বিশ্বকাপের হাইভোল্টেজ সেমিফাইনালে শেষ মুহূর্তের চরম নাটকীয়তায় ইংল্যান্ডকে স্তব্ধ করে দিয়েছে আর্জেন্টিনা। এনজো ফার্নান্দেজ ও লাউতারো মার্টিনেজের জাদুকরী পারফরম্যান্সে ২-১ ব্যবধানের রোমাঞ্চকর জয় তুলে নিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনাল নিশ্চিত করেছে লিওনেল মেসির দল। আটলান্টার মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামে ম্যাচের ৮৫ মিনিট পর্যন্ত ১-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও যেভাবে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন দেখিয়েছে, তা ফুটবল ইতিহাসে দীর্ঘকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই দেশের এই ব্লকবাস্টার লড়াইয়ের প্রথমার্ধ ছিল প্রচণ্ড উত্তেজনাপূর্ণ। প্রথম ৪৫ মিনিটে দুই দলই আক্রমণের চেয়ে বেশি মনোযোগ দিয়েছিল মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে রাখার দিকে। ফলে শুরু থেকেই দেখা গেছে একের পর এক ফাউল, শারীরিক সংঘর্ষ আর স্নায়ুর চরম পরীক্ষা। ইংল্যান্ড বলের নিয়ন্ত্রণে কিছুটা এগিয়ে থাকলেও আর্জেন্টিনার ইস্পাতকঠিন রক্ষণভাগে ফাটল ধরাতে পারেনি। প্রথমার্ধের সবচেয়ে সেরা সুযোগটি পেয়েছিলেন আর্জেন্টিনার এনজো ফার্নান্দেজ, তবে তার দূরপাল্লার জোরালো শটটি অল্পের জন্য ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে যায়।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ডেডলক ভেঙে ফেলে থমাস টুখেলের দল। ৫৩ মিনিটে মরগান রজার্সের এক নিখুঁত ক্রস থেকে অ্যান্থনি গর্ডনের চমৎকার ট্যাপ-ইনে লিড নেয় ইংল্যান্ড। পিছিয়ে পড়ার পর আর্জেন্টিনা একের পর এক আক্রমণ শানিয়েও সমতা ফেরাতে পারছিল না। অবশেষে ৮৫ মিনিটে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। শর্ট কর্নার থেকে মেসির নিখুঁত পাস পেয়ে বক্সের বাইরে থেকে এক দুর্দান্ত বাঁকানো শটে ইংলিশ গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডকে পরাস্ত করেন এনজো ফার্নান্দেজ।
ম্যাচের নাটকীয়তা তখনও বাকি ছিল। যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে ডান প্রান্তে ইংলিশ ডিফেন্ডার জেড স্পেন্সকে কাটিয়ে এক জাদুকরী ক্রস তোলেন মেসি। দূরের পোস্টে সম্পূর্ণ অরক্ষিত থাকা লাউতারো মার্তিনেজ নিখুঁত হেডে বল জালে জড়িয়ে ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন চূর্ণবিচূর্ণ করে দেন। খেলোয়াড়দের এমন অবিশ্বাস্য মানসিক দৃঢ়তা ও লড়াকু মনোভাব দেখে ম্যাচ শেষে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি আর্জেন্টিনার মাস্টারমাইন্ড কোচ লিওনেল স্কালোনি।
সংবাদ সম্মেলনে আবেগাপ্লুত স্কালোনি বলেন, “আমরা সত্যিই অনন্য এক দল, আর এটি কোনো অহংকার থেকে বলছি না। অন্তরের গভীর থেকে বলছি, এই অসাধারণ খেলোয়াড়রাই আজ আমাদের জয়ের বন্দরে নিয়ে গেছে। এই মুহূর্তে আনন্দ প্রকাশ করার মতো ভাষা আমি হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের দেশ ও সাধারণ জনগণের জন্য এ এক বিশাল ও ঐতিহাসিক আনন্দের মুহূর্ত।”
আর্জেন্টাইন জার্সি গায়ে খেলোয়াড়দের নিবেদন নিয়ে স্কালোনি আরও যোগ করেন, “ম্যাচের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজের সবটুকু উজাড় করে দেওয়ার মর্যাদা এই ঐতিহাসিক জার্সির প্রাপ্য, মাঠের বুকে কোনো কিছুই জমিয়ে রাখা উচিত নয়। আমাদের খেলোয়াড়রা আজ আবারও বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করেছে যে, দেশের সাধারণ মানুষের মতোই তারাও এই আকাশী-নীল জার্সির টান মনে-প্রাণে এবং গভীর অনুভূতির সাথে অনুভব করে।”
ফুটবল বিশ্বের সব চোখ এখন আগামী রোববারের মেগা ফাইনালের দিকে। আগামী ১৯ জুলাই বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত ১টায় নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা। স্প্যানিশদের রুখে দিয়ে ইতালি ও ব্রাজিলের পর ইতিহাসের তৃতীয় দল হিসেবে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার মহান লক্ষ্যে মাঠে নামবে লিওনেল মেসির অপরাজেয় দল।