বিশ্বকাপ ফুটবলের মেগা ফাইনালে রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বজয়ের আনন্দে মেতে ওঠার কথা ছিল বিজয়ী দল স্পেনের। তবে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের আনন্দ উদযাপনের আবহ স্থায়ী হতে পারেনি খুব বেশি সময়। মাঠে ফুটবলারদের দক্ষতা প্রদর্শনের লড়াই শেষ হওয়ার পরপরই দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে তৈরি হয় অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনা, যা মুহূর্তের মধ্যেই গড়ায় হাতাহাতি ও মারামারির মতো চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে।
অভিযোগ উঠেছে, ট্রফি জয়ের উল্লাসের মাঝেই স্প্যানিশ মিডফিল্ডার রদ্রি, উঠতি তারকা গাভি এবং ডিফেন্ডার এরিক গার্সিয়াসহ একাধিক স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের ওপর আক্রমণাত্মকভাবে চড়াও হন আর্জেন্টিনার নাহুয়েল মলিনা ও লিয়ান্দ্রো পারেদেসরা। ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে এমন নজিরবিহীন ও অনভিপ্রেত অপ্রীতিকর ঘটনার সার্বিক সত্যতা যাচাই ও ব্যবস্থা নিতে আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ তদন্তে নামছে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা।
বিশ্বকাপের রোমাঞ্চকর ফাইনালে মাঠের লড়াইয়ে অবশ্য আর্জেন্টিনার ওপর শতভাগ আধিপত্য বিস্তার করেই খেলেছে স্পেন। পুরো ৯০ মিনিট এবং অতিরিক্ত সময়ে স্প্যানিশদের আক্রমণাত্মক ফুটবলের সামনে আর্জেন্টিনার ধারালো কোনো আক্রমণই দৃশ্যমান হয়নি। স্পেনের মুহুর্মুহু আক্রমণ সামাল দিতে গিয়ে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা পুরো ম্যাচজুড়েই ফাউল এবং অনাকাঙ্ক্ষিত কড়া ট্যাকলের কৌশল অবলম্বন করেন। তবে তাদের সেই আক্রমণাত্মক কৌশলও দিনশেষে কাজ দেয়নি। উল্টো ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রতিপক্ষকে বাজেভাবে ফাউল করে সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন আর্জেন্টিনার তারকা মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ।
ম্যাচ চলাকালীন এসব তীব্র উত্তেজনা ও অনভিপ্রেত ঘটনা মাঠের নির্ধারিত সীমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু রেফারি শেষ বাঁশি বাজানোর সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বজয়ী স্প্যানিশ দল যখন উন্মুক্ত মাঠে উল্লাসে মেতে ওঠে, ঠিক তখনই আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের ক্ষোভ ও আচরণ সব সীমা ছাড়িয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, খেলা শেষে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্য করে অশ্রাব্য ভাষায় স্লেজিং করতে থাকেন আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার নাহুয়েল মলিনা। স্পেনের অধিনায়ক রদ্রি এর প্রতিবাদ জানাতে এগিয়ে গেলে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। মলিনা হুট করেই মেজাজ হারিয়ে রদ্রিকে ধাক্কা মারেন, মাথায় ঠুকো দেন এবং একপর্যায়ে তার গায়ে হাত তোলেন।
অধিনায়ককে বাঁচাতে এবং পরিবেশ শান্ত করতে দ্রুত ছুটে আসেন স্প্যানিশ তরুণ গাভি ও এরিক গার্সিয়া। ঠিক সেই মুহূর্তেই তাসের ঘরের মতো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় সবকিছু। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় চরমভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেস। তিনি ক্ষোভের মাথায় প্রথমে এরিক গার্সিয়াকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেন।
এরপর প্রতিবাদ করা তরুণ গাভির গলা চেপে ধরে তাকে মাঠে আছড়ে ফেলেন পারেদেস। এখানেই ক্ষান্ত না হয়ে তিনি গাভির জার্সি টানাটানি করে একপর্যায়ে ছিঁড়ে ফেলেন। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের সমাপনীতে এমন চরম অশোভন ও সহিংস আচরণের কারণে রেফারি পারদেসকে তাৎক্ষণিকভাবে লাল কার্ড প্রদর্শন করেন।
শুধু খেলোয়াড়দের মধ্যেই এই রেষারেষি সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা ছড়িয়ে পড়ে টেকনিক্যাল এরিয়া ও ডাগআউটেও। আর্জেন্টিনার সহকারী কোচ রবার্তো আয়ালা স্পেনের তারকা মিডফিল্ডার দানি অলমোর মুখে চড় মারেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম স্কাই স্পোর্টস নিউজ জানিয়েছে, ফিফার ডিসিপ্লিনারি ও গর্ভনিং বডি ইতোমধ্যে ম্যাচ রেফারির অফিসিয়াল রিপোর্ট ও ভেতরের সমস্ত ক্যামেরা ফুটেজ গভীরভাবে খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এর পাশাপাশি বিশ্বফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থার কাছে স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আরও একটি গুরুতর অফিশিয়াল অভিযোগ জমা পড়েছে। স্পেনের ঐতিহাসিক ট্রফি গ্রহণের সময় বিশ্বজয়ী দলকে সম্মান না জানিয়ে পেছন ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের একটি বড় অংশ, যা সরাসরি অ্যাথলেটিসিজম ও স্পোর্টসম্যানশিপ বা ক্রীড়াসুলভ আচরণের পরিপন্থী।
ফিফা জানিয়েছে, মাঠের হাতাহাতি এবং পুরস্কার বিতরণী মঞ্চের অসংবেদনশীল আচরণ—উভয় ঘটনাই সমভাবে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হবে। তদন্তে দোষ প্রমাণিত হলে খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা বা বড় ধরনের আর্থিক জরিমানার মতো কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।