লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বমঞ্চে ট্রফি ধরে রাখার স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত অধরাই থেকে গেল। একপেশে এক ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের নতুন সূর্য উদয় করল স্পেন। অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের করা একমাত্র গোলে দীর্ঘ ১৬ বছর পর আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট পরল স্প্যানিশরা। রেফারির শেষ বাঁশি বাজার পর মাঠের ভেতর যখন লামিন ইয়ামাল, পেদ্রি ও পাউ কুবার্সিরা উল্লাসে মাতোয়ারা, তখন মাঠের অন্য প্রান্তে গভীর হতাশায় ভেঙে পড়েন লিওনেল মেসি, রদ্রিগো দে পল ও জিওভান্নি সিমিওনিরা। তবে স্পেনের একতরফা আক্রমণের এই ম্যাচটি যে ১২০ মিনিট পর্যন্ত গড়াতে পেরেছিল, তার মূল কারণ ছিলেন কেবল একজনই—এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্তিনেজ।
হাতে ভাঙা আঙুলের তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে এবারের বিশ্বকাপে খেলতে নেমেছিলেন আর্জেন্টিনার এই অতন্দ্র প্রহরী। পুরো টুর্নামেন্টে চোটের কারণে নিজের চেনা ছন্দে না থাকলেও, ফাইনালের মহামঞ্চে তিনি আরও একবার প্রমাণ করলেন কেন তাকে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক বলা হয়। স্পেনের একের পর এক বিষাক্ত ও অবিশ্বাস্য সব আক্রমণ রুখে দিয়ে দীর্ঘ সময় আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে টিকিয়ে রেখেছিলেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত ১১টি অবিশ্বাস্য সেভের পর ভাঙল তাঁর সেই দুর্ভেদ্য প্রাচীর। অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের বুলেট গতির শট আর্জেন্টিনার জাল কাঁপিয়ে দিলে জয়ের হাসি হাসে স্পেন, আর পুরো ম্যাচে বীরত্বপূর্ণ লড়াই করেও ট্র্যাজিক হিরো হয়ে মাঠ ছাড়তে হয় মার্তিনেজকে।
পুরুষদের ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে ফাইনালের মঞ্চে এর আগে সর্বোচ্চ ৯টি সেভের রেকর্ড ছিল। স্পেনের বিপক্ষে এই ম্যাচে ১১টি অনবদ্য সেভ করে সেই বহু পুরোনো রেকর্ড ভেঙে ইতিহাসের পাতায় নতুন করে নিজের নাম লিখলেন ৩৩ বছর বয়সী এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। দলের ব্যাক-টু-ব্যাক বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ না হলেও, তাঁর এই অতিমানবীয় পারফরম্যান্স ফুটবল ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ম্যাচের শুরু থেকেই স্প্যানিশ ফরোয়ার্ডদের প্রতিটি আক্রমণের সামনে একাই চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন দিবু মার্তিনেজ। নিকো উইলিয়ামস, লামিন ইয়ামাল, মার্ক কুকুরেয়া, পেদ্রি ও ফেরান তোরেসদের একের পর এক জোরালো প্রচেষ্টা একাই নসাৎ করে দেন তিনি। খেলার ৫মিনিটেই ইয়ামালের বিপজ্জনক শট ঠেকানোর পর ৩৯তম মিনিটে মিকেল ওইয়ারসাবালের নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট করে দেন মার্তিনেজ। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে আলেক্স বায়েনার শট এবং ৬৭ মিনিটে ইয়ামালের ক্রস থেকে ফেরান তোরেসের হেড অবিশ্বাস্য দক্ষতায় কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করেন তিনি। ৭৭ মিনিটে পেদ্রি ও ইয়ামালের ব্যাক-টু-ব্যাক দুটি শট প্রতিহত করার পর নির্ধারিত সময়ের শেষ মুহূর্তে (৯০+৬ মিনিটে) ইয়ামালের ২৫ গজ দূর থেকে নেওয়া চমৎকার ফ্রি-কিক ওপরে লাফিয়ে উগড়ে দেন এই আর্জেন্টাইন বাজপাখি। তবে ১০৬ মিনিটে তোরেসের করা শটটি আর রক্ষা করতে পারেননি।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালেও অবিশ্বাস্য কিছু সেভ করে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেছিলেন এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। এবারও ফাইনালের আগে সাহসের সঙ্গে জানিয়েছিলেন, আঙুলের চোটকে তিনি পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলতে দেবেন না। মাঠের লড়াইয়ে অক্ষরে অক্ষরে সেই প্রতিশ্রুতিরই প্রতিফলন দেখিয়েছেন তিনি। এক খেটে খাওয়া পরিবার থেকে উঠে আসা এই লড়াকু গোলরক্ষক শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত একাই টেনেছেন আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ। তবে ফুটবল বিধাতা এবার আর তাঁর সহায় হননি, ফলে রেকর্ড গড়েও ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজিক হিরো হয়েই অশ্রুসিক্ত চোখে মাঠ ছাড়তে হলো এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্তিনেজকে।