নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানাধীন মাসদাইর এলাকায় ছিনতাই চুরির অপবাদ দিয়ে সিজান (২৫) নামের এক তরুণকে খুঁটির সাথে বেঁধে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয় একটি মসজিদের ইমামসহ ৬ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১৪ থেকে ১৫ জনকে আসামি করে ফতুল্লা মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিহতের শোকাহত মা শিল্পী বেগম (৪৪) বাদী হয়ে এই মামলাটি রুজু করেন।
মামলার এজাহারভুক্ত নামীয় আসামিরা হলেন— পশ্চিম মাসদাইরের খলিলের মোড় এলাকার আল ফালাহ জামে মসজিদের খতিব ও ইমাম মো. কাউছার আহমেদ কাশেমী (৪০), আব্দুল গনি হুজুর (৫০), আজহার রাজমিস্ত্রী (৫৫), সাইদুল (৪২), আলম (৩৪) এবং জিলানী ফকির (৫৫)।
মামলার বিবরণী ও এজাহার থেকে জানা যায়, নিহত সিজান একসময় জীবনের ভুল স্রোতে গা ভাসিয়ে অসৎ সঙ্গে জড়িয়ে বিপথগামী হয়ে পড়লেও, পরবর্তীতে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন। এরই মধ্যে তিনি ধর্মীয় তাবলিগ জামাতেও অংশ নেন এবং সেখান থেকে ফিরে এসে তার বড় ভাইয়ের কাঁচামালের ব্যবসায় নিয়মিত সহযোগিতা করে আসছিলেন।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত শনিবার (৪ জুলাই) বিকেল ৪টার দিকে। স্থানীয় লোকজন অনিক নামের এক ব্যক্তিকে মোবাইল চোর সন্দেহে আটক করে। পরবর্তীতে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে অনিক সিজানের নাম উচ্চারণ করলে মামলার অন্যতম আসামি আলমসহ 'আল ফালাহ সমাজকল্যাণ সংঘ'-এর বেশ কয়েকজন সদস্য চড়াও হন। তারা সিজানকে তার নিজের বাসার সামনে থেকে জোরপূর্বক তুলে খলিলের মোড়ে নিয়ে যান। এজাহারে বাদী আরও উল্লেখ করেন, সেখানে সিজান ও অনিক— এই দুজনকে আল ফালাহ সমাজকল্যাণ সংঘের কার্যালয়ের পাশে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির সাথে শক্ত রশি দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। এরপর তাদের চোখ ও মুখ কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে আসামিরা অত্যন্ত বর্বরভাবে স্টিলের পাইপ ও লাঠিসোটা দিয়ে উপর্যুপরি মারধর করতে থাকে। গণপিটুনির এই নৃশংসতায় সিজানের ডান পায়ের হাঁটুর নিচের হাড় সম্পূর্ণ ভেঙে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন সংবেদনশীল স্থানে গুরুতর অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ ও আঘাত লাগে।
মারধরের পর অবস্থা বেগতিক দেখে রাত ৭টার দিকে অভিযুক্তরা গুরুতর আহত সিজানকে তার পরিবারের সদস্যদের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে চলে যায়। স্বজনেরা তাকে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার করে আশঙ্কাজনক অবস্থায় নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে শরীরের অতিরিক্ত আঘাতের কারণে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসক রাত ৮টার দিকে সিজানকে মৃত ঘোষণা করেন।
নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ফতুল্লা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাহাবুবুর আলম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানান, নিহতের মা বাদী হয়ে থানায় একটি সুনির্দিষ্ট হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। ঘটনার সাথে জড়িত এবং এজাহারভুক্ত আসামিদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনতে জেলা পুলিশের একাধিক বিশেষ টিম ইতিমধ্যেই মাঠে কাজ শুরু করেছে। অপরাধী যেই হোক, তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।