ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
কাশফুল শুধু সৌন্দর্য নয়, অনেকের জীবিকাও বটে তাড়াশে গোয়ালঘরের তালা ভেঙে ৮টি গরু চুরি, নিঃস্ব কৃষক পরিবার ডেঙ্গুতে আরও ৮ জনের মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ১৭৩৩ জন ঢাকার দুই সিটিতে জামায়াতের অনানুষ্ঠানিক মেয়র প্রার্থী ঘোষণা চারবার গুলিবিদ্ধ ও তিনবার কারাবরণ: ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আলোচনায় ইশরাক অঙ্গ পাচার চক্রের হাত থেকে ফিরল লোহাগাড়ার রায়হান ডিএমপির ৩ সহকারী পুলিশ কমিশনারকে নতুন পদে বদলি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তাপ: বিশ্ববাজারে তেলের দাম ছাড়াল ১০৭ ডলার হরমুজে নতুন নৌপথ: ওমানের আঞ্চলিক বৈঠক স্থগিত দেশে ফিরে ইতালিতে হামলার বিরুদ্ধে মুখ খুললেন অভিনেত্রী বাঁধন

৭ জেলায় ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড় ধস: মৃত ৫৪, বিপাকে ৬ লাখ মানুষ


  • আপলোড সময় : সোমবার ১৩ জুলাই, ২০২৬ সময় : ৪:৫৫ পিএম

আকাশভাঙা অতিবর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা প্রলয়ঙ্করী পাহাড়ি ঢল এবং উপকূলীয় ও পাহাড়ি জেলাগুলোতে একের পর এক ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনায় দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদ এখন সম্পূর্ণ পানির নিচে ভাসছে। প্রকৃতির এই আকস্মিক ও রুদ্র রোষে দেশের ৭টি জেলায় এ পর্যন্ত নারী ও শিশুসহ মোট ৫৪ জন অসহায় মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাতে বিভিন্ন স্থানে মাটির নিচে চাপা পড়ে কিংবা পানিতে ভেসে গিয়ে আরও অন্তত ৩৯ জন মানুষ গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে প্রশাসন। আকস্মিক বন্যাকবলিত এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের প্রায় দেড় লক্ষাধিক পরিবার বর্তমানে সম্পূর্ণ পানিবন্দী অবস্থায় চরম মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সব মিলিয়ে এই বন্যায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত ও সর্বস্বান্ত মানুষের সংখ্যা ইতিমিধ্যেই ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১ জন ছাড়িয়ে গেছে, যা উপদ্রুত এলাকার গ্রামীণ অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আজ সোমবার (১৩ জুলাই) বিকেলে সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ ও বিশেষ হালনাগাদ পরিস্থিতি প্রতিবেদন থেকে দেশের বন্যা ও ক্ষয়ক্ষতির এই ভয়ংকর ও উদ্বেগজনক চিত্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে জানা গেছে।

ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া বিশদ ও সংগৃহীত তথ্যের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশের মূলত ৭টি জেলা এই নজিরবিহীন ও আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির ভয়াবহ শিকার হয়েছে। প্রকৃতির এই প্রলয় নাচন ও ঢলে প্লাবিত দুর্গম জেলাগুলোর তালিকায় রয়েছে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার এবং হবিগঞ্জ। পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টির কারণে এই ৭টি জেলার অভ্যন্তরে থাকা মোট ৫৯টি উপজেলা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, দুর্গত অঞ্চলের গ্রামীণ ও শহরতলীর মোট ৩৩৪টি ইউনিয়ন এবং ১২টি প্রথম শ্রেণীর পৌরসভা এই বন্যার করাল গ্রাসে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিধ্বস্ত হয়েছে। পানির তীব্র স্রোতের কারণে হাজার হাজার কাঁচা ঘরবাড়ি ভেঙে পড়েছে, ভেসে গেছে ফসলের ক্ষেত ও শত শত মৎস্য ঘের।

মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত মাঠপর্যায়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বন্যাকবলিত এই অঞ্চলগুলোর প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩১১টি পরিবার তাদের বসতভিটায় বুকসমান কিংবা ঘরের ছাদ ছোঁয়া পানিতে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ বা পানিবন্দী অবস্থায় অসহায় দিনাতিপাত করছেন। বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও জরুরি চিকিৎসার অভাবে এসব পরিবারের মাঝে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে মানবজীবনের ওপর, যেখানে এখন পর্যন্ত ৫৪ জন তাজা প্রাণ অকালে ঝরে গেছে এবং আহত ৩৯ জন দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

বন্যার কারণে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে পর্যটন নগরী কক্সবাজার। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মৃত ৫৪ জনের মধ্যে শুধুমাত্র কক্সবাজার জেলাতেই পাহাড় ধস ও বন্যার পানিতে ডুবে সর্বোচ্চ ৩১ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এর পরেই মৃত্যুর দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম জেলা, যেখানে পাহাড়ের মাটি ধসে ও বানের পানিতে ভেসে ১৩ জনের করুণ মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া বান্দরবানে ৬ জন, রাঙামাটিতে ৩ জন এবং দূরবর্তী মৌলভীবাজার জেলায় ১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে প্রশাসন। অন্যদিকে, এই দুর্যোগে আহত ৩৯ জনের জেলাভিত্তিক তালিকায় দেখা গেছে, কক্সবাজারে সর্বোচ্চ ২৪ জন, চট্টগ্রামে ১২ জন, পার্বত্য বান্দরবানে ২ জন এবং খাগড়াছড়িতে ১ জন ব্যক্তি চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন।

এই চরম ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ঘরবাড়ি হারানো ও পানির তোড়ে ভেসে যাওয়া বিপন্ন মানুষদের তাৎক্ষণিক ও জরুরি আশ্রয় প্রদানের লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে বন্যাকবলিত জেলাগুলোতে মোট ১ হাজার ৪২টি সুসজ্জিত আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এসব সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে ইতিমধ্যে প্রায় ৩৮ হাজার ৪২২ জন গৃহহীন ও বিপন্ন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। উপদ্রুত এলাকায় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে শুকনো খাবার, চাল ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হচ্ছে। দুর্গত মানুষের কষ্ট লাঘবে এবং ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবক দল দিনরাত উদ্ধার তৎপরতা ও ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর