উত্তরাঞ্চল প্রতিনিধি : / : 43
একসময়ের নির্মল বাতাস ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশের জন্য খ্যাত পরিবেশবান্ধব 'সবুজ নগরী' হিসেবে পরিচিত রাজশাহীতে বিগত এক বছরে বিলীন হয়ে গেছে প্রায় ২৩ হাজার গাছপালা। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সড়ক সম্প্রসারণ, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং একশ্রেণীর স্বার্থান্বেষী মহল কর্তৃক গাছ কাটার তাণ্ডবের কারণে আজ চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে এই পরিচ্ছন্ন শহরের সবুজ পরিবেশ। সাম্প্রতিক পরিবেশবাদী ও বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার তথ্যে দেখা গেছে, রাজশাহী মহানগরী এবং এর আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আঙিনা এবং আবাসিক এলাকাগুলো থেকে একের পর এক হাজার হাজার মেহগনি, নিম, দেবদারু ও বটগাছসহ নানা প্রজাতির ছায়াবৃক্ষ কেটে ফেলা হয়েছে। গাছ কাটার এই হিড়িক পরিবেশবিদ, জলবায়ু গবেষক ও সাধারণ নগরবাসীর মনে গভীর উদ্বেগ ও চরম ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
পরিবেশ সচেতন বিশিষ্টজনেরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, গত এক বছরে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় রাস্তা প্রশস্তকরণ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়নের অজুহাতে নির্বিচারে এসব গাছ কাটা পড়েছে। তবে পরিবেশ রক্ষা সংক্রান্ত সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত পরিমাণ বিকল্প নতুন চারা রোপণ না করে বা কাটা গাছের পরিবর্তে উপযুক্ত স্থান না রেখেই কাজ শেষ করা হচ্ছে। ফলে শহরের স্বাভাবিক উষ্ণতা হু হু করে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বর্ষা মৌসুমেও আগের মতো কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টিপাতের দেখা মিলছে না। পরিবেশবিদদের মতে, ছায়াবৃক্ষ হারিয়ে যাওয়ার কারণে রাজশাহীর প্রাণকেন্দ্র এখন ইট-পাথরের খাঁচায় পরিণত হচ্ছে এবং এর প্রভাবে গ্রীষ্মকালে তীব্র তাপপ্রবাহ রাজশাহী অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রচণ্ড অসহনীয় করে তুলছে।
স্থানীয় নগরবাসীর অভিযোগ, উন্নয়নকাজের নামে যেখানে পরিবেশের সামঞ্জস্য বজায় রাখা জরুরি, সেখানে কেবল গাছ কেটে ফেলাকেই একমাত্র সহজ উপায় হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে এবং সড়ক ভবনের আওতাধীন জায়গায় বহু প্রাচীন গাছ রাতের আঁধারে এবং অসাধু উপায়ে কেটে ফেলা হলেও তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর কোনো আইনি ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। এতে করে দিন দিন উৎসাহিত হচ্ছে গাছ খেকো চক্র।
হাজার হাজার গাছ বিলুপ্ত হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের প্রথম সারির শিকারে পরিণত হতে যাচ্ছে দেশের প্রথম সারির পরিচ্ছন্ন ও শান্ত এই নগরীটি। এর ফলে পরিবেশের ওপর সরাসরি মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে এবং বিলুপ্ত হচ্ছে নানা জাতের পাখি ও জলজ পশুপাখির প্রাকৃতিক আবাস্থল। রাজশাহীকে বাঁচাতে পরিবেশবাদী সংগঠন ও সাধারণ নাগরিকরা অনতিবিলম্বে নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ করার এবং এর বদলে প্রতিটি কাটা গাছের বিপরীতে ১০টি করে স্থায়ী বৃক্ষরোপণ নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন। সেই সাথে রাজশাহী শহরের সবুজ অস্তিত্ব পুনরুদ্ধারে সরকার, সিটি কর্পোরেশন ও নগরবাসীকে সমন্বিতভাবে একটি সর্বাত্মক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য আকুল আবেদন জানান তারা।