চলমান ফুটবল বিশ্বকাপের মহারণে বর্তমান ও সাবেক দুই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার হাইভোল্টেজ ম্যাচকে কেন্দ্র করে এখন পুরো ক্রীড়া বিশ্বের আলোচনা ও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটি। ফুটবলের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী এই দুই পরাশক্তির বেস ক্যাম্প বা সাময়িক আস্তানা বসানো হয়েছে আমেরিকার এই শান্ত ও সবুজ শহরে। মাঠের লড়াই শুরুর আগে দুই দলের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি ও ক্যাম্পের ভেতরের আবহ সরাসরি কাভার করতে নিউইয়র্ক থেকে কানসাসে আসা।
কানসাস বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর আগে থেকেই সেখানে অপেক্ষায় ছিলেন শুভাকাঙ্ক্ষী ও যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশী শামসাদ আব্দুল্লাহ (স্বচ্ছ)। বিমানবন্দর থেকে মহাসড়কের দুই ধারের নয়নজুড়ানো সবুজের সারি পেরিয়ে স্বচ্ছ’র বাসভবনে পৌঁছাতে সময় লাগে মিনিট ত্রিশেক। আমেরিকার প্রধান শহর নিউইয়র্কের চেয়ে সময়ের দিক থেকে কানসাস সিটি ঠিক এক ঘণ্টা পিছিয়ে। বিমানবন্দরে নেমেই আর্জেন্টিনার পূর্বনির্ধারিত প্রেস কনফারেন্স ধরার তীব্র তাড়া থাকায় প্রবাসীর বাসায় দ্রুত ব্যাগ রেখে আবারও ছুটতে হয় স্টেডিয়ামের উদ্দেশ্যে। যাওয়ার দীর্ঘ পথটিও ছিল মহাসড়ক আর চারদিকের দিগন্তজোড়া সবুজে ঘেরা।
নিউইয়র্কের মতোই এই গ্রীষ্মকালে কানসাসেও সূর্য ডোবে বেশ দেরিতে, সন্ধ্যা সাড়ে আটটার পর। তবে নিউইয়র্ক বা বোস্টনের মতো কানসাস সিটি অতটা জনাকীর্ণ বা ব্যস্ত শহর নয়। এখানে মানুষের সংখ্যা যেমন তুলনামূলক কম, তেমনি দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা ও কোলাহলও অনেক সীমিত। রাস্তায় তীব্র ট্রাফিক জ্যাম বা দীর্ঘ সিগন্যালের ঝক্কি নেই বললেই চলে। এক অপরূপ নীরবতাই যেন এই ছিমছাম শহরটির প্রধানতম সৌন্দর্য।
বিশ্বকাপের আর্জেন্টিনা বনাম সুইজারল্যান্ডের মধ্যকার শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচটি কাভার করে প্রবাসীর বাসায় ফিরতে ফিরতে ঘড়ির কাঁটায় রাত দুইটা বেজে যায়। পরের দিন রোববার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় কানসাস ও তার নিকটবর্তী শহরগুলো ঘুরে দেখার একটি পরিকল্পনা করা হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই পুরনো বন্ধু রাকা ও রসি আইওয়া অঙ্গরাজ্য থেকে কানসাসের নিকটবর্তী একটি ডিরেক্ট পার্কে এসেছিলেন দেখা করতে। বন্ধুদের সাথে সাক্ষাৎ করতে কানসাস থেকে স্বচ্ছর গাড়িতে রওনা হওয়া। যাওয়া-আসা মিলিয়ে পুরো চার ঘণ্টার সফরটি ছিল মসৃণ মহাসড়ক আর নয়নজুড়ানো প্রাকৃতিক সবুজের চাদরে ঢাকা।
তবে এদিন বিকেলে আর্জেন্টিনার ফুটবল দলের একটি বিশেষ অনুশীলন সেশন থাকায় ভ্রমণ সংক্ষিপ্ত করে তড়িঘড়ি আবারও কানসাস সিটিতে ফিরে আসতে হয়। ক্রীড়ামোদিদের কাছে কানসাস সিটির ঐতিহাসিক ‘সুপার বোল’-এর ব্যাপক সুনাম রয়েছে। এবারের ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে কানসাসকে বেশ নতুন সাজে সাজানো হয়েছে এবং অবকাঠামোগত কিছু উন্নয়নমূলক কাজ করে পুরো শহরে ফুটবলীয় রূপ দেওয়া হয়েছে। কানসাস বিমানবন্দরে নামার পর থেকেই বিশ্বকাপের বড় বড় ওয়েলকাম বোর্ড ও লোগো আগত ফুটবলপ্রেমী ও যাত্রীদের স্বাগত জানাচ্ছে, যা আমেরিকার অনেক বড় বড় বিমানবন্দরেও অনুপস্থিত ছিল।
কানসাসের সামগ্রিক আয়তন ও জনসংখ্যা কম হওয়ায় প্রবাসীদের সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই নিউইয়র্ক বা অন্য মেগাসিটির চেয়ে অনেক কম। এরপরও স্বস্তির বিষয় হলো, বিখ্যাত কানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের একঝাঁক মেধাবী শিক্ষার্থী রয়েছেন, যাঁরা এখানে উচ্চশিক্ষায় মাস্টার্স কিংবা পিএইচডি করছেন। এখানকার বাংলাদেশী প্রবাসীদের কমিউনিটি আকারে ছোট হলেও, একে অন্যের সাথে গভীর যোগাযোগ এবং আন্তরিকতা সত্যিই প্রশংসনীয়। আমেরিকায় ক্রিকেট খেলাটা তেমন জনপ্রিয় বা প্রচলিত না হলেও, কানসাসে সামার বা গ্রীষ্মকালীন সময়ে শৌখিন পর্যায়ের একটি চমৎকার ক্রিকেট লিগ অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ও স্থানীয় প্রবাসীদের সমন্বয়ে গঠিত সেই জনপ্রিয় ক্রিকেট দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র ও বর্তমানে কানসাসে পিএইচডি গবেষক আব্দুল্লাহ আল মামুন। কানসাসে বসবাসরত অনেক বাংলাদেশী প্রবাসী ফুটবলপ্রেমী ইতিমধ্যে বিশ্বকাপের বেশ কয়েকটি ম্যাচ মাঠে বসে দেখার বিরল অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।
বর্তমানে কানসাস সিটি বলতে গেলে পুরোপুরি আর্জেন্টাইন সমর্থকদের দখলে চলে গেছে। রাতারাতি বদলে গেছে এই শান্ত শহরটির চিরচেনা চেহারা। স্থানীয় ক্যাফে, রেস্তোরাঁ, শপিং মল থেকে শুরু করে সাধারণ রাস্তাঘাট—সবখানেই এখন শোভা পাচ্ছে আকাশী-নীল পতাকার জোয়ার। দূর-দূরান্ত থেকে খেলা দেখতে আসা হাজারো আর্জেন্টাইন ভক্তের পাশাপাশি স্থানীয় মার্কিন নাগরিকরাও এখন মজেছেন লিওনেল মেসি উন্মাদনায়। কানসাসে আর্জেন্টিনার মূল বেস ক্যাম্পটির অবস্থান মনোরম মিশৌরী লেকের ঠিক কোল ঘেঁষে। দল যে হোটেলে অবস্থান করছে, তার সামনে ঝুলছে লিওনেল মেসির বিশাল এক রাজকীয় ছবি। নিরাপত্তার স্বার্থে চারদিকে কাঁটাতারের কড়া বেষ্টনী দেওয়া থাকলেও, ব্যানার জুড়ে বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে ‘ভামোস আর্জেন্টিনা’। পুরো হোটেল প্রাঙ্গণ জুড়েই বিরাজ করছে আর্জেন্টিনার নিজস্ব চেনা আবহ।
আর্জেন্টিনার আকাশী-নীল জোয়ারের পাশাপাশি তাদের সেমিফাইনালের মূল প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ডের বেস ক্যাম্পও তৈরি করা হয়েছে এই কানসাস সিটিতেই। তবে আর্জেন্টাইনদের তুলনায় ইংল্যান্ডের বেস ক্যাম্পের আশেপাশে ইংলিশ সমর্থকদের ভিড় ও উন্মাদনা কিছুটা কম চোখে পড়েছে।
আগামী ১৫ জুলাই আটলান্টার ঐতিহাসিক মাঠে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ডের মধ্যকার সেই সেমিফাইনালের মেগা ফাইট। সেই ঐতিহাসিক ম্যাচটি সরাসরি গ্যালারি থেকে কাভার করার জন্য এবার কানসাস থেকে আটলান্টার উদ্দেশ্যে যাত্রা করার পালা। ফুটবলীয় রোমাঞ্চ আর সবুজের ঘেরা কানসাস সিটিতে দেখতে দেখতে চোখের পলকেই কেটে গেল দারুণ তিনটি দিন।