চলমান ফুটবল বিশ্বকাপই তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে—অবশেষে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নিয়েছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। ডালাসে স্পেনের বিপক্ষে পর্তুগালের মহাগুরুত্বপূর্ণ শেষ ষোলোর ম্যাচের আগে এক সংবাদ সম্মেলনে এসে পর্তুগিজ এই মহাতারকা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ফুটবলকে তিনি কোনো প্রকার আক্ষেপ ছাড়াই বিদায় জানাবেন। নিজের রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নামা ৪১ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার জোর দিয়ে বলেন, ফুটবল ক্যারিয়ারের ইতি তিনি একান্তই নিজের সিদ্ধান্তে টানবেন। অন্য কারও কথায় বা চাপে পড়ে তিনি বুট জোড়া তুলে রাখবেন না। সংবাদ সম্মেলনের শেষ মুহূর্তে এই আবেগঘন মন্তব্য করে বিশ্বজুড়ে থাকা কোটি ভক্তের মন ছুঁয়ে গেছেন সিআরসেভেন।
রোনালদো তাঁর শেষ বিশ্বকাপ নিয়ে খোলামেলাভাবে বলেন, ‘হ্যাঁ, এটাই আমার শেষ বিশ্বকাপ হোক এবং এটিই আমার শেষ বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে। তবে আমি মনেপ্রাণে আশা করি, সোমবারের ম্যাচটি যেন বিশ্বমঞ্চে আমার শেষ ম্যাচ না হয়ে দাঁড়ায়।’ এর আগে সাবেক ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও রিয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ডকে যখনই এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হতো, তিনি কখনোই সরাসরি স্বীকার করতে চাননি যে এই টুর্নামেন্টটিই তাঁর শেষ বিশ্বকাপ। যদিও ২০৩০ সালে যখন পরবর্তী বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে, তখন তাঁর বয়স গিয়ে দাঁড়াবে ৪৫ বছরে। অবধারিতভাবেই সেই বয়সে সর্বোচ্চ স্তরের আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে খেলা অসম্ভব।
অবসর এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে সাংবাদিকদের বারবার করা প্রশ্নে কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করে রোনালদো বলেন, ‘আমি যখন নিজের থেকে চাইব, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ার শেষ করব। আপনারা সাংবাদিকেরা সব সময় একই প্রশ্ন করেন—এটাই কি শেষ? সময় হলেই সব দেখা যাবে। আমি এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে অযথা মানুষের বাড়তি মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই না। এই মুহূর্তে আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সোমবারের ম্যাচে দলের জন্য ভালো খেলা।’ তিনি আরও যোগ করে বলেন, ‘আমি একদম সৎভাবে নিজের মন থেকে বলছি, সোমবারের ম্যাচে মাঠে যা-ই ঘটুক না কেন, ক্রিস্টিয়ানো হাজার শতাংশ পরিষ্কার বিবেক ও মানসিক শান্তি নিয়ে মাঠ ছাড়বে।’
নিজের দীর্ঘ ফুটবল যাত্রা নিয়ে স্মৃতিচারণ করে পর্তুগিজ অধিনায়ক বলেন, ‘আমি ফুটবলকে নিজের যা কিছু দেওয়ার ছিল, তার সবটুকুই উজাড় করে দিয়েছি। এতগুলো বছর ধরে ফুটবল খেলাটা মূলত আমার ভালোবাসা। কোনো বিশেষ প্রয়োজনের তাগিদে বা বাধ্য হয়ে আমি ফুটবল খেলছি না; কারণ জীবনে আমি এখন অনেক ভালো অবস্থায় আছি। পুরো বিষয়টিই আসলে গভীর আবেগের। আমি এখনো নিজের জাতীয় দলের হয়ে খেলি কারণ আমি ফুটবলকে মনেপ্রাণে ভালোবাসি।’ নিজের পারফরম্যান্সের ওপর কোনো বাড়তি চাপ নিতে রাজি নন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সোমবার যা-ই ঘটুক, আমি নিজের ওপর এই মানসিক চাপ দেব না যে আমাকে অবশ্যই জিততেই হবে। বিশ্বকাপের মতো এতো বড় প্রতিযোগিতার প্রতিটি ম্যাচ সবার উপভোগ করা উচিত। আর আমার মনে হয় না আমি খুব একটা খারাপ খেলছি। এই টুর্নামেন্টে আমি এরই মধ্যে তিনটি গোল করেছি; অন্যরা হয়তো আমার চেয়ে আরও বেশি ভালো করেছে, কিন্তু আমার পারফরম্যান্স একদম ফেলে দেওয়ার মতো নয়।’
বেশ নির্ভার ও ফুরফুরে মেজাজে থাকা রোনালদো স্বীকার করেন, তাঁর আগের পাঁচটি বিশ্বকাপের তুলনায় এবারের টুর্নামেন্টটি তিনি অনেক বেশি উপভোগ করছেন। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী স্পেনকে হারানোর ব্যাপারে তাঁরা শতভাগ আত্মবিশ্বাসী বলেও জানান। দলের শক্তির প্রশংসা করে রোনালদো বলেন, ‘আমাদের যদি জয়ের এই অটুট বিশ্বাস না থাকত, তাহলে আমরা আজ এই পর্যায়ে আসতে পারতাম না। এটি একটি দারুণ অভিজ্ঞতা এবং আমরা প্রতিটি ম্যাচে নিজেদের আরও উন্নত করছি। আমরা ভালো করেই জানি এটি খুবই কঠিন একটি প্রতিযোগিতা এবং সব সময় নিখুঁত খেলা সম্ভব নয়। বিশ্বমঞ্চ থেকে অনেক বড় বড় দল ইতোমধ্যে বিদায় নিয়েছে, আর সেটাই এই টুর্নামেন্টের কঠিন বাস্তবতার কথা বলে দেয়। আমাদের দল এখন ভালো অবস্থায় আছে, শান্ত আছে এবং ম্যাচ জয় করতে পুরোপুরি প্রস্তুত। আমরা একটি শক্তিশালী দলের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি, তবে আমার বিশ্বাস আমরা মাঠে সেরাটা দিতে প্রস্তুত থাকব।’
সোমবার রাতে স্পেনের বিপক্ষে মাঠে নামলে সাবেক এই রিয়াল মাদ্রিদ তারকা পর্তুগালের হয়ে নিজের ২৩৩তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অনন্য নজির গড়বেন। স্পেনের ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদে টানা ৯টি সফল মৌসুম কাটানোর কারণে স্প্যানিশ ফুটবলারদের সঙ্গে তাঁর একটি বিশেষ ও আন্তরিক সম্পর্ক রয়েছে। তবে স্পেনের বিপক্ষে তাঁর আন্তর্জাতিক গোলের রেকর্ড খুব একটা সন্তোষজনক নয়। এই শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ক্যারিয়ারে তিনি মাত্র চারটি গোল করতে পেরেছেন। অবশ্য এর মধ্যে রয়েছে ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ৩-৩ গোলে ড্র হওয়া সেই ঐতিহাসিক ম্যাচে করা তাঁর জাদুকরী হ্যাটট্রিকটি।