং বাবা হিসেবে রোনালদো
রোনালদো
কেবল একজন সেরা খেলোয়াড়
নন, একজন লড়াকু বাবাও।
২০২২ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে
থাকাকালীন তাঁর সদ্যজাত যমজ
সন্তানের মধ্যে পুত্রসন্তানটি জন্মের পরপরই মারা যায়। সেই
তীব্র শোক বুকে চেপে
মাত্র কয়েকদিন পরেই তিনি ওল্ড
ট্র্যাফোর্ডে মাঠে নেমেছিলেন এবং
গোল করে আকাশের দিকে
হাত উঁচিয়ে মৃত সন্তানকে উৎসর্গ
করেছিলেন। এই মানবিক ও
আবেগঘন অধ্যায়টি তাঁর জীবনের অন্যতম
বড় একটি কষ্ট।
কঠোর
ফিটনেস ও অবিশ্বাস্য ডায়েট চার্ট
তিনি
৪০ বছর পার করার
পরও কীভাবে ২০ বছরের তরুণের
মতো খেলছেন? তাঁর কঠোর রুটিন—দিনে ৫ বার
ঘুমানো (Cryotherapy বা মাইনাস ১৬০
ডিগ্রি তাপমাত্রার আইস বাথ নেওয়া),
চিনি-লবণ ও তেল
ছাড়া বিশেষ ডায়েট এবং কোকা-কোলার
বোতল সরিয়ে পানি পানের সেই
বিখ্যাত ঘটনা—যা বিশ্বজুড়ে
আলোড়ন তৈরি করেছিল।
মাদেইরার সেই অভুক্ত, অবাঞ্ছিত শিশুটি, যার মা তাকে পৃথিবীতে আনতে চাননি, যার হার্ট কাজ করা বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল, যাকে স্কুলের শিক্ষক বলেছিলেন সে জীবনে কিচ্ছু করতে পারবে না—সেই ছেলেই আজ পৃথিবীর অন্যতম সফল এবং প্রভাবশালী মানুষ।
রোনালদোর
জীবন আমাদের শেখায় যে, আপনার জন্ম
কোথায় হয়েছে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়,
আপনার স্বপ্ন কত বড় এবং
সেই স্বপ্নের জন্য আপনি কতটা
রক্ত-ঘাম ঝরাতে প্রস্তুত,
সেটাই আসল। ফুটবল মাঠে
সবুজ ঘাসের ওপর যতক্ষণ এই
৭ নম্বর জার্সিধারী দৌড়াবেন, ততক্ষণ বিশ্ববাসী দেখবে—কীভাবে কঠোর পরিশ্রম, একাগ্রতা
আর অদম্য মানসিকতা দিয়ে ভাগ্যকে নিজের
পায়ে লুটিয়ে দেওয়া যায়। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো
শুধু একজন ফুটবলার নন,
তিনি প্রতিটি ভেঙে পড়া মানুষের
ঘুরে দাঁড়ানোর এক জ্যান্ত রূপকথা।