ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

রক্ত, আগুন ও ব্ল্যাকআউট: জুলাই বিপ্লবের সেই ভয়াল ১৮ জুলাইয়ের দুই বছর


  • আপলোড সময় : শনিবার ১৮ জুলাই, ২০২৬ সময় : ৬:৪৬ পিএম

আজ ১৮ জুলাই। দুই বছর আগে ২০২৪ সালের এই অগ্নিঝরা দিনে ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের গতিপথ। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঘোষিত ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ বা সম্পূর্ণ অবরোধ কর্মসূচিকে ঘিরে সেদিন রাজধানী ঢাকাসহ সমগ্র দেশ রূপ নিয়েছিল এক রক্তাক্ত রণক্ষেত্রে। নির্বিচার গুলি, চারপাশের আগুন, আকাশ থেকে হেলিকপ্টারের তাণ্ডব আর সবশেষে নেমে আসা নজিরবিহীন সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট বা তথ্যপ্রযুক্তির অন্ধকার—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নৃশংসতম অধ্যায়ের জন্ম হয়েছিল এই দিনে। আজ সেই রক্তক্ষয়ী দিনটির দ্বিতীয় বার্ষিকী।

২০২৪ সালের ১৭ জুলাই রাত থেকেই দেশের আনাচে-কানাচে ক্ষোভের বারুদ জমতে শুরু করে। পরদিন ১৮ জুলাই সকাল হতেই রাজপথ অবরুদ্ধ করতে নেমে আসেন সাধারণ শিক্ষার্থী ও আমজনতা। সেদিন সহিংসতার সবচেয়ে বড় তাণ্ডবটি ঘটেছিল উত্তরার বুকে। বেলা ১১টার পর সড়ক অবরোধ ভাঙতে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে শুরু হয় দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড বর্ষণ করে। পাল্টা প্রতিরোধ হিসেবে আন্দোলনকারীরাও ইট-পাটকেল ছুড়তে বাধ্য হন।

উত্তরা এলাকার সেই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের একপর্যায়ে পুলিশের একটি গাড়ি আন্দোলনকারীদের ওপর তুলে দেওয়ার লোমহর্ষক দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ে গণমাধ্যমে, যা ক্ষোভের আগুনকে আরও বাড়িয়ে দেয়। সেদিনের সংঘর্ষে শুধু উত্তরা এলাকাতেই প্রাণ হারান আটজন মুক্তিকামী মানুষ। নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিলেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) মেধাবী ছাত্র মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। রক্তাক্ত তপ্ত রাজপথে তৃষ্ণার্ত সহযোদ্ধাদের মাঝে খাবার ও পানি বিতরণ করার সময় কপালে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান তিনি। তাঁর সেই আকুল আহ্বান ‘পানি লাগবে পানি’ পরবর্তী সময়ে গোটা ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রধানতম চালিকাশক্তি ও প্রতীকে পরিণত হয়।

উত্তরা ছাড়াও মহাখালী, বনানী, মিরপুর, ধানমন্ডি, রামপুরা, বাড্ডা এবং যাত্রাবাড়ীসহ রাজধানীর প্রতিটি প্রান্ত সেদিন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। মহাখালীতে অবস্থিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং বনানীর সেতু ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়া হলে সৃষ্ট ধোঁয়া মেট্রোরেলের লাইনে ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে বন্ধ করে দেওয়া হয় চারটি মেট্রো স্টেশন। ধানমন্ডির ২৭ নম্বর সড়কে বুক পেতে দিয়ে পুলিশের বুলেটে শহীদ হন রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের কিশোর শিক্ষার্থী ফারহান ফাইয়াজ। একই দিন পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যাত্রাবাড়ীতে নির্মমভাবে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান ঢাকা টাইমসের তরুণ সাংবাদিক মেহেদি হাসান।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো ততক্ষণে ফাঁকা করে দেওয়া হলেও আন্দোলনের হাল শক্ত হাতে ধরেছিলেন ব্র্যাক, ইস্ট ওয়েস্টসহ বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। প্রগতি সরণি অবরুদ্ধ করে তারা যখন প্রতিরোধ গড়ছিলেন, তখন তাদের ওপর চড়াও হয় পুলিশ। রামপুরা ও বাড্ডা এলাকায় তীব্র অভিযানের মুখেও বুক চিতিয়ে লড়াই করেন এই তরুণেরা। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, সেদিন আকাশেও এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখা যায়। রাজধানীর আকাশে চক্কর দেওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে নিদারুণভাবে টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলি ছুড়তে দেখা যায়, যা বিশ্বজুড়ে সমালোচনার ঝড় তোলে।

রাজধানীর গণ্ডি পেরিয়ে এই ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল নরসিংদী, চট্টগ্রাম, সাভার, মাদারীপুর, রংপুর ও সিলেটসহ দেশের প্রায় ৪৭টি জেলায়। সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসের তথ্যমতে সেদিন ৩১ জন এবং বিভিন্ন স্বাধীন ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে অন্তত ২৭ জন শহীদের তালিকা নিশ্চিত করা হয়। আহত হন দেড় সহস্রাধিক মানুষ। সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, যখন রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) প্রধান কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়, যার ফলে রাষ্ট্রীয় এই গণমাধ্যমের সম্প্রচার সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

গোটা দেশ যখন জ্বলছিল, ঠিক তখনই রাত ৯টার পর সরকার আকস্মিকভাবে দেশজুড়ে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়, যার ফলে পুরো বাংলাদেশ এক গভীর ব্ল্যাকআউটের কবলে পড়ে। এর আগে ১৭ জুলাই রাত থেকেই মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়েছিল। টানা পাঁচ দিন ব্রডব্যান্ড এবং আট দিন মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখার এই ঘটনাকে দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় তথ্যপ্রযুক্তিগত অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রথমদিকে মহাখালীর খাজা টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ডকে এর কারণ হিসেবে দেখানোর অপচেষ্টা হলেও পরবর্তীতে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) স্পষ্ট জানায়, সরকারি নির্দেশেই এই ব্ল্যাকআউট করা হয়েছিল। তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, বিটিআরসি এবং এনটিএমসির ভূমিকা নিয়ে এর ফলে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সেদিনই তড়িঘড়ি করে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংলাপে বসার আকুতি জানান। ওবায়দুল কাদেরও ঘোষণা দেন যে, চাকরিতে ৮০ শতাংশ মেধা ও ২০ শতাংশ কোটা রাখার সুপারিশ করবে সরকার। কিন্তু বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কেরা এই রক্তাক্ত প্রস্তাব ঘৃণাক্ষরে প্রত্যাখ্যান করেন। হাসনাত আবদুল্লাহ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘গুলি আর আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না।’ আরেক সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম হুংকার ছাড়েন, ‘শহীদের রক্তের ওপর কোনো সংলাপ হবে না।’

অন্যদিকে তৎকালীন ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদ যাত্রাবাড়ী পরিদর্শনে গিয়ে এই স্বতঃস্ফূর্ত জনজোয়ারকে জামায়াত-শিবির ও বিএনপির সহিংসতা বলে চালিয়ে দেওয়ার পুরোনো রাজনৈতিক অপকৌশল খাটানোর চেষ্টা করেন। রাতভর রক্তপাতের পর ১৯ জুলাই ভোরে রাজপথে নামে ২২৯ প্লাটুন বিজিবি। তবে ১৮ জুলাইয়ের সেই রক্ত ও আগুনের দাগ মুছে যায়নি। মুগ্ধ এবং ফাইয়াজের আত্মত্যাগ আন্দোলনকে এমন এক মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত একটি সফল ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতন নিশ্চিত করে। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বিটিআরসির স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে এবং নাগরিকদের ওপর নজরদারি ও ইন্টারনেট বন্ধের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সীমিত করতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইনে ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নেয়।


এ সম্পর্কিত আরো খবর