ফুটবল বিশ্বকাপের শেষ চারের লড়াই মানেই আর্জেন্টিনার নিশ্চিত জয়—বিশ্বকাপের ইতিহাস অন্তত এই কথাই বলে। লাতিন আমেরিকার এই ফুটবল পরাশক্তি চলমান আসরসহ এখন পর্যন্ত মোট ২০ বার বৈশ্বিক এই মহোৎসবে অংশগ্রহণ করেছে। এর মধ্যে আলবিসেলেস্তেরা ছয়বার সেমিফাইনালের টিকিট কাটতে সক্ষম হয়েছে। সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, যখনই তারা সেমিফাইনালে উঠেছে, প্রতিবারই প্রতিপক্ষকে বিদায় করে ফাইনালের মঞ্চে পা রেখেছে।
রোববার (১২ জুলাই) কানসাসে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের শেষ কোয়ার্টার ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ের চরম উত্তেজনাকর ম্যাচে সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ ব্যবধানে পরাস্ত করে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা। অন্যদিকে, নরওয়েকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ চারের মঞ্চে উঠেছে ইংল্যান্ড। আগামী বুধবার আটলান্টায় বহুল প্রতীক্ষিত সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ। ফুটবল বিশ্বের সমস্ত চোখ এখন এই হাইভোল্টেজ ম্যাচের দিকে। একদিকে আকাশী-সাদাদের সামনে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে যাওয়ার হাতছানি, অন্যদিকে সেমিফাইনালে অপরাজেয় থাকার গৌরবময় রেকর্ড ধরে রাখার পরীক্ষা।
আর্জেন্টিনার অতীতের পাঁচ সেমিফাইনালের সোনালী ইতিহাস:
১৯৩০ বিশ্বকাপ (আর্জেন্টিনা ৬:১ যুক্তরাষ্ট্র): বিশ্বকাপের উদ্বোধনী আসরেই নিজেদের শক্তিমত্তা প্রকাশ করেছিল আর্জেন্টিনা। সেন্টেনারিও স্টেডিয়ামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ৬-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে বিধ্বস্ত করে প্রথম দল হিসেবে ফাইনালে নাম লেখায় তারা।
১৯৮৬ বিশ্বকাপ (আর্জেন্টিনা ২:০ বেলজিয়াম): আজতেকা স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ডিয়েগো ম্যারাডোনার ঐতিহাসিক ‘হ্যান্ড অফ গড’ ও ‘শতাব্দীর সেরা গোলের’ পর সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ ছিল বেলজিয়াম। সেই ম্যাচেও ম্যারাডোনার একক জাদুতে জোড়া গোল করে দলকে ২-০ ব্যবধানে ফাইনালে তোলেন এবং পরে দ্বিতীয় শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা।
১৯৯০ বিশ্বকাপ (ইতালি ১:১ আর্জেন্টিনা, টাইব্রেকারে ৩-৪ ব্যবধানে জয়): নেপলসের সান পাওলো স্টেডিয়ামে স্বাগতিক ইতালির বিরুদ্ধে ম্যাচটি ছিল চরম স্নায়ুযুদ্ধের। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় ১-১ গোলে ড্র থাকার পর টাইব্রেকারে গোলরক্ষক সার্জিও গয়কোচিয়ার অতিমানবীয় দক্ষতায় স্বাগতিকদের কাঁদিয়ে ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা।
২০১৪ বিশ্বকাপ (নেদারল্যান্ডস ০:০ আর্জেন্টিনা, টাইব্রেকারে ২-৪ ব্যবধানে জয়): দীর্ঘ ২৪ বছরের খরা কাটিয়ে আবারও সেমিফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। করিন্থিয়ান্স অ্যারেনায় ডাচদের বিপক্ষে ১২০ মিনিটের লড়াই গোলশূন্য থাকার পর টাইব্রেকারে নায়ক বনে যান গোলরক্ষক সার্জিও রোমেরো। দুটি পেনাল্টি শট ঠেকিয়ে লিওনেল মেসিকে ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনালের টিকিট এনে দেন তিনি।
২০২২ বিশ্বকাপ (আর্জেন্টিনা ৩:০ ক্রোয়েশিয়া): লুসাইল স্টেডিয়ামে গত আসরের রানার্স-আপ ক্রোয়েশিয়াকে কোনো পাত্তাই দেয়নি আলবিসেলেস্তেরা। লিওনেল মেসির জাদুকরী অ্যাসিস্ট ও জুলিয়ান আলভারেজের জোড়া গোলে ক্রোয়াটদের ৩-০ ব্যবধানে গুঁড়িয়ে দিয়ে ফাইনালে ওঠে তারা এবং পরে তিন দশকের আক্ষেপ ঘুচিয়ে বিশ্বসেরা হয়।
২০২৬ বিশ্বকাপ: ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা মহোৎসব এবার আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে এক মহাকাব্যিক লড়াইয়ের অপেক্ষায় ফুটবল দুনিয়া। পরিসংখ্যান বলছে, সেমিফাইনাল খেললেই ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। তবে ১৯৭৮ সালের আসরে ভিন্ন ফরম্যাটের কারণে সেমিফাইনাল ছিল না, সেবার তারা সরাসরি ফাইনালে খেলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। এবার চিরশত্রু ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালের অজেয় রেকর্ড ধরে রাখতে পারবে কি না আর্জেন্টিনা, তা দেখতে আর মাত্র দুই দিনের অপেক্ষা।