রেফারির শেষ বাঁশি বাজতেই উল্লাসে ফেটে পড়ল গ্যালারি। মাঠের বুকে তখন নীল-সাদা উৎসব। অথচ ম্যাচের ৮৫ মিনিট পর্যন্তও দৃশ্যপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। হারের শঙ্কায় যখন কাঁপছিল আলবিসেলেস্তেরা, ঠিক তখনই শুরু হলো এক অবিশ্বাস্য রূপকথা। মাত্র সাত মিনিটের ঝড়ে থমাস টুখেলের ইংল্যান্ডকে লণ্ডভণ্ড করে দিল লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা। এনজো ফার্নান্দেজের দূরপাল্লার রকেট গতির শট আর যোগ করা সময়ে লাউতারো মার্তিনেজের জাদুকরী হেডে ইংলিশদের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। রোমাঞ্চকর এই জয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে পা রাখল বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) আটলান্টায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ফুটবলপ্রেমীরা সাক্ষী হলেন এক ঐতিহাসিক ও স্নায়ুক্ষয়ী লড়াইয়ের। প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই জমে ওঠে ম্যাচ। ৪৭ মিনিটে হুলিয়ান আলভারেজের একটি জোরালো শট দুর্দান্ত দক্ষতায় রুখে দিয়ে ইংল্যান্ডের ত্রাতা হন গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড। এরপর দুপক্ষই আক্রমণ-প্রতিআক্রমণে ম্যাচ জমিয়ে তোলে।
খেলার ৫৫ মিনিটে প্রথমার্ধের ডেডলক ভেঙে লিড নেয় থমাস টুখেলের দল। ডেকলান রাইসের শুরু করা একটি আক্রমণ থেকে মরগান রজার্স ডান প্রান্ত দিয়ে দারুণ এক ক্রস বাড়ান। আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের তারকা নাহুয়েল মোলিনাকে ফাঁকি দিয়ে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে বল জালে জড়ান অ্যান্থনি গর্ডন। ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে চরম চাপে পড়ে যায় আর্জেন্টিনা।
তবে গোল হজম করার পর যেন আরও হিংস্র হয়ে ওঠে লিওনেল মেসির দল। প্রতিপক্ষের ওপর মুহুর্মুহু আক্রমণ চালাতে থাকে তারা। ইংলিশদের পুরোপুরি তাদের নিজেদের অর্ধে চেপে ধরে স্কালোনির শিষ্যরা। ৬৯ মিনিটে নিকোলাস গনসালেসের একটি শক্তিশালী হেড অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন পিকফোর্ড। ম্যাচের ৭৩ মিনিটে আক্রমণভাগ আরও শানিত করতে রদ্রিগো ডি পলকে মাঠে নামান আর্জেন্টাইন কোচ। এই কৌশলগত পরিবর্তনই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেয়। ৭৬ মিনিটে ডি পলের ক্রস থেকে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের নেওয়া হেড পোস্টে লেগে ফিরে আসে, আর তার ঠিক পরের মুহূর্তেই আরেকটি নিশ্চিত গোল ঠেকিয়ে দেন ইংলিশ গোলরক্ষক।
ম্যাচের শেষ দিকে আর্জেন্টিনার অনবরত চাপের মুখে অবশেষে ভেঙে পড়ে ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ। ৮৫ মিনিটে মেসির নেওয়া শর্ট কর্নার থেকে বল পেয়ে বক্সের ২৫ গজ দূর থেকে এক চোখধাঁধানো শটে জর্ডান পিকফোর্ডকে পরাস্ত করেন এনজো ফার্নান্দেজ। সমতায় ফেরে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
কিন্তু নাটকের তখনও শেষ অঙ্ক বাকি ছিল। সমতায় ফিরে আর্জেন্টিনা আক্রমণের ধার আরও বাড়িয়ে দেয়। ম্যাচের যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে মেসির বাড়ানো একটি নিখুঁত ও মাপা ক্রসে জন স্টোনস ও রিস জেমসের মাঝখান থেকে চিলির মতো উড়ে এসে দুর্দান্ত হেডে জাল খুঁজে নেন লাউতারো মার্তিনেজ। ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।
ম্যাচের বাকি সময় মরিয়া চেষ্টা করেও আর ম্যাচে ফিরতে পারেনি ইংল্যান্ড। এই জয়ে আগামী ২০ জুলাই টানা দ্বিতীয় শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে স্পেনের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে, ৮৫ মিনিট পর্যন্ত এগিয়ে থেকেও মাত্র সাত মিনিটের চরম নাটকীয়তায় আরও একবার শিরোপার স্বপ্নভঙ্গ হলো থমাস টুখেলের ইংল্যান্ডের।