দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও বোয়ালখালী থেকে বিভাগীয় নগরীতে প্রবেশের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার কালুরঘাট সেতু এলাকা। এই পথে যাতায়াতকারী লাখো মানুষের পাশাপাশি কালুরঘাট ভারী শিল্প এলাকার ব্যবসায়ীদের চট্টগ্রামের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে পৌঁছাতে এতদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হতো। যানজট ঠেলে ঘুরপথে এই দূরত্ব পার হতে সময় লাগতো এক থেকে দেড় ঘণ্টা, গুনতে হতো বাড়তি ভাড়াও। তবে বন্দরনগরীর এই চিরচেনা ভোগান্তির অবসান ঘটছে। কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে নির্মাণাধীন নতুন সড়কটি চালু হলে কালুরঘাট থেকে চাক্তাই যেতে সময় লাগবে মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট!
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে সাড়ে আট কিলোমিটার দীর্ঘ এই চার লেনের সড়কটি নির্মাণ করছে। সিডিএ-এর প্রকৌশলীরা জানান, মেগা প্রকল্পটির ইতোমধ্যে ৮৬ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ১৪ শতাংশ কাজ চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করে সড়কটি পুরোপুরি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এটি কেবল একটি সাধারণ সড়ক নয়; একই সাথে নগরীর অন্যতম শহর রক্ষা বাঁধ হিসেবেও কাজ করবে। এই বাঁধের ফলে চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ, বক্সিরহাট, বাকলিয়া, চান্দগাঁও ও কালুরঘাট ভারী শিল্প এলাকা বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষয়ক্ষতি থেকে স্থায়ীভাবে রক্ষা পাবে। তাছাড়া সড়কটি ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করায় নগরীর ভেতরে দূরপাল্লার যানবাহনের চাপ অনেকাংশে কমে আসবে।
প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই আউটার রিং রোডের পাশে যুক্ত করা হয়েছে বিস্তৃত বিনোদন কেন্দ্র। যাতায়াতের পথে নদীর বুকে ভাসমান নৌকা, সাম্পান ও ছোট-বড় জাহাজের দৃশ্য এবং স্নিগ্ধ হাওয়া পর্যটকদের মনে করিয়ে দেবে কক্সবাজার-টেকনাফের বিখ্যাত মেরিন ড্রাইভের কথা। ইতোমধ্যেই অবকাঠামো দৃশ্যমান হওয়ায় বিকেল হলেই সেখানে ভিড় জমাচ্ছেন দর্শনার্থীরা। তবে পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও লাইটিংয়ের কাজ শেষ না হওয়ায় আপাতত সন্ধ্যার আগেই সবাইকে ফিরে যেতে হচ্ছে।
বাণিজ্যিক গুরুত্বের পাশাপাশি এই সড়কটি বাকলিয়া, চান্দগাঁও ও মোহরা এলাকার অর্থনৈতিক দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে দিতে শুরু করেছে। কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী একসময়ের হাজার হাজার একর পরিত্যক্ত ভূমি এখন চলে এসেছে উন্নয়নের মূলস্রোতে। এলাকাটিকে ঘিরে ইতিমধ্যেই গড়ে উঠছে নতুন নতুন আবাসিক এলাকা ও শিল্প প্লট। এই সড়কের পাশেই চান্দগাঁও হামিদচরে নির্মিত হচ্ছে দেশের একমাত্র মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়।
২০১৭ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের কাজ ২০২১ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কোভিড মহামারি, জমি অধিগ্রহণ জটিলতা ও মামলা-মোকদ্দমার কারণে কয়েক দফায় এর মেয়াদ বাড়ানো হয়। একই সাথে শুরুতে ২ হাজার ৩১০ কোটি টাকার বাজেট থাকলেও নকশায় নতুন কিছু কাজ যুক্ত হওয়ায় প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকায়।
প্রকল্প পরিচালক রাজীব দাশ বলেন, "জমি অধিগ্রহণ ও মামলার কারণে কাজ কিছুটা পিছিয়েছিল। তবে বর্তমানে জলাবদ্ধতা সংশ্লিষ্ট সকল কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ১৪ শতাংশ কাজ আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন হবে। সড়কটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে মাত্র ১০ মিনিটেই কালুরঘাট থেকে চাক্তাই যাতায়াত করা সম্ভব হবে।"