খুলনা প্রতিনিধি:
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এক টুকরো মাথা গোঁজার ঠাঁই মেলেনি ৯৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা ফুলপাতা দাসের। চার সন্তান থাকার পরও তাঁর শেষ জীবনের ঠিকানা হয়েছে রাস্তার পাশে ব্লকের ওপর গড়া এক জরাজীর্ণ ঝুপড়ি ঘর। খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলার লাউডোব ইউনিয়নের পশরধার গ্রামে বাজুয়া-লাউডোব ফেরিঘাট অভিমুখে রাস্তার পাশেই কাটছে তাঁর অনিশ্চিত ও মানবেতর জীবন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃদ্ধা ফুলপাতা দাস বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলার মৃত মনহর দাসের স্ত্রী। স্বামী মারা যাওয়ার পর অসহায় হয়ে পড়েন তিনি। গত প্রায় দুই বছর ধরে দাকোপের পশরধার এলাকায় রাস্তার পাশের ব্লকের ওপর অস্থায়ী ঝুপড়ি তৈরি করে বসবাস করছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ফুলপাতা দাসের চার সন্তান রয়েছে। বড় ছেলে ভারতের বাসিন্দা, আরেক ছেলে মানসিক ভারসাম্যহীন। দুই মেয়েরই বিয়ে হয়েছে দাকোপ এলাকায়। এর মধ্যে পশরধার সংলগ্ন ঋষিপাড়ায় ছোট মেয়ে পরিবার নিয়ে থাকলেও, জায়গা স্বল্পতার অজুহাতে মাকে নিজের ঘরে আশ্রয় না দিয়ে রাস্তার পাশে ফেলে রেখেছেন। বড় মেয়ে মায়ের কোনো খোঁজই নেন না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। শারীরিক অসুস্থতার কারণে ফুলপাতা দাস এখন ঠিকমতো চলাফেরাও করতে পারেন না। পথচারীদের সাহায্যেই চলে তাঁর জীবন।
স্থানীয় বাসিন্দা রাজু বিশ্বাসসহ বেশ কয়েকজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সন্তান থাকার পরও একজন বৃদ্ধার এমন পরিণতি মেনে নেওয়া যায় না। আমরা চাই সরকারি উদ্যোগে তাঁকে বৃদ্ধাশ্রমে বা নিরাপদ আশ্রয়ে পুনর্বাসন করা হোক।”
ছোট মেয়ে গোলাপি আচারি জানান, তাঁর স্বামী চোখে কম দেখেন এবং তাঁদের নিজেদের অবস্থাই খুব খারাপ। তবে মায়ের ভরণপোষণের বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফুলপাতা দাস বলেন, “পায়ে পুরোনো ব্যথার কারণে চলতে পারি না। সারাক্ষণ মৃত্যু কামনা করি। ঘরের মধ্যে বসে মানুষের কাছে হাত পাতি, কেউ শোনে, কেউ শোনে না। ভাত কখনো জোটে, কখনো জোটে না।”
ইউপি সদস্য শিবাশীষ রায় জানান, বিষয়টি দুঃখজনক। পরিষদের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে খোঁজ নেওয়া হয়। স্থায়ী পুনর্বাসনের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলবেন তিনি।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা প্রজিত রায় বলেন, “পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন ২০১৩ অনুযায়ী সন্তানরা দায়িত্ব না নিলে অভিযোগ পাওয়ার পর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। এছাড়া শান্তি নিবাসের কার্যক্রম শুরু হলে এমন অসহায়দের পুনর্বাসনে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বোরহান উদ্দিন মিঠু জানান, এ বয়সে একজন মায়ের রাস্তায় থাকার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে দ্রুত তাঁর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে।