নড়াইল সদর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী আরবিএফএম ভবানীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে নজিরবিহীন জালিয়াতি, সরকারি ও দাপ্তরিক নথিপত্র জাল, পত্রিকার কপি জালিয়াতি এবং প্রতিবাদ করায় এক শিক্ষককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতিসহ পরিচালনা পর্ষদ ও শিক্ষক-কর্মচারী মিলিয়ে মোট ছয়জনের বিরুদ্ধে গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) নড়াইলের আদালতে এই মামলাটি করা হয়।
বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষক এম, এম জিয়াউল হক বাদী হয়ে এই মামলাটি দায়ের করেছেন।
মামলায় অভিযুক্ত আসামিরা হলেন—বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সাবেক সভাপতি সিকদার তোফায়েল আহমেদ, সহকারী প্রধান শিক্ষক নওরিন কবির, সহকারী শিক্ষক মো. আজিজুর রহমান, অফিস সহকারী শরীফ আব্দুল বাকী এবং স্থানীয় ভবানীপুর এলাকার বাসিন্দা শরীফ তোকরুল হোসেন ও শরীফ রেফায়েত হোসেন।
মামলার এজাহার ও বাদীপক্ষের অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, আর বি এফ এম ভবানীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘ সময় ধরে নানা জালিয়াতি, অবৈধ উৎকোচ আদান-প্রদান এবং আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে ভুয়া নিয়োগ বাণিজ্য চলে আসছিল। পূর্বের ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে প্রকাশিত একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ওপর ভিত্তি করে ২০১৪ সালে মোট তিনজন শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ওই নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা রুজু হয় এবং আইনি প্রক্রিয়ায় সাজা হওয়ার পর তিনি চাকরি থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ওই বিতর্কিত নিয়োগের পর নতুন করে আর কোনো নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া কিংবা নতুনভাবে কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি। অথচ ২০২৩ সালে এসে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে সেই ২০১৩ সালের পুরোনো বিজ্ঞপ্তি এবং নথিপত্র অপব্যবহার করে সম্পূর্ণ জাল উপায়ে নতুন নিয়োগ সম্পন্ন দেখানো হয়। জালিয়াতির অংশ হিসেবে বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রয়াত প্রধান শিক্ষক গোপাল চন্দ্র বিশ্বাসের সিল ও স্বাক্ষর জালিয়াতি করার মারাত্মক অভিযোগ আনা হয়েছে। এমনকি বাস্তবে কোনো নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত না হলেও কাল্পনিক পরীক্ষার ফলাফল (রেজাল্ট শিট), পরীক্ষার্থীদের ভুয়া উপস্থিতি খাতা ও অন্যান্য দাপ্তরিক কার্যবিবরণী সম্পূর্ণ জালিয়াতির মাধ্যমে প্রস্তুত করে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
বাদী শিক্ষক জিয়াউল হক দাবি করেন, এসব বেআইনি কার্যক্রম ও চরম আর্থিক অনিয়মের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করায় তিনিসহ বিদ্যালয়ের আরও কয়েকজন শিক্ষককে বিভিন্ন সময়ে চরম হয়রানির শিকার হতে হয়েছে।
মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে, গত ৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে বিদ্যালয়ের একটি অভ্যন্তরীণ সভা চলাকালে বাদী ও প্রধান শিক্ষক যৌথভাবে নিয়োগ সংক্রান্ত অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য প্রমাণসহ বিষয়টি উপস্থাপন করলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন আসামিরা। একপর্যায়ে আসামিরা তাদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং জোরপূর্বক বাদীর শার্টের কলার ধরে টানাটানি ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে সভাকক্ষ থেকে বের করে দেন। পরবর্তীতে তিনি বিদ্যালয়ে প্রবেশ করলে তাকে প্রাণনাশের হুমকি ও গুরুতর জখম করার ভয় দেখানো হয়। এই ঘটনার পর তিনি নিরাপত্তা চেয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করার পর থেকে আর বিদ্যালয়ে যেতে পারছেন না বলে দাবি করেছেন।
এদিকে, মামলার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান অভিযুক্ত ও সাবেক সভাপতি সিকদার তোফায়েল আহমেদ সম্পূর্ণ দায় অস্বীকার করে বলেন, “আমার কার্যকালে বা আমার দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে এই ধরনের কোনো নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। মামলায় আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে, তার কোনো ভিত্তি নেই এবং তা সম্পূর্ণ অসত্য।”