ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

‘জিরো টলারেন্স’ বনাম ৯০% দুর্নীতিবাজ: বিআরটিএ-দুদকের নীরবতা ও বিপন্ন জনতা


  • আপলোড সময় : শনিবার ২৭ জুন, ২০২৬ সময় : ১২:০৬ পিএম

আব্দুল কাইয়ুম খান, বিশেষ প্রতিনিধি:

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর শীর্ষ থেকে যখন ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতার নীতি ঘোষিত হয়, তখন তা সাধারণ নাগরিকের মনে রাষ্ট্র সংস্কার ও সুশাসনের এক নতুন আশার সঞ্চার করে। প্রধানমন্ত্রী দিনরাত নিরলসভাবে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক মঞ্চে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। সরকারের সর্বোচ্চ মহলের এই নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট এবং প্রশ্নাতীত।

কিন্তু চরম সত্য এবং ট্র্যাজেডি হলো, শাসনযন্ত্রের এই সর্বোচ্চ সদিচ্ছা যখন মাঠ পর্যায়ের আমলাতন্ত্র ও সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানগুলোর বারান্দায় এসে পৌঁছায়, তখন তা কর্পূরের মতো উড়ে যায়। নীতি যেখানে ‘শূন্য সহনশীলতা’, বাস্তবতায় সেখানে ‘নব্বই শতাংশ দুর্নীতি’। কেন নীতি ও প্রয়োগের মধ্যে এই মহাসমুদ্র সম ব্যবধান? কেন প্রতিটি নাগরিক সেবা পেতে গিয়ে পদে পদে লাঞ্ছিত ও লুণ্ঠিত হচ্ছেন? এই জ্বলন্ত প্রশ্নই এখন দেশের সচেতন জনমানসকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফিরছে।

বিআরটিএ: প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অভয়ারণ্য ও চালকের আসন

নাগরিক ভোগান্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের সবচেয়ে বড় ও জীবন্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএ। যে প্রতিষ্ঠানটির মূল দায়িত্ব ছিল সড়ক-মহাসড়ককে নিরাপদ রাখা এবং সুশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, সেটি আজ আপাদমস্তক দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে উঠে আসা তথ্য ও জনঅভিযোগ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির সহকারী পরিচালক, উপ-পরিচালক থেকে শুরু করে পরিচালক পদমর্যাদার প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। আর এই বিশাল দুর্নীতি সিন্ডিকেটের মাঠ পর্যায়ের মূল হোতা বা চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন সহকারী পরিচালকেরা।

মোটরযানের সুনির্দিষ্ট রেজিস্ট্রেশন, বছর শেষের ফিটনেস সার্টিফিকেট, দূরপাল্লার রুট পারমিট কিংবা চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স— প্রতিটি সেবাই আজ এই কর্মকর্তাদের দুর্নীতির জালে বন্দী। সাধারণ নিয়মে ফাইলের কোনো নড়চড় হয় না; ফাইল আটকে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা এবং পরবর্তীতে নির্দিষ্ট দালালের মাধ্যমে ফাইল ছাড়ানোই এখানকার অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।

শুধু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাই নন, মাঠ পর্যায়ের মোটরযান পরিদর্শকদের (ইন্সপেক্টর) সম্পদের খতিয়ান দেখলে যেকোনো সাধারণ নাগরিকের চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। রাষ্ট্রায়ত্ত কাঠামোতে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা মূল বেতনের চাকরি করেও এই পরিদর্শকেরা ঢাকা, চট্টগ্রাম বা সিলেটের মতো মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে ফ্ল্যাট, প্লট এবং শত কোটি টাকার বেনামি সম্পদের মালিক বনে যাচ্ছেন। তাঁদের আয়ের মূল উৎস মূলত তিনটি নির্দিষ্ট খাতে বিভক্ত: ১. ফিটনেস বাণিজ্য: যান্ত্রিক ত্রুটিযুক্ত, লক্কড়-ঝক্কড় কিংবা নূন্যতম ব্রেক-লাইটবিহীন গাড়িও কোনো প্রকার কায়িক পরীক্ষা ছাড়াই অলৌকিকভাবে ফিটনেস সার্টিফিকেট পেয়ে যাচ্ছে শুধু মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে। ২. ড্রাইভিং লাইসেন্স বাণিজ্য: একজন চালক সঠিকভাবে গাড়ি চালাতে পারেন কি না, ট্রাফিক আইন বোঝেন কি না— তা যাছাইয়ের জন্য নির্ধারিত লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষা কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। টাকার টেবিল পার হলে অদক্ষ চালকের হাতেও পৌঁছে যাচ্ছে পেশাদার লাইসেন্স। ৩. মেয়াদোত্তীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ গাড়ির লাইসেন্স পুনর্বহাল: রাস্তা কাঁপানো যেসব ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ কালোধোঁয়া ছড়ানো গাড়ি স্ক্র্যাপ বা ধ্বংস করে দেওয়ার কথা, সেগুলোকে উৎকোচের বিনিময়ে বছরের পর বছর রাজপথে সদর্পে চলার আইনি বৈধতা দেওয়া হচ্ছে।

দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের বিশাল সিন্ডিকেটের সাহায্য ছাড়া কোনো সাধারণ নাগরিকের পক্ষে বিআরটিএর কার্যালয় থেকে সরাসরি ও সশরীরে নূন্যতম সেবা পাওয়া আজ এক অসম্ভব অলীক কল্পনামাত্র।

সুব্রত দেবনাথ সিন্ডিকেট: এক কর্মকর্তার ৬০ কোটির অর্থ পাচার

বিআরটিএর এই প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাটের একটি জাজ্বল্যমান এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদাহরণ হতে পারেন বিআরটিএ চট্টগ্রামের সাবেক কর্মকর্তা সুব্রত দেবনাথ। তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের ফাইলটি পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় কীভাবে একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিস্বার্থের হাতিয়ার বানানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সুব্রত দেবনাথ কেবল সিএনজি প্রতিস্থাপন প্রকল্পের নাম করেই প্রায় ৬০ কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য ও জালিয়াতি সম্পন্ন করেছেন। চট্টগ্রামে নিজস্ব দালাল সিন্ডিকেট পরিচালনা, ভুয়া লাইসেন্স অনুমোদন এবং এই উপার্জিত অবৈধ কালো টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করার মতো গুরুতর দেশবিরোধী অপরাধের সাথে তিনি জড়িত। এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক চুরির কারণে রাষ্ট্র প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অথচ এই সিন্ডিকেট প্রধানদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান বা দৃষ্টান্তমূলক কোনো আইনি ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। তারা বহাল তবিয়তে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে চলেন।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পঙ্গুত্ব ও সংস্কারের দাবি

দুর্নীতি যখন মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে, তখন জনগণের শেষ ভরসার স্থল হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকার কথা দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদকের। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, প্রতিষ্ঠানটি আজ তীব্র কাঠামোগত দুর্বলতা, জনবল সংকট, রাজনৈতিক সমীকরণ এবং লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবে একপ্রকার নখদন্তহীন বাঘে পরিণত হয়েছে। সুব্রত দেবনাথের মতো বড় বড় মাফিয়া কিংবা ৫০ কোটির মালিক পরিদর্শকদের বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ে দৃশ্যমান মামলা বা তাৎক্ষণিক গ্রেফতার না হওয়ার প্রধান কারণ দুদকের এই অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতা ও ধীরগতি। দুদককে যদি একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং প্রকৃত অর্থেই ‘দুর্নীতি দমনকারী’ সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তবে রাষ্ট্রে জরুরি ভিত্তিতে নিম্নলিখিত ৮ দফা সংস্কার বাস্তবায়ন করা আবশ্যক:

১. স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পূর্ণাঙ্গ কমিশন গঠন: রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো পদ শূন্য হওয়ামাত্রই তা কালক্ষেপণ না করে দ্রুত পূরণ করতে হবে। ২. তদন্ত জনবল ও দক্ষতা বৃদ্ধি: প্রতিটি জেলা ও মেট্রোপলিটন শহরে তদন্তকারী কর্মকর্তার সংখ্যা বর্তমানের তুলনায় অন্তত তিন গুণ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। জটিল আর্থিক জালিয়াতি ধরার জন্য দক্ষ ফরেনসিক অডিটর, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং সাইবার ক্রাইম বিশেষজ্ঞদের স্থায়ীভাবে সংস্থায় নিয়োগ দিতে হবে। ৩. আধুনিক লজিস্টিক ও যানবাহন সাপোর্ট: দুর্নীতিবাজদের নেটওয়ার্ক অত্যন্ত শক্তিশালী ও আধুনিক। তাদের রুখতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য পর্যাপ্ত দ্রুতগামী যানবাহন, ডিজিটাল নজরদারি সরঞ্জাম এবং ওয়াকিটকি সহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ৪. সৎ কর্মকর্তাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি: যেসব দুদক কর্মকর্তা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বা প্রভাবশালী মহলের চাপ উপেক্ষা করে সততার সাথে বড় বড় দুর্নীতির ফাইল উন্মোচন করছেন, তাঁদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত ও বিশেষ পদোন্নতি দেওয়া উচিত, যাতে সৎ কর্মকর্তাদের কাজের মনোবল বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ৫. ডিজিটাল ফরেনসিক ও ট্র্যাকিং ল্যাব: কাগজের ফাইলের যুগ শেষ। আধুনিক হুন্ডি, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও আন্তর্জাতিক অর্থ পাচার রোধে দুদকে একটি অত্যাধুনিক ‘আর্থিক লেনদেন ট্র্যাকিং সফটওয়্যার’ ও ডাটা অ্যানালাইসিস ইউনিট স্থাপন করতে হবে। ৬. অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি দমন: সরিষার ভেতরের ভূত আগে তাড়াতে হবে। দুদকের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে যদি দুর্নীতিবাজদের সাথে আঁতাত বা তথ্য ফাঁসের অভিযোগ পাওয়া যায়, তবে তাকে চাকরি থেকে তাৎক্ষণিক বরখাস্ত করে সাধারণ কয়েদির মতো কারাগারে পাঠাতে হবে। ৭. উপজেলা পর্যায়ে প্রসারণ: দুর্নীতি এখন শুধু বিভাগ বা জেলায় সীমাবদ্ধ নেই, তা তৃণমূলে পৌঁছে গেছে। তাই সাধারণ মানুষের সরাসরি অভিযোগ গ্রহণের সুবিধার্থে প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে দুদকের অভিযোগ সেল বা শাখা অফিস চালু করা দরকার। ৮. ৯০ দিনে দ্রুত বিচার: দুর্নীতির মামলা বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখলে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। প্রতিটি জেলায় ‘দুদক বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট’ গঠন করে সর্বোচ্চ ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে দুর্নীতির মামলার রায় দান বাধ্যতামূলক করতে হবে।

সৎ কর্মকর্তার নির্বাসন বনাম দুর্নীতিবাজের সিংহাসন

আমাদের বর্তমান সমাজ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো— এখানে সততা আজ এক প্রকার অপরাধ এবং দুর্নীতি হলো সফলতার চাবিকাঠি। একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা শত কোটি টাকা কামিয়ে দামি গাড়িতে চড়ছেন, ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছেন এবং বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির আসন অলঙ্কৃত করছেন। অপরদিকে, কোনো কর্মকর্তা যদি সততা ও দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, তবে তাঁর কপালে জুটছে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক বদলি, ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হওয়া কিংবা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হওয়ার নির্মম নিয়তি।

এর দুটি সাম্প্রতিক ও স্পষ্ট উদাহরণ আমাদের আমলাতান্ত্রিক মানসিকতাকে নগ্নভাবে উন্মোচিত করে:

উদাহরণ ১: কুষ্টিয়ার সাবেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোঃ ইকবাল হোসেন স্থানীয় দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট ও বালুমহলের অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার মাত্র তিন মাসের মাথায় তাঁকে সেখান থেকে তড়িঘড়ি করে বদলি করা হয়।

উদাহরণ ২: সিলেটের সাবেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোঃ সারোয়ার আলম হযরত শাহজালাল (রহঃ) মাজারের দীর্ঘদিনের অস্বচ্ছ হিসাব ও আর্থিক অডিট দাবি করার অপরাধে মাত্র ১০ মাসের মাথায় তাঁকে ওএসডি করে সচিবালয়ে বসিয়ে রাখা হয়।

অথচ এর বিপরীতে বিআরটিএর মতো সংস্থায় দুর্নীতির অকাট্য প্রমাণ থাকার পরও শত শত কর্মকর্তা বছরের পর বছর একই লাভজনক চেয়ারে বহাল তবিয়তে বসে আছেন। এই বৈষম্য সৎ কর্মকর্তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে এবং অসৎদের আরও বেপরোয়া হতে উৎসাহিত করছে।

আমলাতান্ত্রিক অহমিকা ও সংবিধানের অবমাননা

বাংলাদেশ সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে— "সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।" অর্থাৎ, রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক কোনো আমলা বা কর্মকর্তা নন, এর একমাত্র মালিক দেশের সাধারণ জনগণ; আর সরকারি কর্মচারীরা হলেন জনগণের বেতনভুক্ত সেবক। কিন্তু বর্তমান আমলাতন্ত্রের একাংশের আচরণ দেখলে মনে হয়, তাঁরা নিজেদের প্রজাতন্ত্রের সেবক নন, বরং এই রাষ্ট্রের জমিদার বা মালিক মনে করেন।

আজ সাধারণ নাগরিক ও সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তিনটি প্রধান অভিযোগ অত্যন্ত প্রকট: ১. যোগাযোগহীনতা: জরুরি প্রয়োজনে বা কোনো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাধারণ মানুষ কিংবা সংবাদকর্মীরা ফোন করলে অনেক কর্মকর্তা তা রিসিভ করেন না। ২. অসৌজন্যমূলক আচরণ: অফিসে কোনো সাধারণ পোশাক পরিহিত নাগরিক সেবা চাইতে গেলে তাঁর সাথে চরম দুর্ব্যবহার করা হয় এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়। ৩. শ্রেণিগত বৈষম্য তৈরি: অনেক কর্মকর্তা সাধারণ নাগরিকের অধিকারের দাবির মুখে ঔদ্ধত্য দেখিয়ে প্রশ্ন করেন— "আপনি কি বিসিএস ক্যাডার? আপনার কোয়ালিফিকেশন কী?" এই ধরনের সামন্তবাদী প্রশ্ন নাগরিকের আত্মমর্যাদাকে ধূলিসাৎ করে দেয়।

জনগণের ঘাম ঝরানো ট্যাক্সের টাকায় যাদের বেতন, উৎসব ভাতা এবং বিলাসবহুল গাড়ি নিশ্চিত হয়, সেই জনগণের সাথেই এমন সামন্ততান্ত্রিক আচরণ কোনো স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মেনে নেওয়া যায় না।

সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ৭ দফা জাতীয় সুপারিশমালা

এই প্রাতিষ্ঠানিক পচন এবং নীতি ও প্রয়োগের মধ্যকার ব্যবধান দূর করতে রাষ্ট্রকে অবিলম্বে ৭টি সুনির্দিষ্ট ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে:

১. দুদকের সামগ্রিক সংস্কার: দ্রুততম সময়ে পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন কমিশন গঠন করে এবং ভেতরের কালো ভেড়া দূর করে দুদককে ঢেলে সাজাতে হবে। ২. বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দ্রুত বিচার: দুর্নীতির মামলাগুলোর জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করে সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে রায় প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। ৩. দুর্নীতিবাজদের প্রকাশ্য তালিকা: প্রতিটি সরকারি দপ্তর ও বিশেষ করে বিআরটিএ কার্যালয়ের নোটিশ বোর্ডে ও ওয়েবসাইটে দুর্নীতিতে অভিযুক্ত বা তদন্তাধীন কর্মকর্তাদের নাম ও ছবিসহ তালিকা ঝুলিয়ে দিতে হবে। ৪. সম্পদের অনলাইন জবাবদিহিতা: বিআরটিএর সহকারী পরিচালক থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের মেকানিক ও পরিদর্শক পর্যন্ত সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর বার্ষিক স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের হিসাব সরকারি ওয়েবসাইটে জনগণের জন্য উন্মুক্ত বা ওপেন সোর্স করে দিতে হবে। ৫. শতভাগ বিআরটিএ ডিজিটালাইজেশন: বিআরটিএর সেবা প্রক্রিয়ার ৯০ শতাংশই অনলাইনে রূপান্তর করতে হবে। নাগরিক ও কর্মকর্তার সরাসরি শারীরিক যোগাযোগ (ফেস টু ফেস কন্ট্যাক্ট) যত কমবে, ঘুষের লেনদেন ততটাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। ৬. নাগরিক অধিকার ও আচরণবিধি আইন: সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য কঠোর আচরণবিধি আইন পাস করতে হবে। কোনো কর্মকর্তা যৌক্তিক কারণ ছাড়া জনগণের ফোন না ধরলে, দুর্ব্যবহার করলে বা বৈষম্যমূলক আচরণ করলে চাকরিচ্যুতির মতো শাস্তির বিধান রাখতে হবে। ৭. সাংবিধানিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা: রাষ্ট্রীয়ভাবে ও প্রতিটি দপ্তরে বড় বড় অক্ষরে লিখে রাখতে হবে— "জনগণই রাষ্ট্রের একমাত্র মালিক, সরকারি কর্মচারীরা জনগণের সেবক।"

প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতিবিরোধী নীতিগত ও রাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট এবং সুদূরপ্রসারী। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের বিআরটিএর ৯০ শতাংশ দুর্নীতিবাজ চক্র, জবাবদিহিতাহীন একশ্রেণীর আমলা এবং দুর্বল কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা দুদক আজ সেই জনকল্যাণমুখী নীতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের আখের গোছাচ্ছে। এই চক্রটি সরকারের সমস্ত অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে। রাষ্ট্রকে আজ বেছে নিতে হবে সে কোন পথে হাঁটবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যদি এখনই দৃশ্যমান, কঠোর এবং চুনোপুঁটি থেকে রাঘববোয়ালদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতহীন ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে সততার পুরস্কার হবে নির্বাসন ও বদলি, আর দুর্নীতির পুরস্কার হবে অর্থ ও রাজনৈতিক ক্ষমতা। এই বিপজ্জনক সংস্কৃতি রুখে দাঁড়ানোর এখনই সময়। কারণ দিনশেষে এই স্বাধীন রাষ্ট্রের একমাত্র বৈধ মালিক এ দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ জনগণ। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের তাঁদের প্রকৃত সেবকের জায়গায় ফিরিয়ে এনে সাংবিধানিক সত্য প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

 আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর