দুমকি (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি:
পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার আংগারিয়া ইউনিয়নের জলিশা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চরম দায়িত্বহীনতা ও উদাসীনতার কারণে দীর্ঘ সাড়ে ছয় বছর ধরে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম। একটি আধুনিক ও নিরাপদ একাডেমিক ভবনের স্বপ্ন নিয়ে সাড়ে ছয় বছর আগে যে নির্মাণকাজের সূচনা হয়েছিল, তা আজ অব্দি আলোর মুখ দেখেনি। ফলে আড়াইশ কোমলমতি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ও পড়াশোনা এখন গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ঠিকাদারের ফেলে রাখা অসমাপ্ত ভবনের কঙ্কালসার কাঠামোর ভেতর এখন রীতিমতো বর্ষার পানিতে স্থানীয়রা মাছ চাষ করছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, বিদ্যালয়ে এমনিতেই তীব্র কক্ষ সংকট রয়েছে, তার ওপর নির্মাণকাজের সুবিধার্থে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ছেড়ে দেওয়া স্কুলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কক্ষ বছরের পর বছর ধরে তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। এতে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের গাদাগাদি করে ক্লাস করতে হচ্ছে, অন্যদিকে নষ্ট হচ্ছে একাডেমিক পরিবেশ, যা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদ্যালয় প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে ৮০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে এই নতুন একাডেমিক ভবন নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। পটুয়াখালী শহরের প্রাণকেন্দ্র কালিকাপুর এলাকার প্রভাবশালী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স হাসান অ্যান্ড ব্রাদার্স’ এই বড় কাজটি পায়। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, পটুয়াখালীর তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাদিউস জামানের স্বাক্ষর করা ২০২০ সালের ৩ মার্চের কার্যাদেশ অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে কাজ শুরুও হয়েছিল। এই পুরো প্রকল্পের টেন্ডার আইডি ছিল ৩৭০১৫৮। কার্যাদেশ পাওয়ার পরপরই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি তোড়জোড় করে কাজ শুরু করলেও তা বেশি দূর এগোয়নি। ভবনের মূল মাটির নিচের ভিত্তির ওপর মাত্র ৫ থেকে ৬ ফুট কলাম ঢালাই করার পরেই রহস্যজনক কারণে হঠাৎ করে কাজ বন্ধ করে দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি। এরপর থেকে দীর্ঘ সাড়ে resignation বছর ধরে প্রকল্প এলাকায় কোনো রাজমিস্ত্রি বা শ্রমিকের দেখা মেলেনি এবং প্রকল্পের এক ইঞ্চিও অগ্রগতি হয়নি।
দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ থাকায় এবং ভবনের চারপাশ উন্মুক্ত থাকায় বর্ষার মৌসুমে সেখানে বিপুল পরিমাণ পানি জমে ডোবার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যার সুযোগ নিয়ে স্থানীয় কিছু মানুষ সেখানে মাছের পোনা ছেড়ে রীতিমতো চাষাবাদ শুরু করেছে। একটি নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে সরকারি টাকা এভাবে অপচয় হওয়া এবং ভবনের ভেতরে মাছ চাষের ঘটনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহল। তাদের মতে, প্রশাসনের সঠিক নজরদারির অভাবেই ঠিকাদার এভাবে কাজ ফেলে রাখার সাহস পেয়েছে।
নতুন ভবন না হওয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাদের দীর্ঘদিনের আক্ষেপ ও ক্ষোভ এখন হতাশায় রূপ নিয়েছে। বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির নিয়মিত শিক্ষার্থী মার্জিয়া তাবাচ্ছুম অনন্যা তার মনের কষ্ট ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে, “যখন এই জলিশা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলাম, তখন স্কুলের সামনে নতুন ভবনের কাজ শুরু হতে দেখে অনেক আনন্দ হয়েছিল। বন্ধুদের সাথে গল্প করতাম যে আমরা নতুন ও সুন্দর ক্লাসরুমে বসে পড়াশোনা করব। কিন্তু আমাদের স্কুল জীবনই শেষ হতে চলল, এসএসসি পরীক্ষা চলে এলো, অথচ নতুন ভবনে একটি ক্লাস করার ভাগ্যও আমাদের হলো না। ভাঙাচোরা পুরোনো রুমে আমাদের গাদাগাদি করে বসতে হয়, যার কারণে প্রতিদিনের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।”
বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষক গৌতম চন্দ্র হাওলাদার স্কুলের এই বেহাল দশা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে ২৪াস জন শিক্ষার্থী নিয়মিত পড়াশোনা করছে। গ্রামীণ অঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী স্কুল হওয়া সত্ত্বেও এখানে তীব্র শ্রেণিকক্ষ সংকট রয়েছে। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখেছেন যে, নির্মাণকাজের মালামাল ও সিমেন্ট রাখার সুবিধার্থে বিদ্যালয়ের তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটি স্কুলের একটি ভালো ও বড় কক্ষ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সাময়িকভাবে ব্যবহার করতে দিয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, বিগত সাড়ে ছয় বছর ধরে সেই কক্ষটি তালাবদ্ধ অবস্থায় অলস পড়ে আছে। ঠিকাদারের কোনো লোক সেখানে আসে না এবং কক্ষটিও বুঝিয়ে দেয় না। এর ফলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান আরও বেশি ব্যাহত হচ্ছে। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বহুবার জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সাথে সরাসরি ও লিখিতভাবে যোগাযোগ করেছেন, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তিনি অবিলম্বে এই অচলাবস্থা নিরসন করে দ্রুত ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন। একই কথা জানান সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. খলিলুর রহমানও। তিনি বলেন, তার দায়িত্ব পালনকালেও তিনি একাধিকবার ঠিকাদার ও ইঞ্জিনিয়ারদের অফিসে ধরনা দিয়েছেন, কিন্তু ঠিকাদারের চরম অবহেলার কারণে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
এই চরম গাফিলতি ও দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হাসান অ্যান্ড ব্রাদার্সের সরকারি নথিতে দেওয়া মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি, এমনকি ফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। দুমকি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম এই বিষয়ে ঢাকাটুডেকে বলেন, “জলিশা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবনের বিষয়টি সম্পর্কে আমি বিস্তারিত খোঁজখবর নিয়েছি। একটি সরকারি কাজ এভাবে সাড়ে ছয় বছর বন্ধ থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমি দ্রুত এই বিষয়ে একটি তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবহিত করব যাতে শিক্ষার্থীদের কষ্ট লাঘব হয়।”
এদিকে, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, পটুয়াখালীর চলতি দায়িত্বে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনিরুল কবির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, “উক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ শেষ করার জন্য আমাদের অফিস থেকে বারবার দাপ্তরিক চিঠি ও চূড়ান্ত নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তারা কোনো প্রকার চিঠির উত্তর দেয়নি বা সাড়াশব্দ করেনি। যেহেতু তারা চুক্তি ভঙ্গ করেছে, তাই প্রচলিত সরকারি বিধি ও আইন অনুযায়ী বর্তমান ঠিকাদারের লাইসেন্স ও চুক্তি বাতিল করে পুনরায় নতুন টেন্ডার বা পুনঃদরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে বাকি থাকা অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। খুব দ্রুতই নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে ভবনের কাজ শেষ করা হবে।”