ইউরোপীয় ফুটবলের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি ফ্রান্স ও স্পেন আজ রাতে মুখোমুখি হচ্ছে এক পরম মহাকাব্যিক লড়াইয়ে। স্প্যানিশ ফুটবলের বিস্ময় বালক লামিনে ইয়ামাল গতকাল সোমবারই পা রেখেছেন ১৯ বছরে। অন্যদিকে, ফ্রান্স এমন একটি বিশেষ দিনে সেমিফাইনালের মঞ্চে নামছে, যেদিন পুরো ফরাসি জাতি উদযাপন করছে তাদের ঐতিহাসিক জাতীয় ও বাস্তিল দিবস। আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দিবাগত রাত একটায় ফুটবল বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে টেক্সাসের ডালাস স্টেডিয়ামে ফাইনালে ওঠার এই মেগা দ্বৈরথ অনুষ্ঠিত হবে।
ইতিহাস ও বর্তমান ফর্মের বিচারে দুই দলের এই ম্যাচটিকে চলতি বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ও মর্যাদাপূর্ণ ম্যাচ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। দু’বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ও গত আসরের রানার্সআপ ফ্রান্সের সামনে আজ নতুন এক ইতিহাস গড়ার হাতছানি। স্প্যানিশ বাধা টপকাতে পারলে পশ্চিম জার্মানির পর ইতিহাসের দ্বিতীয় ইউরোপীয় দল হিসেবে টানা তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার অনন্য এক কীর্তি গড়বে ‘লে ব্লু’রা। তবে তাদের সামনে বড় বাধা সর্বশেষ ২০২৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপাজয়ী স্পেন, যারা সেই ইউরোর সেমিফাইনালে এই ফরাসিদেরই টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করে দিয়েছিল।
ইউরোপীয় ফুটবলের এই ‘ধ্রুপদী লড়াইয়ে’ দুই দলের কৌশলগত দর্শনে রয়েছে দারুণ বৈপরীত্য। ফ্রান্স যেখানে নিজেদের অতি দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাক ও প্রতি-আক্রমণাত্মক ফুটবলে প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দিতে পারদর্শী, স্প্যানিশরা সেখানে বল পজেশন, নিখুঁত পাসিং ও নিয়ন্ত্রিত ফুটবলের ঘরানায় বিশ্বাসী। অতীতে ১৯৯৮ ও ২০১৮ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ফ্রান্স, আর স্পেনের একমাত্র বিশ্বশিরোপাটি এসেছিল ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা আসরে।
চলমান বিশ্বকাপে ফ্রান্সের আক্রমণভাগ ছিল টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বিধ্বংসী ও গোলক্ষুধার্ত। ফরাসি অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে পাঁচ ম্যাচে আট গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবার শীর্ষে অবস্থান করছেন। আক্রমণভাগে তাঁর যোগ্য সঙ্গী উসমান দেম্বেলে করেছেন পাঁচ গোল। তরুণ ব্র্যাডলি বারকোলা যোগ করেছেন দুটি গোল এবং মাঝমাঠে পাঁচটি অ্যাসিস্ট নিয়ে দলের সেরা প্লেমেকার হিসেবে ভূমিকা রাখছেন মাইকেল অলিসে। এত বিধ্বংসী পারফরম্যান্সের পরও অবশ্য অধিনায়ক এমবাপ্পে মনে করেন, বর্তমান দলটির এখনও চূড়ায় পৌঁছানো বাকি।
ম্যাচের আগে ফরাসি অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন: "আমি ২০১৮ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছি, ২০২২ সালে রানার্সআপ হয়েছি। কিন্তু এই দল এখনও কিছুই অর্জন করেনি। তবে এই দলটির সম্ভাবনা ও প্রতিভা সবচেয়ে বেশি। এই স্কোয়াডে অসাধারণ ফুটবলীয় দক্ষতা রয়েছে, তাই আমাদের আবারও বড় স্বপ্ন দেখার সুযোগ আছে।"
গত সাতটি বিশ্বকাপের মধ্যে ফ্রান্স রেকর্ড চারবার ফাইনালে উঠেছে, যার মধ্যে ২০০৬ ও ২০২২ আসরে তারা রানার্সআপ হয়ে মাঠ ছাড়ে। আজ স্পেনকে হারাতে পারলে ১৯৭৪ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে চারটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা শক্তিশালী পশ্চিম জার্মানির সোনালী প্রজন্মের রেকর্ডের সমান উচ্চতায় পৌঁছাবে ফ্রান্স।
অন্যদিকে, স্পেনের জন্য ফরাসিদের বধ করার কৌশল খুব ভালো করেই জানা আছে। ইউরো ২০২৪-এর সেমিফাইনাল এবং পরবর্তীতে ২০২৫ সালের উয়েফা নেশনস লিগের সেমিফাইনালে এই ফ্রান্সকে হারিয়েই ফাইনালে উঠেছিল লা রোজারা। তবে প্রতিপক্ষের মতো অতি আক্রমণাত্মক না হয়ে পুরো টুর্নামেন্টে অবিশ্বাস্য রক-সলিড নিয়ন্ত্রিত ফুটবল খেলেছে স্পেন। স্প্যানিশ রক্ষণভাগ এখন পর্যন্ত আসরে মাত্র একটি গোল হজম করেছে, সেটিও কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে। মাঝমাঠে রদ্রি, পেদ্রি ও দানি ওলমোর ত্রয়ী প্রতিপক্ষকে খুব কমই বলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছেন।
সেমিফাইনাল নিশ্চিত করার পর স্পেনের হেড কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে আত্মবিশ্বাসের সুরে বলেন, "এটিকে ফাইনালের আগেই একটি ফাইনাল বলা মোটেও বাড়াবাড়ি হবে না। আমরা এমন একটি দল, যারা ফাইনালে ওঠার ও জেতার পূর্ণ সামর্থ্য রাখি। এখন আমাদের পুরো মনোযোগ ফ্রান্সের দিকে। আমরা তাদের অসাধারণ শক্তিমত্তা সম্পর্কে খুব ভালো করেই জানি। তবে এটাও জানি, সেমিফাইনালের মঞ্চে তাদের দু’বার হারিয়ে বিদায় করা একমাত্র দল আমরাই।"
আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সবমিলিয়ে ৩৮ বার মুখোমুখি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে ফ্রান্স ও স্পেন। যেখানে স্প্যানিশদের দাপট বেশ স্পষ্ট; তারা ১৮টি ম্যাচে জয় পেয়েছে। বিপরীতে ফরাসিদের জয় ১৩টি ম্যাচে এবং বাকি ৭টি ম্যাচ অমীমাংসিত বা ড্র হয়েছে। তবে ফুটবল পরিসংখ্যান বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান অপ্টার সুপারকম্পিউটারের ভবিষ্যৎবাণী অনুযায়ী, নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলায় ফ্রান্সের জয়ের সম্ভাবনা ৪২.১ শতাংশ। আর স্পেনের জয়ের সম্ভাবনা ৩১.৮ শতাংশ। এ ছাড়া ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে ২৬.১ শতাংশ।