সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি:
টানা তিন দিনের ভারী বৃষ্টি এবং ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়েছে। ডুবে গেছে গ্রামীণ সড়ক, অনেক বাড়িঘর ও আঙিনায় পানি প্রবেশ করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, আগামী দুই দিন ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেয়ে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘর পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি ৭ দশমিক ২৪ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছিল, যা বিপৎসীমার ৫৬ সেন্টিমিটার নিচে। তবে জেলার শাল্লা উপজেলার মারকুলি স্টেশনে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ১১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী ও মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের ইসলামপুর ও দরিয়াবাজ এলাকায় স্থানীয় সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সুনামগঞ্জ-সিলেট মহাসড়কের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। হাঁটু থেকে কোমরসমান পানির কারণে নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও শিক্ষার্থীদের চলাচলে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। মোল্লাপাড়া, কোরবাননগর ও লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের একাধিক গ্রামীণ সড়কও পানির নিচে চলে গেছে।
সীমান্তবর্তী তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় পাহাড়ি ঢলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তাহিরপুর-সুনামগঞ্জ সড়কের শক্তিয়ার খলা এলাকায় প্রায় ১০০ ফুট এবং আনোয়ারপুর সড়কের প্রায় ৫০ ফুট অংশ পানিতে ডুবে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলার পাঁচটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আঙিনায় পানি ওঠায় শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতে সমস্যা দেখা দিয়েছে।
যাদুকাটা, বৌলাই, মাহারাম, রক্তি ও পাটলাই নদী দিয়ে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে অন্তত ৫০টির বেশি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। যাদুকাটা ও মাহারাম নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। এতে প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে বড়ছড়া ও চারাগাঁও শুল্ক স্টেশনের শতাধিক কয়লার ডিপো পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় প্রায় ১০ হাজার কয়লা শ্রমিকও বিপাকে পড়েছেন।
হাওরাঞ্চলেও বর্ষার পূর্ণ প্রভাব দেখা দিয়েছে। প্রবল ঢেউয়ের কারণে হাওরপাড়ের বিভিন্ন এলাকায় ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাহিরপুর সদর ইউনিয়নের লক্ষীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অমর ভৌমিক বলেন, প্রতিবছর বর্ষার শুরুতেই কয়েকটি বিদ্যালয়ের আঙিনা পানিতে তলিয়ে যায়। স্থায়ী সমাধানের জন্য নতুন ভবন নির্মাণ জরুরি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে ২৬৫ মিলিমিটার এবং লাউড়েরগড়ে ১২৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ভারতের মেঘালয়ের মাউকিরওয়াতে ২৪৫ মিলিমিটার এবং চেরাপুঞ্জিতে ২২৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হওয়ায় সীমান্তবর্তী নদীগুলোর পানি দ্রুত বাড়ছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইমদাদুল হক বলেন, আগামী দুই দিন ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেয়ে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় পর্যাপ্ত ত্রাণ, আশ্রয়কেন্দ্র, স্বেচ্ছাসেবক, মেডিকেল টিম, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের উপকরণ ও প্রয়োজনীয় নৌযান প্রস্তুত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে হাওরাঞ্চলে নৌপথে পর্যটক পরিবহনে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়ায় হাউসবোট পরিচালনা থেকে বিরত থাকা, পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট নিশ্চিত করা, অতিরিক্ত যাত্রী না তোলা এবং প্রশাসনের নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
আকাশজমিন / আরআর