এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, ‘চলতি বছরের মধ্যেই সর্বোচ্চ ১০টি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানো এবং নতুন গন্তব্যে সেবা চালু করা সম্ভব হবে। প্রাথমিকভাবে চারটি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও প্রয়োজন অনুযায়ী এ সংখ্যা বাড়তে পারে। পুরো লিজ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হবে। এ জন্য ইতিমধ্যে প্রায় ৪০টি আবেদন জমা পড়েছে।’
বিমানের এই লিজ কর্মসূচি ১৪টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ওই চুক্তির আওতায় উড়োজাহাজগুলো ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে সরবরাহ করা হবে। প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, ‘আন্তর্জাতিক নির্মাতাদের কাছ থেকে স্বল্প সময়ে নতুন উড়োজাহাজ পাওয়া কঠিন হওয়ায় মধ্যবর্তী সময়ের জন্য লিজই এখন সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প।’
এরই মধ্যে ছয় বছরের জন্য ‘ড্রাই লিজে’ (শুধু উড়োজাহাজ ভাড়া) তিনটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিমান। গত ১৫ জুলাই এ বিষয়ে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি উড়োজাহাজ সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সরবরাহ সম্ভব হলেও তা বিবেচনা করা হবে। দরপত্র বা প্রস্তাব জমার শেষ সময় আগামী ৯ আগস্ট। ড্রাই লিজের নিয়ম অনুযায়ী, উড়োজাহাজের ক্রু, রক্ষণাবেক্ষণ ও বীমার দায়িত্ব বিমানের নিজস্ব ব্যবস্থাপনাতেই থাকবে।
বর্তমানে বিমানের বহরে রয়েছে ১৯টি উড়োজাহাজ। এর মধ্যে রয়েছে চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর, ছয়টি বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার (চারটি ৭৮৭-৮ ও দুটি ৭৮৭-৯), চারটি বোয়িং ৭৩৭ এবং পাঁচটি ড্যাশ-৮ কিউ৪০০। আমেরিকান কম্পানি বোয়িংয়ের পাশাপাশি ভবিষ্যতে ইউরোপীয় নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের উড়োজাহাজও বহরে যুক্ত করার বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে। সম্প্রতি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, ‘বাংলাদেশের বোয়িং ও এয়ারবাস—দুই ধরনের উড়োজাহাজই প্রয়োজন।’
বিমানের পাশাপাশি বাংলাদেশের বেসরকারি এয়ারলাইনগুলোর বহরও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বেসরকারি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ২০২৭ সাল থেকে লিজের মাধ্যমে ২১টি বোয়িং ৭৩৭-৮ উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এ ছাড়া এয়ার অ্যাস্ট্রা ও নভোএয়ারও আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণে নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোর আগ্রাসী সম্প্রসারণের মুখে আন্তর্জাতিক যাত্রীবাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে বিমানের এই উদ্যোগ সময়োপযোগী। ১০টি উড়োজাহাজ যুক্ত হলে নতুন বোয়িং বহর হাতে পাওয়ার আগ পর্যন্ত বিমান তার বাজার ধরে রাখতে পারবে এবং বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক রুটে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য সুবিধা পাবে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস তাদের সেবার মান উন্নত করতে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। বৈশ্বিক এভিয়েশন বাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে নতুন নতুন প্রযুক্তির সংযোজন এবং দক্ষ জনবল গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং দূরপ্রাচ্যের লাভজনক রুটগুলোতে ফ্লাইটের সময়সূচি ঠিক রাখা এবং যাত্রীসেবার মান বৃদ্ধির জন্য নতুন উড়োজাহাজগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রুটেও যাত্রী চাহিদা মেটাতে বিমান তাদের ড্যাশ-৮ বহরকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করছে।
এভিয়েশন খাতের অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতায় বেসরকারি এয়ারলাইনগুলোর দ্রুত প্রবৃদ্ধি বিমানের জন্য যেমন একটি চ্যালেঞ্জ, তেমনি দেশের এভিয়েশন শিল্পের সামগ্রিক বিকাশের জন্য একটি ইতিবাচক দিক। সরকারি ও বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোর এই যৌথ বিকাশ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন এবং রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের যাতায়াতকে আরও সহজতর ও সাশ্রয়ী করবে। আন্তর্জাতিক এভিয়েশন নিরাপত্তার সব ধরনের কড়া নিয়মকানুন মেনে এই বহর সম্প্রসারণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতকে বৈশ্বিক মানদণ্ডে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে।