দেশের প্রথাগত পুথিগত ও গৎবাঁধা শিক্ষাব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার একঘেয়েমি দূর করতে এবং তাদের শারীরিক, মানসিক ও ব্যবহারিক দক্ষতার বিকাশ ঘটাতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে যুক্ত হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী চারটি নতুন পাঠ্যবই। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ইতিমধ্যে এই নতুন বইগুলোর খসড়া রূপরেখা প্রস্তুত করেছে, যা আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই চূড়ান্ত রূপ পাবে। কেবল তত্ত্বীয় জ্ঞান নয়, বরং আনন্দময় পরিবেশ ও বাস্তবমুখী শিক্ষার আলোকেই এই বইগুলোর ভেতরের বিষয়বস্তু বা কনটেন্ট সাজানো হচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের আগামীর দক্ষ ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে অনন্য ভূমিকা রাখবে।
নতুন এই বিশাল কর্মযজ্ঞের অংশ হিসেবে চতুর্থ এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে দুটি করে মোট চারটি আকর্ষণীয় বই অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এনসিটিবির প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একদল বিশেষজ্ঞ শিক্ষকের নেতৃত্বে এই বইগুলোর কনটেন্ট নির্ধারণ, পরিমার্জন এবং নতুন শিক্ষাক্রমের খসড়া তৈরির কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। বর্তমানে ঢাকার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে বিশেষ কর্মশালার মাধ্যমে এই নতুন বইগুলোর শেষ মুহূর্তের কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে। এই সংস্কারের ধারাবাহিকতায় ২০২৮ সাল থেকে দেশের সামগ্রিক শিক্ষাক্রমে আরও বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন ও পরিমার্জন আনার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা রয়েছে শিক্ষা প্রশাসনের।
নতুন খসড়া অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ‘খেলাধুলা’ এবং ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ শিরোনামের দুটি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় বই যুক্ত হতে যাচ্ছে। মূলত আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে মাঠের খেলাধুলার প্রতি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের যে অনীহা তৈরি হয়েছে, তা দূর করতেই এই বিশেষ উদ্যোগ। ‘খেলাধুলা’ বইটিতে দেশের জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী আটটি প্রধান ইভেন্টকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই তালিকায় রয়েছে ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, কাবাডি, দাবা, অ্যাথলেটিকস, সাঁতার এবং মার্শাল আর্টের মতো বিষয়। শিক্ষার্থীদের কেবল খেলার নিয়মই শেখানো হবে না, বরং খেলার সামগ্রিক ধারণা, মানবজীবনে এর প্রয়োজনীয়তা এবং স্বাস্থ্যগত উপকারিতাও তুলে ধরা হবে। এই বইটির ‘শরীরচর্চা ও ব্যায়াম’ নামের একটি বিশেষ অধ্যায়ে ফুসফুসের কার্যকারিতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় ওয়ার্মআপ, স্ট্রেচিং, ফ্রি-হ্যান্ড ব্যায়াম এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণের কলাকৌশল শেখানো হবে। এছাড়া খেলাধুলার সাথে মানসিক প্রশান্তির নিবিড় সম্পর্ক, খেলার মাঠে হঠাৎ ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা ও এর তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা এবং তৃণমূলের প্রতিভা অন্বেষণের বিষয় নিয়ে ‘নতুন কুঁড়ি ক্রীড়া’ শিরোনামে আলাদা আকর্ষণীয় অধ্যায় রাখা হবে।
চতুর্থ শ্রেণির অন্য নতুন বই ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’র মূল উদ্দেশ্য হলো নতুন প্রজন্মকে শেকড়ের ইতিহাসের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। এই বইটির ‘আমি ও আমার সংস্কৃতি’ অধ্যায়ে সংস্কৃতির সহজ ধারণা, মানবচরিত্রে সংস্কৃতির গভীর প্রভাব এবং নিজের ব্যক্তিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা থাকবে। ‘উৎসব ও ঐতিহ্য’ অধ্যায়ে স্থান পাবে বাঙালি ও অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর জাতীয়, ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের ইতিহাস। এর মধ্যে বাঙালির প্রাণের উৎসব পয়লা বৈশাখ, নবান্ন, বাঙালির গৌরবের বিজয় দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২১শে ফেব্রুয়ারি উদযাপনের তাৎপর্য ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের গুরুত্ব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে শেখানো হবে।
একই সাথে ‘শিল্প-সংস্কৃতি’ অধ্যায়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সুকুমার বৃত্তির বিকাশের জন্য সংগীত, নৃত্য, নাটক, চিত্রকলা, কারুশিল্প ও হস্তশিল্পের বুনিয়াদি পরিচয় তুলে ধরা হবে। দেশের মাটির লোকগান, লোকনৃত্য, প্রাচীন লোককথা, প্রবাদ-প্রবচন, গ্রামীণ মেলা, লোকজ খেলাধুলার পাশাপাশি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, বিভিন্ন অঞ্চলের আঞ্চলিক পোশাকের বৈচিত্র্য, অলংকার ও হস্তশিল্পের ইতিহাস জানা যাবে এই বই থেকে। দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ অন্যান্য ধর্ম ও জনগোষ্ঠীর মানুষের ভাষা, পোশাক, উৎসব, জীবনধারা এবং ঐতিহ্যের সাথে শিক্ষার্থীদের মেলবন্ধন তৈরি করতে এটি বিশেষ ভূমিকা রাখবে, যা বৈচিত্র্যের মধ্যে সুদৃঢ় ঐক্যের ধারণা দেবে।
অন্য দিকে, মাধ্যমিক স্তরের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি করা হচ্ছে ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘আনন্দময় শিখন’ নামের দুটি যুগোপযোগী বই। ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইটির মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই শ্রমের মর্যাদা এবং প্রায়োগিক ও কারিগরি শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তোলা। এতে দৈনন্দিন জীবনে একজন দক্ষ মানুষের ভূমিকা, পেশাগত মর্যাদা, গৃহস্থালি ও সামাজিক জীবনে কারিগরি দক্ষতার বাস্তব প্রয়োগের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। প্রথাগত পড়াশোনার বাইরে গিয়ে সমস্যা থেকে বাস্তবসম্মত উপায়ে সমাধান খোঁজা, দক্ষতা সম্পর্কে সমাজের প্রচলিত ভুল ধারণার পরিবর্তন এবং দক্ষতা শেখার প্রথম ধাপ হিসেবে সঠিক পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি শেখানো হবে এই বইয়ে। একই সাথে কর্মক্ষেত্রে নিরাপদভাবে কাজ শেখা এবং সমাজ ও জাতীয় অর্থনীতি উন্নয়নে দক্ষ জনগোষ্ঠীর ভূমিকা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা হবে, যা তাদের ভবিষ্যতের নতুন এক ক্যারিয়ারের পথ উন্মোচন করতে সাহায্য করবে।
ষষ্ঠ শ্রেণির দ্বিতীয় বই ‘আনন্দময় শিখন’ (লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস)-এর মূল দর্শন হলো শিক্ষার্থীদের মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটানো। এই বইটিতে নিয়মিত ব্যায়াম করা, নিজের শরীরের সঠিক যত্ন নেওয়া, বিনয়ী ও পরোপকারী হওয়া এবং জীবনের ছোট ছোট অর্জনে কৃতজ্ঞ থাকার অভ্যাস শেখানো হবে। এর মধ্যে ‘প্রিয় ও ভালোবাসার মানুষদের সঙ্গে থাকা’ নামের একটি বিশেষ অধ্যায়ে পারিবারিক ও সামাজিক ভালো সম্পর্কের সাথে আনন্দের গভীর যোগসূত্র, ভালো বন্ধু ও ইতিবাচক মানুষের মানবিক গুণাবলি এবং সমাজে নেতিবাচক সঙ্গের ক্ষতিকর কুপ্রভাবগুলো অত্যন্ত সহজ ভাষায় গল্পাকারে উপস্থাপন করা হবে।
নতুন এই চার পাঠ্যবইয়ের রূপরেখা চূড়ান্ত করতে আয়োজিত কর্মশালার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, আনন্দময় শিখন বা ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ হলো আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার মূল দর্শন। আমরা চাই কেবল এই নতুন বইগুলোই নয়, বরং গণিত, বাংলা, ভূগোল কিংবা ইতিহাস—সব বিষয়ের ক্লাসেই যেন এই দর্শনের শতভাগ প্রতিফলন থাকে। খেলাধুলা ও সংস্কৃতি বিষয়ের বই দুটিকে প্রচলিত বইয়ের তুলনায় আরও আকর্ষণীয় ও ভিন্নধর্মী করার তাগিদ দেন তিনি। কারিগরি শিক্ষার বই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এর মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হতে উদ্বুদ্ধ করা।
এই কর্মশালায় নতুন শিক্ষাক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করে আরও বক্তব্য রাখেন দেশের সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এবং যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। এনসিটিবির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিকূল ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে কর্মশালার প্রথম দিনে চার বইয়ের বিষয়বস্তু চূড়ান্ত করার কাজ শেষ করা না গেলেও, খুব দ্রুতই মঙ্গলবারের মধ্যে এই যুগোপযোগী শিক্ষাক্রমের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া সম্ভব হবে।