আব্দুল কাইয়ুম খান, বিশেষ প্রতিনিধি:
ঢাকা
জেলা প্রশাসকের কার্যালয় তথা ডিসি অফিসের
ভূমি অধিগ্রহণ অনুবিভাগের শাখা-৫-এর
অফিস সহকারী মিজানুর রহমান ওরফে মিজানের বিরুদ্ধে
আয়ের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ উপায়ে
বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের
গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সরকারি একজন সাধারণ কর্মচারীর
এমন আলাদিনের চেরাগ পাওয়ার মতো অবিশ্বাস্য সম্পদ
বৃদ্ধির ঘটনাটি প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি
করেছে। তবে কেবল মিজানুর
রহমানই নন, এই ঘটনাটি
দেশের মাঠ প্রশাসনের অন্যতম
গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সমূহে
জেঁকে বসা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির
গভীর ক্ষতকে আবারও জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে। ভুক্তভোগী
ও সচেতন মহল মনে করছেন,
ডিসি অফিসগুলোর সেবা কার্যক্রম পুরোপুরি
স্বচ্ছ ও আধুনিক না
করার কারণেই এমন অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রাতারাতি কোটিপতি
বনে যাচ্ছেন।
অনুসন্ধানে
জানা গেছে, সরকারের একজন সামান্য বেতনভুক্ত
তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণীর
কর্মচারী হওয়া সত্ত্বেও মিজানুর
রহমান ও তাঁর পরিবারের
সদস্যদের নামে রাজধানী ঢাকা
এবং এর আশেপাশের পশ
এলাকায় একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, কোটি টাকা মূল্যের
জমি ও দামি গাড়ির
সন্ধান মিলেছে। একজন সাধারণ সরকারি
কর্মচারীর বৈধ বেতন কাঠামোর
সাথে তাঁর জীবনযাপন ও
এই বিপুল বৈভবের কোনো মিল খুঁজে
পাওয়া যায় না। মূলত
ভূমি অধিগ্রহণ শাখা-৫ এর
প্রধান কাজ হলো বিভিন্ন
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা
ভূমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ এবং সেই সংক্রান্ত
ফাইল নিষ্পত্তি করা। অভিযোগ রয়েছে,
এই স্পর্শকাতর শাখায় দায়িত্ব পালনের সুবাদে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ জমির মালিকদের ফাইল
আটকে রেখে তিনি কোটি
কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
জমির সঠিক মালিকদের দ্রুত
ফাইল ছাড়িয়ে দেওয়া কিংবা সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের
মোট অংক কৌশলে বাড়িয়ে
দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তিনি ভুক্তভোগীদের কাছ
থেকে মোটা অংকের কমিশন
বা ঘুষ গ্রহণ করতেন।
শুধু তাই নয়, ঢাকা
ডিসি অফিসের চারপাশে সক্রিয় থাকা একটি শক্তিশালী
দালাল চক্রের সাথে মিজানের সরাসরি
যোগসাজশ ছিল। এই সিন্ডিকেটের
মাধ্যমে তিনি প্রত্যন্ত অঞ্চল
থেকে আসা অসহায় ও
সাধারণ ভূমি মালিকদের পদে
পদে হয়রানি ও ব্লাকমেইল করতেন
বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। ডিসি অফিসে সেবা
নিতে এসে দিনের পর
দিন প্রতারিত হওয়া ভুক্তভোগীদের মধ্যে
এই মিজানুর রহমানের কর্মকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই
তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ
করছিল।
তবে
প্রশাসনের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিজানুর রহমানের এই ঘটনাটি কোনো
বিচ্ছিন্ন বা একক বিষয়
নয়। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়
হলো দেশের মাঠ প্রশাসনের সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধানতম স্পর্শকাতর
সেবা প্রদানকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান। সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের নানা প্রয়োজন যেমন—ভূমি, রাজস্ব, ম্যাজিস্ট্রেসি, ত্রাণ বিতরণ ও বিভিন্ন লাইসেন্সিং-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ
শাখাগুলো এই কার্যালয়ের অধীনেই
পরিচালিত হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত
লোকবল সংকট, জবাবদিহিতার অভাব এবং কঠোর
ও প্রত্যক্ষ তদারকি না থাকায় দেশের
বহু জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের
বিভিন্ন শাখায় দুর্নীতি ও অনিয়ম এখন
ওপেন সিক্রেট হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ
করে ভূমি ও রাজস্ব
শাখায় জমির নামজারি, খারিজ,
মিউটেশন, পর্চা বা খতিয়ান উত্তোলন
এবং ডিসিআর ফি আদায়ের ক্ষেত্রে
নির্ধারিত সরকারি ফির চেয়ে কয়েক
গুণ অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়া
হয়। ভূমি অধিগ্রহণ শাখায়
ক্ষতিপূরণের ন্যায্য অর্থ ছাড় করাতে
ফাইল মাসের পর মাস আটকে
রেখে প্রকাশ্যেই ঘুষ দাবি করা
হয়, যা সাধারণ মানুষের
জন্য এক বড় ধরনের
মানসিক ও আর্থিক যন্ত্রণার
কারণ। এছাড়া অস্ত্র, হোটেল, ক্লাব ও বাণিজ্যিক নানা
লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রেও চলে পর্দার আড়ালের
নানামুখী অনিয়ম। জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেসি
শাখার বিরুদ্ধেও মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের
ভয় দেখিয়ে সাধারণ ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে
হয়রানি করার পাশাপাশি বড়
অংকের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ
প্রায়শই শোনা যায়। এমনকি
অতি সাধারণ সার্টিফিকেট শাখা থেকে চারিত্রিক,
উত্তরাধিকার ও নাগরিকত্ব সনদ
দ্রুত পাওয়ার জন্য সাধারণ মানুষকে
টেবিলে টেবিলে অর্থ লেনদেন করতে
বাধ্য করা হয়।
মাঠ
প্রশাসনের এই ভয়াবহ দুর্নীতির
পেছনে মূলত তিনটি প্রধান
কারণ কাজ করছে বলে
মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রথমত, প্রতিটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে
শত শত কর্মকর্তা-কর্মচারী
কর্মরত থাকলেও সেখানে দুর্নীতি দমন কমিশন তথা
দুদকের সরাসরি বা স্থায়ী কোনো
ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা নেই। দ্বিতীয়ত, সরকারের
পক্ষ থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশের
কথা বলা হলেও ডিসি
অফিসের অধিকাংশ সেবা প্রক্রিয়া এখনো
সনাতন, ম্যানুয়াল ও পুরোনো ফাইল
নির্ভর রয়ে গেছে। এই
ফাইলের লাল ফিতার দৌরাত্ম্যের
কারণেই কর্মচারীদের হাতে সরাসরি ঘুষ
নেওয়ার এক বিশাল সুযোগ
তৈরি হয়। তৃতীয়ত, মাঠ
পর্যায়ের এসব নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের
বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ লিখিত অভিযোগ করলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সেই অভিযোগের দ্রুত,
নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান কোনো
বিচার বা শাস্তি নিশ্চিত
করা হয় না। ফলে
অপরাধীরা পার পেয়ে গিয়ে
আরও বড় বড় অপরাধ
করার সাহস পায়।
মাঠ
প্রশাসন তথা ডিসি অফিসসমূহের
এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি পুরোপুরি উপড়ে ফেলতে হলে
এখন কিছু জরুরি ও
কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের দাবি।
প্রথমত, ডিসি অফিসের সকল
সেবা সম্পূর্ণ ডিজিটাল বা অনলাইন ভিত্তিক
করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। ভূমি
অধিগ্রহণ, নামজারি, ডিসিআর ও সকল ধরনের
সার্টিফিকেট প্রদান প্রক্রিয়াকে শতভাগ ই-নথি এবং
অনলাইন ট্র্যাকিং ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। এর
ফলে একজন আবেদনকারী ঘরে
বসেই মোবাইল ফোনের খুদে বার্তার (এসএমএস)
মাধ্যমে জানতে পারবেন তাঁর ফাইলটি বর্তমানে
কার টেবিলে বা কোন অবস্থানে
রয়েছে। এতে মধ্যস্বত্বভোগী বা
দালালদের দৌরাত্ম্য চিরতরে বন্ধ হবে। দ্বিতীয়ত,
মাঠ পর্যায়ে দুদকের তদারকি ও নজরদারি ব্যাপক
হারে বৃদ্ধি করতে হবে। প্রতিটি
বিভাগীয় শহরে দুদকের একটি
বিশেষ "মাঠ অভিযান ইউনিট"
গঠন করা প্রয়োজন, যারা
প্রতি মাসে দেশের অন্তত
একটি করে জেলা প্রশাসকের
কার্যালয়ে ঝটিকা ও আকস্মিক অভিযান
পরিচালনা করবে এবং অপরাধীদের
হাতেনাতে ধরবে। তৃতীয়ত, সাধারণ মানুষের অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে।
প্রতিটি ডিসি অফিসের প্রধান
প্রবেশপথে এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে
সরাসরি দুদকের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি করে ডিজিটাল
অভিযোগ বাক্স এবং আধুনিক কিউআর
(QR) কোডভিত্তিক অনলাইন কমপ্লেইন ব্যবস্থা চালু করতে হবে,
যাতে ভুক্তভোগীরা কোনো ভয় বা
পরিচয় প্রকাশের দ্বিধা ছাড়াই সরাসরি নিজেদের অভিযোগ উচ্চপর্যায়ে পাঠাতে পারেন। চতুর্থত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
বিষয় হলো, দুর্নীতিবাজদের জন্য
দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির তৈরি করা।
মিজানুর রহমানের মতো যেসব অসৎ
কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত
বিভাগীয় মামলা, তাৎক্ষণিক চাকরিচ্যুতি এবং কঠোর ফৌজদারি
মামলা দায়ের করতে হবে। একই
সাথে আদালতের মাধ্যমে তাদের অর্জিত সমস্ত অবৈধ ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে
জমা করতে হবে।
উপসংহারে
বলা যায়, জেলা প্রশাসকের
কার্যালয় হলো জনগণের কাছে
রাষ্ট্রের সর্বশেষ, সবচেয়ে দৃশ্যমান ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
প্রতিনিধি। সাধারণ মানুষ যখন এই ডিসি
অফিসে এসে ন্যায্য সেবার
বদলে হয়রানির শিকার হয়, তখন তারা
সরাসরি রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থার ওপর
থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলে। তাই মাঠ প্রশাসনের
মর্যাদা রক্ষা করতে এবং জনমনে
স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে মিজানুর রহমানের
বিরুদ্ধে আনীত সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলো
সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের
মাধ্যমে প্রমাণ সাপেক্ষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। একই
সাথে দেশের সকল জেলা প্রশাসকের
কার্যালয়কে শতভাগ স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করে
সেগুলোকে জনগণের প্রকৃত "শূন্য দুর্নীতি জোন" হিসেবে গড়ে তোলা এখন
যুগের দাবি। তবে আইনি ও
নৈতিক নিয়ম অনুযায়ী, অফিস
সহকারী মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে আনীত এসব গুরুতর
অভিযোগ সম্পূর্ণ তদন্তপূর্বক আদালতের মাধ্যমে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত
তাকে চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত করা
যাবে না। জেলা প্রশাসক
বা ডিসিরা হলেন একটি জেলার
প্রশাসনিক অভিভাবক ও সুশাসনের মূল
ভিত্তি। অথচ আজ ঢাকা
ডিসি অফিসসহ দেশের অধিকাংশ ডিসি অফিসের বিরুদ্ধে
ওঠা দুর্নীতির ভয়াবহ অভিযোগগুলো পুরো প্রশাসনিক কাঠামোকে
এক চরম নৈতিক সংকটের
মুখে দাঁড় করিয়েছে।
যখন
একটি জেলার সর্বোচ্চ হর্তাকর্তা, অর্থাৎ ডিসি নিজেই দুর্নীতির
চোরাবালিতে নিমজ্জিত হন, তখন তাঁর
অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে সততা ও
জবাবদিহিতার আশা করা কেবল
অবান্তরই নয়, চরম দেউলিয়ািও
বটে। "মাছ যেমন মাথা
থেকে পচে", ঠিক তেমনি শীর্ষ
কর্মকর্তার দুর্নীতির লাইসেন্স নিচের স্তরের কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং পিয়নদের আরও
বেপরোয়া ও লাগামহীন ঘুষ-বাণিজ্যে লিপ্ত হতে উসকানি দেয়।
ফলে, চেইন অব কমান্ড
ভেঙে পড়ে এবং সাধারণ
মানুষ প্রতিটি ডেস্কে জিম্মি হয়ে পড়ে।
এই
চরম অবক্ষয় রুখতে এখনই সরকারের সর্বোচ্চ
পর্যায় থেকে কঠোরতম বার্তা
দেওয়া জরুরি। ডিসি অফিসগুলোর ওপর
গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়ে দুর্নীতিবাজ ডিসিদের শুধু বদলি নয়,
চাকরি থেকে স্থায়ী বরখাস্ত
এবং দৃষ্টান্তমূলক জেলের মুখোমুখি করতে হবে। অভিভাবক
সৎ না হলে পরিবার
যেমন ধ্বংস হয়, ঠিক তেমনি
ডিসিরা সৎ না হলে
মাঠ প্রশাসন কখনো দুর্নীতিমুক্ত হবে
না। জনগণের করের টাকায় পালিত
আমলাদের মনে রাখা উচিত—প্রশাসন কোনো লুটেরার আখড়া
নয়, বরং সেবার পবিত্র
স্থান।
আকাশজমিন
/ আরআর