২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে দারুণ প্রতিরোধ গড়ে তোলে আফ্রিকার ছোট্ট দেশ কেপ ভার্দে। শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে হারলেও পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত পারফর্ম করে ফুটবলবিশ্বের নজর কাড়েন দলটির ৪০ বছর বয়সী অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনহা। তাঁর এই অবিশ্বাস্য লড়াকু মানসিকতায় মুগ্ধ হয়ে ভোজিনহার পরিবারের চার সদস্যের জন্য বিশ্বকাপ ফাইনালের বিনা মূল্যের টিকিটের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। শুধু তা-ই নয়, ম্যাচ শেষে এই গোলরক্ষককে নিজের ব্যবহৃত ঐতিহাসিক জার্সিটিও উপহার দেন তিনি।
আন্তর্জাতিক ফুটবলভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গোল ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোজিনহার পরিবারের চার সদস্য যেন ভিআইপি গ্যালারিতে বসে সরাসরি ফাইনাল ম্যাচ উপভোগ করতে পারেন, সে জন্য ব্যক্তিগত প্রতিনিধিদের বিশেষ নির্দেশ দিয়েছিলেন মেসি। যদিও ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে শেষ পর্যন্ত শিরোপা হাতছাড়া হয় আর্জেন্টিনার, তবে মেসির এমন অনন্য মানবিক আচরণ ও মহানুভবতায় দারুণ মুগ্ধ হন ভোজিনহা। ম্যাচ শেষে বিশ্বসেরা মহাতারকার সঙ্গে হওয়া ব্যক্তিগত কথোপকথনটি সারাজীবন হৃদয়ে আগলে রাখবেন বলে আবেগভরে জানান এই কেপ ভার্দিয়ান গোলরক্ষক।
স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ম্যাচের পর মেসির কাছে তাঁর ঐতিহ্যবাহী ১০ নম্বর জার্সিটি চেয়েছিলেন এই আফ্রিকান তারকা। ম্যাচ শেষে সংবাদমাধ্যমের সাথে আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার ও অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষ করে সোজা টানেলে গিয়ে ভোজিনহাকে দেয়া সেই কথা সরাসরি রাখেন মেসি।
প্রথমবার ফুটবল বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েই ঐতিহাসিক চমক দেখায় কেপ ভার্দে। গ্রুপ পর্বে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন ও উরুগুয়ের মতো চরম শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে অপরাজিত থেকে নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয় তারা। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে পোস্টের নিচে বীরত্বপূর্ণ নৈপুণ্য দেখান ভোজিনহা; করেন মোট ১৮টি চোখধাঁধানো সেভ। খ্যাতনামা ক্রীড়া পরিসংখ্যানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অপটার তথ্য মতে, বিশ্বকাপে ৪০ বা তার বেশি বয়সী প্রবীণ গোলরক্ষকদের মধ্যে একক আসরে সবচেয়ে বেশি সেভ করার রেকর্ডে তিনি বর্তমানে বিশ্ব ফুটবলে তৃতীয় স্থানে রয়েছেন। তাঁর সামনে কেবল অবস্থান করছেন ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি পিটার শিলটন (১৯৯০ বিশ্বকাপে ২৮টি) এবং ইতালির দিনো জফ (১৯৮২ বিশ্বকাপে ২৭টি)।
ম্যাচ শেষে মেসির সঙ্গে অবিস্মরণীয় সেই সাক্ষাতের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা জানিয়ে চিলির সংবাদমাধ্যম লা তেরসেরাকে ভোজিনহা বলেন, ‘ম্যাচের বাঁশি বাজার পর আমি সরাসরি মেসির কাছে যাই। সে আমাকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরে বলে, তুমি সত্যিই অসাধারণ খেলেছ। তোমার জন্য তোমার দেশের প্রতিটি মানুষের গর্ব করা উচিত। স্বয়ং লিওনেল মেসির মতো একজন জীবন্ত কিংবদন্তির মুখ থেকে নিজের সম্পর্কে এমন প্রসংসাসূচক কথা শোনা আমার জন্য এক অবিশ্বাস্য অনুভূতি।’
জার্সি উপহার পাওয়ার বিষয়ে তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমি তাঁকে অন্তর থেকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলি, তুমিই সর্বকালের সেরা। এরপর সম্মান জানিয়ে আমরা জার্সি বদল করতে পারি কি না জানতে চাই। তখন লিও মুচকি হেসে জানায়, মিডিয়া ইন্টারভিউ পর্ব শেষ করে ড্রেসিংরুমের টানেলে সে নিজে থেকেই আমাকে জার্সিটি দিয়ে আসবে এবং সে তাঁর কথা রেখেছে।’
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামিতে অনুষ্ঠিত শেষ বত্রিশের ওই হাইভোল্টেজ ম্যাচে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে চরম বিপদে ফেলেছিল কেপ ভার্দে। ম্যাচের ২৯ মিনিটে মেসির দুর্দান্ত গোলে আর্জেন্টিনা এগিয়ে গেলেও ৫৯ মিনিটে ডেরয় দুয়ার্তের গোলে সমতা ফেরায় তারা। নির্ধারিত সময় শেষে খেলা গড়ায় রোমাঞ্চকর অতিরিক্ত সময়ে। ৯২ মিনিটে লিসান্দ্রো মার্তিনেজ আর্জেন্টিনাকে আবারও এগিয়ে নিলেও ১০৩ মিনিটে সিদনি লোপেস কাবরালের দর্শনীয় গোল কেপ ভার্দেকে আবারও ২-২ সমতায় ফেরায়।
আর্জেন্টিনার একের পর এক নিশ্চিত আক্রমণের মুখে একাধিকবার মেসির দূরপাল্লার ও নিশ্চিত গোলমুখী শট ঠেকিয়ে দেন এই সাহসী গোলরক্ষক ভোজিনহা। তবে ম্যাচের ১১১ মিনিটে মেসির বুদ্ধিদীপ্ত কর্নার থেকে ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর শক্তিশালী হেড কেপ ভার্দের ডিফেন্ডার দিনিয় বর্জেসের গায়ে লেগে অপ্রত্যাশিতভাবে জালে জড়ালে ৩-২ ব্যবধানের কষ্টার্জিত জয় নিশ্চিত হয় ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ এক অবিশ্বাস্য সেভ না করলে ম্যাচটি নিশ্চিতভাবে টাইব্রেকারে গড়িয়ে যেতে পারত।