মেটলাইফ স্টেডিয়ামের চেনা মাঠে এক দশক আগে যে ট্র্যাজেডি লিখেছিলেন লিওনেল মেসি, ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে সেখানেই আরেকটি রূপকথার জন্ম দিতে চেয়েছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু মারিও কেম্পসের হাতে ট্রফি উঁচিয়ে দেওয়া অনুপ্রেরণা কিংবা টানা দুইবার বিশ্বজয়ের হাতছানি—কোনো কিছুই কাজে আসেনি আলবিসেলেস্তেদের। আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার হাত ধরে ট্রফি উন্মোচনের পর মাঠে যে নতুন স্পেনের উত্থান হলো, তার সামনে স্রেফ খড়কুটোর মতো উড়ে গেল আর্জেন্টিনার রক্ষণাত্মক কৌশল। অতিরিক্ত সময়ের ১-০ গোলের জয়ে দীর্ঘ ১৬ বছর পর ফুটবলের সোনালী ট্রফি পুনরুদ্ধার করল স্প্যানিশরা।
লুইস দে লা ফুয়েন্তের রণকৌশলের কাছে এদিন সম্পূর্ণ অসহায় ছিলেন লা লিগার চেনা আঙিনায় ক্যারিয়ারের সিংহভাগ কাটানো মেসি। পুরো ম্যাচ জুড়েই আর্জেন্টিনার অধিনায়ককে বোতলবন্দি করে রাখে স্পেনের রক্ষণভাগ। ৪-৪-২ ফরমেশনে খেলতে নামা আর্জেন্টিনার দুই আক্রমণভাগের তারকা মেসি ও হুলিয়ান আলভারেজ স্প্যানিশ ডিফেন্ডারদের কড়া পাহারায় পুরো ম্যাচেই ছিলেন নিষ্প্রাণ। গ্যালারিতে আকাশী-সাদা সমর্থকদের জয়জয়কার থাকলেও মাঠের নিয়ন্ত্রণ ছিল পুরোপুরি স্পেনের দখলে। রেকর্ড ৬৫ শতাংশ সময় বল নিজেদের পায়ে রেখে খেলেছে লা রোহারা। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, পুরো ১২০ মিনিটের ম্যাচে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ স্পেনের গোলপোস্ট লক্ষ্য করে একটি শটও নিতে পারেনি, যেখানে স্প্যানিশদের অন টার্গেট শট ছিল ১২টি।
নিজেদের চেনা ৪-২-৩-১ ফরমেশনে টিকিটাকা ফুটবলের পসরা সাজিয়েছিল স্পেন। ওয়ান-টাচ পাসের পশরা সাজিয়ে আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের ক্লান্ত করে তোলার কৌশল পুরোপুরি সফল হয়। যেখানে স্পেন একে অপরের মধ্যে ৭৬২টি পাস আদান-প্রদান করেছে, সেখানে আর্জেন্টিনার পাস ছিল মাত্র ৩৫৮টি। প্রথমার্ধেই দুটি দারুণ আক্রমণ চালায় স্পেন। খেলার পঞ্চম মিনিটে উইঙ্গার লামিন ইয়ামাল বক্সে ঢুকে দানি ওলমোকে পাস দেন, ওলমোর ফিরতি থ্রু থেকে ইয়ামাল বল পেলেও লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও এমিলিয়ানো মার্টিনেজের যৌথ প্রচেষ্টায় সে যাত্রা বেঁচে যায় আর্জেন্টিনা। ৩৯ মিনিটে এমেরিক লাপোর্তে, রদ্রি ও আলেক্স বায়েনার তৈরি করা আক্রমণ থেকে বল পান ফাবিয়ান রুইজ। তার পাস থেকে মিকেল ওইয়ারজাবালের নেওয়া বাঁ-পায়ের জোরালো শট শুয়ে পড়ে ঠেকান আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক।
প্রথমার্ধে মেসি মাত্র ১৫ বার বল স্পর্শ করতে পেরেছিলেন। তবে ২২ মিনিটে একটি সুযোগ তৈরি করেছিলেন তিনি, যখন বক্সে থাকা নিকোলাস গঞ্জালেজকে বল বাড়িয়েছিলেন, কিন্তু গঞ্জালেজ বল নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হন। অন্যদিকে, ১৯ বছর আগে মেসির কোলে চড়া সেই ইয়ামাল আজ ড্রিবলিং আর জাদুকরী ফুটবলে ভবিষ্যতের মেসির প্রতিচ্ছবি দেখিয়েছেন। ম্যাচে ৮৬ বার বল স্পর্শ করে আর্জেন্টিনার রক্ষণে ত্রাস সৃষ্টি করেন তিনি। প্রথমার্ধে পাউ কুবার্সি, পেড্রো পোরো ও লাপোর্তের গড়া রক্ষণদেয়াল ভাঙতে পারেনি আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে মার্ক কুকুরেয়া রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি ওভারল্যাপ করে বারবার লেফট উইংয়ে আক্রমণ জুগিয়েছেন।
দ্বিতীয়ার্ধেও একই ধারা বজায় থাকে। আর্জেন্টিনা আক্রমণ বাদ দিয়ে রক্ষণাত্মক কৌশলে মনোযোগ দিলেও স্পেনের আক্রমণ সামলাতে হিমশিম খায়। ৬৪ মিনিটে পেদ্রির পাস থেকে দানি ওলমোর জোরালো শট কর্নারের বিনিময়ে বাঁচান এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। ৭৭ মিনিটে পেদ্রির আরেকটি শট সরাসরি মার্টিনেজের হাতে জমা হয়। পরের মিনিটেই ইয়ামালের আক্রমণের পর ফিরতি বলে কুবার্সির শট আবারো কর্নার করে রক্ষা করেন আর্জেন্টাইন বাজপাখি।
ম্যাচের শেষ মুহূর্তে রোমাঞ্চ নাটকীয়তায় রূপ নেয়। ৯০+৩ মিনিটে একটি আলগা বল দখল করতে গিয়ে কুবার্সির সাথে ধাক্কা খান এনজো ফার্নান্দেজ। রেফারি তাকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড (লাল কার্ড) দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেন। এর আগে ম্যাচের শুরুতে অভিনয়ের জন্য একটি হলুদ কার্ড দেখেছিলেন তিনি। নির্ধারিত সময়ের শেষ মিনিটে (৯০+৬) ২৫ গজ দূর থেকে ইয়ামালের নেওয়া ফ্রি-কিক বাম দিকে ঝাপিয়ে পড়ে কর্নার করেন মার্টিনেজ।
১০ জনের আর্জেন্টিনার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে স্পেনের বদলি খেলোয়াড়দের অন্তর্ভুক্তিতে আক্রমণের ধার আরও বাড়ে। ওয়েরজাবালের জায়গায় ফেরান তোরেস, বায়েনার জায়গায় নিকো উইলিয়ামস ও ওলমোর জায়গায় মিকেল মেরিনো মাঠে নামেন। ৯৩ মিনিটে পেদ্রির পাস থেকে উইলিয়ামসের দুর্দান্ত ফ্লিক রুখে দেন মার্টিনেজ। ৯৬ মিনিটে উইলিয়ামস বল জালে জড়ালেও মেরিনো নিকোলাস ওটামেন্ডিকে ফাউল করায় গোলটি বাতিল হয়।
অবশেষে ১০৬ মিনিটে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ভাগ শুরুর মাত্র ৩৭ সেকেন্ডের মাথায় পোরোর ক্রস থেকে উইলিয়ামস বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ব্যাকপাস দেন ফেরান তোরেসকে। তোরেসের জোরালো শট আর্জেন্টিনার জাল কাঁপিয়ে দেয় (১-০)। ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে মেসির কর্নার থেকে জিওভানি সিমিওনের শট ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে গেলে আর্জেন্টিনার সমতায় ফেরার শেষ আশাটুকুও শেষ হয়ে যায়।
পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ ১১টি সেভ করেন, যা ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপের ফাইনালে যৌথভাবে সর্বোচ্চ সেভের রেকর্ড। অন্যদিকে ফাইনালে ৫টির বেশি সফল ড্রিবল করে ২০১৪ সালে মেসির গড়া রেকর্ডের পাশে নিজের নাম লেখালেন তরুণ সেনসেশন ইয়ামাল। আর এই তরুণদের হাত ধরেই শুরু হলো বিশ্ব ফুটবলে স্পেনের নতুন এক রূপকথা।