ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই: ড. আবদুল মঈন খান স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নেই: মীর শাহে আলম দুপুরের মধ্যেই বিদ্যুৎ পাচ্ছে বাংলাদেশ: কমবে লোডশেডিং এমপিও শিক্ষকদের নির্বাচন ভাগ্য নির্ধারণ করবে ইসি: মীর শাহে আলম সরকারি কেনাকাটায় পুকুরচুরি ঠেকাতে আসছে অভিন্ন একক দরতালিকা সাগর-রুনি হত্যার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ তারুণ্য না অভিজ্ঞতা: ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব চয়নে জটিল হিসাব-নিকাশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জের রিট খারিজ হাইকোর্টে ইন্দোনেশিয়ায় ২৪০ যাত্রী নিয়ে জাহাজ নিখোঁজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, আটক ২

এক সপ্তাহে ২২ মৃত্যু

কক্সবাজারের ৫১ পাহাড়ে মৃত্যুর ঝুঁকিতে কয়েক লাখ মানুষ


  • আপলোড সময় : সোমবার ১৩ জুলাই, ২০২৬ সময় : ১১:৫৬ এএম

পর্যটন নগরী কক্সবাজারের বুকে প্রকৃতি ও মানবসৃষ্ট এক ভয়ংকর বিপর্যয় ডানা মেলছে। শহর ও এর আশপাশের ৫১টি পাহাড়ে গড়ে ওঠা প্রায় ২২ হাজার অবৈধ বসতি এখন লাখো মানুষের জন্য সাক্ষাৎ মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। চলতি সপ্তাহের অবিরাম ও ভারী বর্ষণে পাহাড়ধসের ঘটনায় পাঁচ মাদ্রাসাছাত্রীসহ অন্তত ২২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। প্রতি বছর বর্ষা এলেই পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসে মৃত্যুর ঢল, যা এবারও চরম আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রভাবশালী ভূমিদস্যু সিন্ডিকেট এবং স্থায়ী পুনর্বাসনের অভাবের কারণে কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না এই পাহাড় নিধন যজ্ঞ।

টানা বৃষ্টির কারণে কক্সবাজারের পাহাড়তলী, বাদশাঘোনা, ছাত্তারঘোনা, খাজা মঞ্জিল, লারপাড়া এবং টেকনাইফ্যা পাহাড়সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় মাটি ধসে পড়ার চরম আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাহাড়ের ঢালে ও পাদদেশে বসবাসকারী বাসিন্দাদের মতে, মুষলধারে বৃষ্টির সময় পাহাড় ফেটে যাওয়ার বিকট শব্দই এখন তাদের সবচেয়ে বড় ট্রমা। জীবনের ঝুঁকি শতভাগ জানা সত্ত্বেও বিকল্প কোনো মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকায় বুকভরা আতঙ্ক নিয়েই তারা এই মৃত্যুফাঁদে পড়ে আছেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, বর্তমানে এসব ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে প্রায় তিন লাখ মানুষ প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দিন কাটাচ্ছেন। কেবল গত এক সপ্তাহেই জেলার বিভিন্ন পাহাড়ে চার শতাধিক ছোট-বড় ভূমিধসের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদের সাময়িক তোড়জোড় দেখা যায়। কিন্তু বৃষ্টি থামলেই আবার শুরু হয় পাহাড় কাটা ও নতুন ঘর তোলার মহোৎসব। পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, ভূমিদস্যু চক্র দরিদ্র ও ভাসমান মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে সরকারি পাহাড়ি জমি দখল করে কেনাবেচার এক রমরমা বাণিজ্য গড়ে তুলেছে। এতে একদিকে যেমন প্রতি বছর লাশের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে, অন্যদিকে বনাঞ্চল উজাড় হয়ে প্রাকৃতিক ভারসাম্য পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

এই বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানিয়েছেন, স্থায়ী পুনর্বাসনের বিকল্প ব্যবস্থা না করে এই হাজার হাজার অবৈধ বসতি পুরোপুরি উচ্ছেদ করা প্রশাসনের জন্য বেশ কঠিন। তবে যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার জরুরি কাজ অব্যাহত রয়েছে এবং গত তিন দিনে অন্তত পাঁচ হাজার বাসিন্দাকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

পরিবেশবিষয়ক বেসরকারি সংস্থা ‘এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি’ (ইয়েস)-এর সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, ২০০৮ সাল থেকে ২০blank২৬ সালের ৮ জুলাই পর্যন্ত গত ১৮ বছরে পাহাড়ধসের কারণে ৩১২ জন মানুষের অকাল মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৫৪ জন রোহিঙ্গা নাগরিক। এর মধ্যে ২০১০ সালের ১৫ জুনের দুর্ঘটনাটি ছিল সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী, যখন মাত্র এক দিনেই মাটির নিচে চাপা পড়ে ৬২ জন প্রাণ হারান।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি করিম উল্লাহ এই পরিবেশগত বিপর্যয়ের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, লাগামহীন পাহাড় কাটার ফলে কেবল বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলই ধ্বংস হচ্ছে না, পাহাড়ের নিজস্ব পানি ধরে রাখার প্রাকৃতিক ক্ষমতাও হারিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বর্ষায় যেমন পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে সমতলে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়ে শহরে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।

যদিও পরিবেশ অধিদপ্তর ২০১০ সাল থেকে পাহাড় দখল ও কাটার অপরাধে ৩৪০টি মামলা দায়ের করেছে, যার মধ্যে ২২০টি সরাসরি পাহাড় নিধনের মামলা। পাশাপাশি বন বিভাগও গত এক বছরে ৩০৪টি মামলা করেছে। তবে জনবল সংকট ও আধুনিক প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে এই পাহাড় খেকোদের সিন্ডিকেট পুরোপুরি দমন করা সম্ভব হচ্ছে না বলে স্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।


এ সম্পর্কিত আরো খবর