ফিরোজ আলম মিলন
মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসের গতিধারা ধীরে ধীরে যেই গতিতে যাচ্ছে তা দেখে অনেকেই শংকিত বিদায়ীরা লজ্জিত। তাই কিছু শিক্ষনীয় বিষয় নিয়ে লেখার আগ্রহ জাগল নতুন করে। সুযোগ পেয়ে মোটিভেশনাল ট্রেনিং এ যা উপস্থাপন করেছিলাম।তার কতিপয় করণীয় ও স্মরণীয় দিক তুলে ধরলাম। কেন না দিন দিন অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসের কর্মকর্তাদের আচরণ এমন নিম্নমানের দিকে যাচ্ছে যা কল্পনাতীত। বিখ্যাত, প্রখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষিত হয়ে শিক্ষার অহংকার নতুবা উচ্চমানের কর্মকর্তা পাশাপাশি মোটা অংকের আয় রোজগারধারী হলেই হয় না। বাস্তবমুখী কিছু শিক্ষা অতীব প্রয়োজনীয়। পরামর্শগুলোকে কেউ ব্যক্তিগতভাবে না নিয়ে শিক্ষনীয় হিসেবে নিলেই হব ধন্য।
*কোন অফিসারের পক্ষে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিষয় নিয়ে বিতর্ক করা থেকে বিরত থাকতে হবে*হ্যান্ডশেক করার সময় সিনিয়র আগে হাত বাড়ানোর পর তারপর জুনিয়র অফিসার হাত বাড়াবে। হ্যান্ডশেক হবে দুজনে দাঁড়িয়ে, চোখের দিকে তাকিয়ে, হাতে হাল্কা চাপ দিয়ে ও হাত পুরোপুরি উলম্বভাবে রেখে। সিনিয়র যতক্ষণ হাত নাড়াবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত হ্যান্ডশেকের স্থায়িত্ব হবে। লেডি অফিসারদের কখনো আগ বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করা যাবে না, সেটা যে দেশেরই হোক।
*যেকোনো অনুষ্ঠানে অফিসারের স্পাউস (স্বামী/স্ত্রী) প্রথম অগ্রাধিকার পাবে। তাকে রিসিভ করা, সম্ভব হলে প্রথম সারিতে বসানো এবং উপযুক্ত সম্মান দেখাতে হবে।*যত রাগ বা ক্ষোভ থাকুক তা সিনিয়র অফিসারের সামনে অঙ্গভঙ্গি দিয়ে, উচ্চস্বরে নতুবা ভাষাগত শিষ্টাচার লঙ্ঘন করে বহিঃপ্রকাশ ঘটানো যাবে না। ইংরেজিতে প্রচলিত একটি কথা আছে বস ইজ অলওয়েজ রাইট*অফিস কক্ষে কোনভাবেই আবেগ এবং উচ্ছ্বাসের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো যাবে না।*একজন অফিসার কখনোই আরেকজন অফিসারকে দাঁড় করিয়ে রাখবে না। তাকে সবসময় বসতে দিবে। কোন সিনিয়র অফিসার যদি এই ম্যানারস না জানে, তাহলে জুনিয়র অফিসারের দায়িত্ব হবে তাকে বলা, স্যার বসতে পারি? এই বলে নিজেই বসে পড়া।*কোন নথি উপস্থাপন করার আগে সমসাময়িক বিধি সম্মতভাবে প্রাঞ্জল ভাষায় একাধিকবার চেক করে ভুল ত্রুটি মুক্ত স্পষ্ট অক্ষরে উপস্থাপন করতে হবে*একজন অফিসার কখনোই অফিসিয়াল গাড়ির একদম পেছনে সিটে বসবে না। সবসময় মাঝের সিটগুলোতে বসবে। গাড়িতে জায়গা না হলে সে পরে যাবে কিংবা অন্যভাবে যাবে, কিন্তু পেছনে বসবে না... ঊর্ধ্বতন বস বা অন্য কারো অফিসিয়াল গাড়িতে উঠার সময়েও না। পেছনের সিট অধঃস্থন কর্মচারীদের জন্য। একজন অফিসার কখনোই গাড়ির সামনে ড্রাইভারের পাশের সীটেও বসবে না।
*একজন অফিসার সবসময় ওয়েল ড্রেসড হবে... দাড়ি থাকলে পুরোপুরি থাকবে, না থাকলে ক্লিন শেভড হতে হবে। চুলগুলো এলোমেলো থাকা যাবে না, পকেটে চিরুনি থাকবে। ডাক্তারগণ রুগী দেখার সময়েও চেষ্টা করতে হবে ফরমাল ড্রেসে থাকার, যাতে কে ডাক্তার, কে ওয়ার্ডবয় লোকেরা সহজেই বুঝতে পারে।
* কাটা চামুচ দিয়ে খেতে পারলে শব্দ ছাড়াই কাটা চামুচ দিয়ে খাবে। না পারলে হাত ধুয়ে এসে হাত দিয়েই ভদ্রভাবে খাবে। কিন্তু অর্ধেক কাটা চামুচ, অর্ধেক হাত কিংবা কাটা চামুচের টুংটাং শব্দ করে খাওয়া যাবে না।
*খাওয়ার আগে মেনু চেক করতে হবে। বুফে সিস্টেম হলে কখনোই নিজের টেবিলের প্লেট নিয়ে খাবার আনতে যাওয়া যাবে না। বুফেতে খাবার দেওয়ার সময় যে প্লেট থাকে, সেটা নিতে হবে। খাবার পরিমিত নিতে হবে আর একবার খাবার নিয়ে টেবিলে আসার পর অফিসার দ্বিতীয়বার খাবার নিতে বুফেতে যাবে না। ইশারায় ওয়েটারকে ডেকে খাবার দিতে বলবে। গরম খাবার ফু দিয়ে ঠাণ্ডা করা যাবে না। ন্যাপকিন হাত মুছার জন্য না, উরুর উপর কাপড়কে রক্ষা করার জন্য। তাই এটি থাকবে উরুর উপর। খাবারের দিকে মুখ যাবে না, মুখের দিকে খাবার আসবে। খাবার টেবিলে অফিসিয়াল, পলিটিক্স, ধর্ম বা বিরক্তিকর কোন কথা বলা যাবে না।
*ফরমাল লাঞ্চ কিংবা ডিনারে চিফ গেষ্ট খাওয়া শুরু করলেই কেবল অন্যেরা শুরু করবেন। আবার তিনি শেষ করার সাথে সাথে খাওয়া বন্ধ করতে হবে, অন্যদের শেষ না হলেও। কারো আয়োজনে ফর্মাল ডিনারে গেলে হোস্টকে কিংবা বাসায় গেলে খাওয়ার পর ভাবীকে অবশ্যই ধন্যবাদ দিতে হবে।
* কাউকে ফোন করলে আগেই নিজের পরিচয় দিতে হবে।
*কোন কথা বা বক্তব্য দেওয়ার সময় সেই বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। অস্পষ্ট বা অমার্জিত কোন কথা একজন অফিসার বলবে না।
* স্টেজে কনফিডেন্স এর সাথে দাঁড়াতে হবে। ডায়াসে সোজা ও রিল্যাক্সড হয়ে দাঁড়াতে হবে। হ্যান্ড মুভমেন্ট, আই কন্ট্যাক্ট, ভয়েস মডুলেশন করতে হবে
* পূর্বানুমতি ছাড়া একজন অফিসার আরেকজনের বাসায় বা অফিসে হুটহাট করে যাবে না। আগেই ফোন বা অন্য কোন মাধ্যমে জানিয়ে তারপর যাবে। কোন সিনিয়র অফিসারের বাসায় গেলে বাচ্চাদের না যাওয়াই ভাল। কারণ তারা কান্নাকাটি, দুষ্টামি বা কোন জিনিস ভেঙ্গে ফেলতে পারে, যেটা বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।*হাসপাতালে কোন রোগী দেখতে যেতে ছোট বাচ্চাদের সাথে না নেওয়াই উত্তম। কারণ হাসপাতালে বিভিন্ন ধরনের রোগাক্রান্ত রোগীর নিবাস। সেখানে অনেক রোগের জীবাণু অবাধে বিচরণ করে। এতে ছোট বাচ্চাদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাই এড়িয়ে চলাটাই উত্তম।
*জেলা, উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা সর্বদাই জনবান্ধব হতে হবে। প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষের দুঃখ, কষ্ট, বেদনা এক কথায় সমস্যা শ্রবণ করা অবধারিত। কারণ একজন প্রান্তিক মানুষ নিতান্তই তার সমস্যা নিয়ে সরকারি কর্মকর্তার দরবারে আসে এতে সে বিমুখ হয়ে ফিরে গেলে কর্মকর্তার এই ব্যর্থতা হিসেবে গণ্য হয়। কোনভাবেই আমলাতান্ত্রিক মনোভাব পোষণ করা যাবেনা। মনে রাখতে হবে আগন্তুক ব্যক্তি এদেশেরই একজন নাগরিক। তারও কোন সন্তান বা আত্মীয় ঊর্ধ্বতন কোন সরকারি কর্মকর্তা নতুবা আগামী দিনে হতেও পারে। * একজন কলিগ আরেকজন কলিগ বা অফিস স্টাফকে জনসম্মুখে ভুল ধারা, বকা-ঝকা করা কিংবা তার সাথে তর্কে লিপ্ত হবে না। পরে ব্যক্তিগতভাবে তার সাথে আলোচনা করে নিতে হবে কিংবা বকা-ঝকা করতে হবে।
* বস ফ্রেন্ডলি আচরণ করলেও, বসের সাথে জুনিয়র অফিসার ফ্রেন্ডলি আচরণ করবে না। সবসময় অফিসিয়াল ভাব ধরে রাখবে।*ডিজিটাল যুগে মুঠোফোনে কোন প্রকার মিউজিক্যাল রিংটোন, দাপ্তরিক বা ব্যক্তিগত কোন সমস্যা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
কোন সিনিয়রের রুমে বসে থাকার সময় অন্যকোন সিনিয়র কর্মকর্তার আগমন ঘটলে চেয়ার ছেড়ে উঠে (যদি জায়গা না থাকে) তাকে বসতে বলতে হবে।*কোন ফাইল নিজ টেবিলে দুই কাজ্য দিবসের বেশি সময় আটকে রাখা যাবে না। নেগেটিভ অথবা পজেটিভ সিদ্ধান্ত দিয়ে ফাইল জটিলতা কমিয়ে আনতে হবে। কোন সিনিয়র ফোন করলে তার কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত লাইন কেটে দেয়া যাবে না।*কোন সিনিয়র সাধারণ মানুষ হলেও কক্ষে প্রবেশ করলে শত গোপনীয়তা সত্বেও শালীনভাবে তাঁকে আতিথিয়তায় গ্রহণ করে যথাযথ মর্যাদার সহিত শ্রবণ করতে হবে। সমস্যার সমাধান বিধিসম্মত হলে আশ্বস্ত করতে হবে আপনার এই কাজের সমাধান দ্রুতই হয়ে যাবে আপনি নিশ্চিত থাকুন।পায়ের উপরে পা উঠিয়ে বসা থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ এটি কোন ভদ্রতার লক্ষণ নয়।
এমনই হওয়া উচিত প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী হিসেবে করণীয় বা প্রতিপালনীয়।
রাজনৈতিক বিবেচনায় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী
তাদের আচরণই নির্ধারণ করবে আগামীর পথ চলা। অধস্থ বা যে কোন কর্মকর্তাসহ কর্মচারী এমনকি সাধারণ মানুষের সাথে রাজনৈতিক এবং মানবিক শিষ্টাচার মেনে চলাই কাম্য। এক কথায় ভাব আর ভোগের পূজারী না হয়ে মানব পূজারী হওয়াটাই উত্তম।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট