স্পোর্টস ডেস্ক
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে ফুটবলপ্রেমীরা উপহার পেয়েছেন একের পর এক রোমাঞ্চকর ও দারুণ সব মুহূর্ত। এবার বিশ্বশ্রেষ্ঠত্বের মুকুট নির্ধারণী মেগা ফাইনালে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ইউরোপীয় পরাশক্তি স্পেন এবং বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামের এই মহারণে ফুটবল বিশ্বের কোটি ভক্তের চোখ থাকবে মূলত স্পেনের নতুন সেনসেশন লামিনে ইয়ামাল ও আর্জেন্টিনার ফুটবল মহাতারকা লিওনেল মেসির পায়ের জাদুর দিকে। তবে মাঠের চরম উত্তেজনার মাঝে টুর্নামেন্টের ফাইনালে আরেকটি অদৃশ্য লড়াই গড়ে দিতে পারে শিরোপার মূল পার্থক্য। আর সেটি হলো দুই দলের অতন্দ্র প্রহরী—স্পেনের উনাই সিমন ও আর্জেন্টিনার এমিলিয়ানো মার্টিনেজের গোলপোস্টের পেছনের দ্বৈরথ।
উনাই সিমনের বিশ্বকাপ পারফরম্যান্স ও গোল্ডেন গ্লাভসের হাতছানি
চলতি টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই অন্যতম সেরা গোলকিপার হিসেবে বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছেন স্প্যানিশ গোলরক্ষক উনাই সিমন। আজ রাতের ফাইনালে স্পেন যদি শিরোপা জিততে পারে, তবে এই আসরের সেরা গোলকিপার হিসেবে তার হাতে ‘গোল্ডেন গ্লাভস’ ওঠা প্রায় নিশ্চিত। পুরো আসরজুড়েই স্পেনের রক্ষণভাগ ছিল এককথায় দুর্দান্ত ও দুর্ভেদ্য। নকআউট পর্বের কঠিন পথ পাড়ি দেওয়ার সময় শক্তিশালী বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে তারা টুর্নামেন্টের একমাত্র গোলটি হজম করেছে।
ফুটবল পরিসংখ্যান ও রেটিং বিষয়ক জনপ্রিয় ওয়েবসাইট সোফাস্কোর-এর খতিয়ান বলছে, বিশ্বকাপজুড়ে উনাই সিমনের গড় পারফরম্যান্স রেটিং ছিল ৭.০৪। গ্রুপ পর্বে কেপ ভার্দের বিপক্ষে তিনি পেয়েছেন ৭.১ রেটিং, সৌদি আরবের বিপক্ষে ৭.২ এবং শক্তিশালী উরুগুয়ের বিপক্ষে তার রেটিং ছিল ৭.৪। এরপর নকআউট পর্বের অগ্নিপরীক্ষায় অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে তার রেটিং ছিল ৬.৯, পর্তুগালের বিপক্ষে ৭.input এবং বেলজিয়ামের বিপক্ষে ৬.২। সেমিফাইনালে ফ্রান্সের গতিময় আক্রমণভাগের সামনে তার রেটিং ছিল ৭.০।
সিমন পুরো টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত ১০টি চমৎকার সেভ করেছেন, যা ফাইনালে হয়তো আরও বাড়বে। গ্রুপ পর্বে অবিশ্বাস্য রক্ষণের পর সিমন নকআউটের প্রতি ম্যাচে নিজেকে নতুন করে চিনিয়েছেন। পর্তুগাল ও ফ্রান্সের মতো ইউরোপিয়ান পরাশক্তির ফরোয়ার্ডদের একাধিক নিশ্চিত গোলের প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছেন তিনি। এবার স্পেনের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ম্যাচে পরীক্ষা দেবেন এই কিপার। স্পেনের আক্রমণভাগের কেউ হয়তো দৃশ্যমান নায়ক হতে পারেন, কিন্তু দলের বিশ্বজয়ের নেপথ্য নায়ক হিসেবে হাজির হতে পারেন কেবল সিমনই।
এমিলিয়ানো মার্টিনেজের বিশ্বকাপ পারফরম্যান্স ও সতর্কবার্তা
আর্জেন্টিনার গোলপোস্টের নিচে আলবিসেলেস্তেদের প্রধান আস্থার প্রতীক হিসেবে শুরু থেকেই ছিলেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। টুর্নামেন্টের সাত ম্যাচের সবগুলোতে স্কালোনির মূল একাদশে থেকে মাঠ কাঁপিয়েছেন তিনি। তবে সোফাস্কোর-এর পারফরম্যান্স রেটিংয়ের পরিসংখ্যান বলছে, এবারের আসরে উনাই সিমনের চেয়ে বেশ পিছিয়ে আছেন মার্টিনেজ। টুর্নামেন্টে তার সামগ্রিক গড় রেটিং মাত্র ৬.৬৬।
গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়ার বিপক্ষে তার রেটিং ছিল Lower-end ৬.৬, অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ৬.৮ ও জর্ডানের বিপক্ষে ৬.৬। এরপর হাইভোল্টেজ নকআউট পর্বে কেপ ভার্দের বিপক্ষে ৬.৭, মিশরের বিপক্ষে ৬.০, সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ৭.২ ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার পারফরম্যান্স রেটিং ছিল ৬.৭। গ্রুপ পর্বে আলবিসেলেস্তেদের রক্ষণভাগ দারুণ করায় সেভাবে কোনো বড় পরীক্ষায় পড়তে হয়নি মার্টিনেজকে। ফাইনালে ওঠার পথে তিনি মোট ৯টি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করেছেন।
তবে গ্রুপ পর্বে কেবল জর্ডানের কাছে ১টি গোল খেলেও নকআউট পর্বে মার্টিনেজ খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি। নকআউটের কঠিন ম্যাচগুলোতে সব মিলিয়ে ছয়বার গোল হজম করতে হয়েছে এই আর্জেন্টাইন কিপারকে। এমনকি তার কিছু অসতর্কতার কারণে আলবিসেলেস্তেরা টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যেতে যেতেও অবিশ্বাস্যভাবে টিকে গেছে। ফাইনালে মার্টিনেজকে পরাস্ত করতে শুরু থেকেই ব্যতিব্যস্ত থাকবে স্পেনের চতুর আক্রমণভাগ। তাই এই মহাগুরুত্বপূর্ণ সময়ে আর্জেন্টাইন গোলকিপার সর্বোচ্চ সতর্ক না থাকলে আলবিসেলেস্তেদের বড় বিপদের মুখোমুখি হতে হবে।
বিশ্বমঞ্চের ফাইনালের ফল নির্ধারণে কার ভূমিকা বড়?
মেগা ফাইনালে শিরোপার ভাগ্য নির্ধারণে মেসি ও ইয়ামাল হয়তো ফ্রন্টলাইনে থেকে বড় ভূমিকা রাখবেন। কিন্তু নিজ নিজ দেশের হয়ে প্রতিপক্ষের গোল করার সব প্রচেষ্টা রুখে দিয়ে দলের জয়ে সমান অবদান রাখতে হবে সিমন ও মার্টিনেজকেও। মাঠের লড়াইয়ের সমীকরণ বলছে, এই বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের রক্ষণভাগই যে টুর্নামেন্টের সেরা, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনা এই আসরে মোট সাতটি গোল হজম করলেও ডিফেন্সের ভুল শুধরে তাদের অবিশ্বাস্যভাবে ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোর অতীত অভিজ্ঞতা ফাইনালে মানসিকভাবে এগিয়ে রাখবে। তবে স্পেনের ক্ষুরধার আক্রমণভাগকে রুখতে হলে নিজের চেনা ছন্দের সেরা পারফরম্যান্সই দেখাতে হবে মার্টিনেজকে।
স্পেন নিজেদের ডিফেন্সে কঠোর শৃঙ্খলা ধরে রেখে পর্তুগাল, বেলজিয়াম ও ফ্রান্সের মতো পরাশক্তিদের বিপক্ষে গোল করে ম্যাচ জিতেছে। কিন্তু ফাইনালের মঞ্চে আর্জেন্টিনার বিশ্বসেরা আক্রমণভাগ নিয়ে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলকে গভীর দুশ্চিন্তায় থাকতে হচ্ছে। এজন্য স্প্যানিশ ডিফেন্সের ফাঁক গলে বল চলে এলে উনাই সিমনকে ট্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। মোদ্দাকথা, ২০২৬ বিশ্বকাপের শ্রেষ্ঠত্বের ফল নির্ধারণে দুই গোলকিপারই হতে চলেছেন ম্যাচের সবচেয়ে বড় ট্রাম্প।
আকাশজমিন / আরআর