নিউ জার্সির ঐতিহাসিক মেটলাইফ স্টেডিয়ামে রোববার রাতে তখন বিজয়ের লাল-হলুদ উৎসবে মেতে উঠেছে স্প্যানিশরা। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর পরম আরাধ্য সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরে সতীর্থরা যখন নাচগানে উল্লাস করছেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই মাঠের অন্য প্রান্তে দেখা গেল এক সম্পূর্ণ বিপরীত ও আবেগঘন দৃশ্য। পরাজয়ের চরম ভার সহ্য করতে না পেরে মাথা নিচু করে নীরবে কাঁদছিলেন ফুটবলের মহাতারকা লিওনেল মেসি।
তবে শিরোপা জয়ের উন্মাদনায় মাতোয়ারা না হয়ে বিজয়ী স্প্যানিশ অধিনায়ক রদ্রি যা করলেন, তা বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। ট্রফি উদযাপনের চেয়ে প্রতিপক্ষের পরাজিত অধিনায়কের দিকে এগিয়ে গিয়ে তিনি প্রকাশ করলেন অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। স্পেনের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের রাতে রদ্রির মুখে কেবলই ঝরল আর্জেন্টিনা অধিনায়কের ভূয়সী প্রশংসা।
নিউ জার্সির ওই শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসের দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বসেরার তকমা নিজেদের করে নেয় স্পেন। ম্যাচটি শেষে মেগা টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতিস্বরূপ 'গোল্ডেন বল' নিজের ঝুলিতে পুরেন স্প্যানিশ মিডফিল্ডার রদ্রি। গোল্ডেন বল হাতে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে রদ্রি অকপটে স্বীকার করেন, ম্যাচ শুরুর আগে অধিনায়ক হিসেবে মেসির পাশাপাশি দাঁড়ানোর মুহূর্তটিই তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ও বিশেষ প্রাপ্তি।
ম্যানচেস্টার সিটির এই প্রভাবশালী তারকা বলেন, ‘সত্যি বলতে, অধিনায়কদের কিক অফের সময় বিশ্ব ফুটবলের এই অবিসংবাদিত মহাতারকার সঙ্গে এক ফ্রেমে ছবি তোলার সুযোগ পাওয়াটা আমার জন্য বিশাল বড় ব্যাপার। ফুটবলের সমৃদ্ধি ও সৌন্দর্যের জন্য লিওনেল মেসি যা অবদান রেখে গেছেন, তা নির্দিষ্ট কোনো ভাষায় প্রকাশ করা একেবারেই অসম্ভব।’
বিশ্বকাপ ফাইনালে রেফারির শেষ বাঁশি বাজার পর পরাজিত মেসির আবেগ ধরে রাখতে না পারার দৃশ্যটিও গভীরভাবে স্পর্শ করে গেছে বিজয়ী অধিনায়ককে। এ প্রসঙ্গে আবেগঘন কণ্ঠে রদ্রি যোগ করেন, ‘ম্যাচ শেষে আমি যখন তাকে কাঁদতে দেখলাম, আমার মনে হলো একজন বিশ্বমানের খেলোয়াড় হিসেবে এবং আর্জেন্টিনার ফুটবলের মানচিত্রকে উঁচুতে তুলে ধরতে তিনি যে অক্লান্ত পরিশ্রম ও অবদান রেখেছেন—সেটি উপলব্ধি করেই তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছিল। ফুটবলে তাঁর অভূতপূর্ব অর্জন এবং ফুটবলবিশ্বকে তিনি যা কিছু উপহার দিয়েছেন, তার জন্য আমার হৃদয়ে কেবলই তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা লালন করি।’
২০২৬ সালের এই আসরে স্পেনের প্রতিটি জয়ে রদ্রির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে ‘গোল্ডেন বল’ জয়ের মাধ্যমে নিজের ব্যক্তিগত প্রাপ্তির ঝুলিকে আরও সমৃদ্ধ করলেন ২৯ বছর বয়সী এই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার। উল্লেখ্য, এর আগে ইউরো ২০২৪-এর সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার এবং ২০২৩ সালে বিশ্বসেরা ফুটবলারের খেতাব 'ব্যালন ডি’অর' নিজের নামে করেছিলেন তিনি।
এই ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে আরও একটি অভাবনীয় বিশ্বরেকর্ডের জন্ম দিয়েছে স্প্যানিশ জাতীয় দল। আন্তর্জাতিক ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে টানা ৩৮ ম্যাচে অপরাজিত থাকার এক অনন্য নজির স্থাপন করে এই শিরোপা জয় নিশ্চিত করেছে তারা। এই দীর্ঘ সফল যাত্রায় স্প্যানিশরা ২০২৩ সালের নেশনস লিগ, ইউরো ২০২৪ এবং সর্বশেষ ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি ঘরে তোলে। এর মাঝখানে ২০২৫ সালের নেশনস লিগেও তারা রানার্স-আপ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল।
অন্যদিকে, শিরোপা হাতছাড়া হওয়ার পর নিজের চোখের জল সংবরণ করতে পারেননি আর্জেন্টিনার মহাতারকা মেসি। বিশ্বমঞ্চে ট্রফি রক্ষার শেষ লড়াইয়ে ব্যর্থ হয়ে তাঁর এভাবে ভেঙে পড়ার দৃশ্য মুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। স্পেনের বিশ্বজয়ের ঐতিহাসিক রাতের সমস্ত আলোকচ্ছটার মাঝেও পরাজিত মেসির অশ্রুসিক্ত মুখাবয়ব এবং রদ্রির এমন বিরল সম্মান প্রদর্শনই ফুটবল ভক্তদের হৃদয়ে দীর্ঘকাল দাগ কেটে থাকবে।