চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সাধারণ মানুষের ওপর স্নাইপার রাইফেল ব্যবহারের অকাট্য প্রমাণ একাধিক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি জানান, পুলিশের নথিপত্রে কর্মকর্তাদের নামে অস্ত্র বরাদ্দ দেখানো হলেও বাস্তবে সেইসব মারণাস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছিল আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হাতে, যা তারা নির্বিচারে ব্যবহার করেছে।
আজ রোববার (৫ জুলাই) দুপুরে ট্রাইব্যুনালে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন।
মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, "জুলাই বিপ্লবে আমাদের দেশে যে স্নাইপার রাইফেল ব্যবহার করা হয়েছে, তা একাধিক তদন্তে প্রমাণিত। যাত্রাবাড়ীর একটি নির্দিষ্ট মামলার নথিতে আমরা দেখেছি, পুলিশ যখন আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র বণ্টন করতো, তখন তা খাতায় বিভিন্ন পুলিশ কর্মকর্তার নামে দেখানো হতো। কিন্তু বাস্তবে সেই স্নাইপার রাইফেলগুলো দেওয়া হতো আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হাতে। তারা পুলিশের পাশাপাশি সরাসরি এসব অস্ত্র ব্যবহার করে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালিয়েছে। আমরা বর্তমানে যাদের বিচারের সম্মুখীন করছি, প্রাথমিক তদন্তে তাদের স্নাইপার রাইফেল ব্যবহারের প্রমাণ মিলছে।"
এদিকে ট্রাইব্যুনালের এক মামলায় কারাদণ্ডপ্রাপ্ত জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের গণহত্যা ও দমনপীড়নের মামলায়ও আসামি করা হবে বলে নিশ্চিত করেছেন চিফ প্রসিকিউটর। তিনি বলেন, "শাপলা চত্বর মামলার শুরু থেকেই আমরা সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা পাচ্ছি। তার নির্দেশনায় ২০১৩ সালের ৫ মে’র পর দুটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের কার্যক্রম বন্ধের পাশাপাশি তাদের কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়েছিল। এমনকি সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি নিজেই এসবের দায় স্বীকার করে বলেছিলেন যে তিনি এগুলো মোকাবিলা করেছেন। যেহেতু এটি একটি বড় ঐতিহাসিক ঘটনা, তাই সমস্ত তথ্যপ্রমাণ গুছিয়ে আনতে কিছুটা সময় লাগছে। তবে ইনু যে এই মামলায় আসামি হচ্ছেন, তা আমরা শুরু থেকেই বলে আসছি।"
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আইনি প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, "প্রধানমন্ত্রী হিসেবে 'সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি' বা ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায় নিয়ে শেখ হাসিনার সাজা (মৃত্যুদণ্ড) হয়েছে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হিসেবে তার এই শাস্তি হয়নি। সাধারণত ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিলের বিধান রয়েছে। ইতিমধ্যেই সেই নির্ধারিত সময় অতিক্রম হয়ে গেছে। আইন অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে আপিল করা না হলে আর সুযোগ থাকে না।"
তবে আইনি জটিলতা সত্ত্বেও সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে দেশে ফেরার আহ্বান জানিয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, "আমরা চাই শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এসে নিজের বিরুদ্ধে হওয়া দণ্ডকে চ্যালেঞ্জ করুক এবং আপিল ফাইল করুক। কারণ তাঁর দেশে ফিরতে কোনো আইনগত বাধা নেই। তিনি আগে দেশে আসুক, তারপর সময়ের পরে আপিল ফাইলের আইনি প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হবে তা আপিল বিভাগ বিবেচনা করবে। এ নিয়ে এখন অগ্রিম মন্তব্য করার সুযোগ নেই।"
চিফ প্রসিকিউটর আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এখনো বহু মামলা বিচারাধীন এবং বেশ কিছু মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের প্রক্রিয়া চলছে। বিশেষ করে শাপলা চত্বরের ঘটনা ও জুলাই গণহত্যার আরও অনেক মামলায় তাকে নতুন করে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে। তাই একটি মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উচিত বাংলাদেশে ফিরে এসে সমস্ত বিচারিক প্রক্রিয়া মোকাবিলা করা।