বহুল আলোচিত এলিট ফোর্স র্যা পিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যা ব) অবলুপ্তির আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই বিশেষায়িত বাহিনীর জায়গায় বাংলাদেশ পুলিশের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে ‘স্পেশাল রেসপন্স ফোর্সেস/ব্যাটালিয়ন’ (এসআরএফ/এসআরবি) নামের একটি সম্পূর্ণ নতুন কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই একটি নতুন খসড়া আইনের কাঠামোগত রূপরেখা প্রস্তুত করেছে। বিশ্বস্ত সূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এক উচ্চপর্যায়ের আন্তমন্ত্রণালয় ও অংশীজনদের বৈঠকে খসড়াটি চূড়ান্ত নীতিগত অনুমোদনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।
প্রস্তাবিত 'স্পেশাল রেসপন্স ফোর্সেস/ব্যাটালিয়ন আইন, ২০২৬' কার্যকর হওয়ার সাথে সাথে ১৯৭৯ সালের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে গঠিত পুরোনো র্যা ব বাহিনীটির আইনি অস্তিত্ব বিলুপ্ত হবে। নতুন এই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাটি সরাসরি বাংলাদেশ পুলিশের প্রশাসনিক ও কৌশলগত অধিক্ষেত্রের মধ্যে থেকে পরিচালিত হবে। আইন অনুযায়ী এর নেতৃত্বের দায়িত্বে থাকবেন বাংলাদেশ পুলিশের অন্যূন অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা, যিনি মহাপরিচালক হিসেবে পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ ও আদেশে কাজ পরিচালনা করবেন। বাহিনীর সব নথিপত্র, ব্যাংকিং হিসাব এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও কর্মরত সদস্যদের চাকরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবগঠিত সংস্থায় স্থানান্তরিত হবে।
নতুন সংস্থাকে আগের মতোই মাদক উদ্ধার, সাইবার অপরাধ, মানব পাচার রোধ, সন্ত্রাসবাদ দমন এবং বিনা পরোয়ানায় প্রবেশ, তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের মতো বিস্তৃত প্রশাসনিক ও বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে পুরোনো কাঠামোর বিচ্যুতি কাটাতে প্রস্তাবিত আইনে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতা ও জবাবদিহির বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি ও আলামত অনতিবিলম্বে স্থানীয় থানায় সোপর্দ করার বাধ্যবাধকতা এবং সাধারণ নাগরিকের অভিযোগ পর্যালোচনার জন্য উচ্চপর্যায়ের একটি স্বাধীন প্রতিকার কমিটি গঠন। এছাড়া হেফাজতে নিগ্রহ, ক্ষমতার অপব্যবহার বা আর্থিক দুর্নীতির ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির স্পষ্ট আইনি ভিত্তি রাখা হয়েছে।
আইনগত সংশোধন ও রূপান্তরের এই পুরো উদ্যোগ নিয়ে সিভিল সোসাইটি ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তীব্র মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, কেবল সাইনবোর্ড বা সংস্থার নাম পরিবর্তন করে কার্যকর সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়। অতীতের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রশাসনিক কাঠামোর মৌলিক সংস্কার না হলে পুরোনো প্রথা বহাল থেকে যাবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অপরাধমূলক মানসিকতা দূর করতে হলে প্রতিটি অপকর্মের জন্য দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যদিকে, অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, নামের পরিবর্তনের চেয়ে বাহিনীর সদস্যদের আচরণ ও মানসিকতার রূপান্তরই আসল চ্যালেঞ্জ। পুরোনো ক্ষমতা বহাল রেখে সংস্কার সফল করতে হলে আইনি সীমার মধ্যে থেকে নাগরিক অধিকার সুরক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়ার বিকল্প নেই।