নিজস্ব প্রতিবেদক:
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ-সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে একের পর এক নতুন ভিডিও প্রকাশ্যে আসছে। সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে তাকে এক নারীর সঙ্গে একটি হোটেলের রিসেপশন, লবি, করিডর, লিফট ও সিঁড়িঘরে একসঙ্গে দেখা যায়। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নতুন করে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
এর আগে ব্যক্তিগত জীবনসংক্রান্ত একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে গাজী নজরুল ইসলামকে জামায়াত থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর থেকেই তাকে ঘিরে বিভিন্ন ভিডিও ও তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। সর্বশেষ প্রকাশিত ভিডিওটিও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে ভিডিওটির সত্যতা বা এটি কোন সময় ধারণ করা হয়েছে—সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গাজী নজরুল ইসলাম, আমিনুর রহমানসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলাটি করেন এমপির ব্যক্তিগত গাড়িচালক ওবায়দুর রহমান। মামলার পর আমিনুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মামলার অন্য আসামিরা হলেন মাসুম বিল্লাহ, মোতাসসিম বিল্লাহ ও রাকিবুল হাসান।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, গাজী নজরুল ইসলাম এক নারীর সঙ্গে একটি হোটেলে প্রবেশ করছেন। প্রবেশের সময় রিসেপশনে দায়িত্বরত ব্যক্তির সঙ্গে করমর্দন করার পর তারা ভেতরে যান। এরপর হোটেলের বিভিন্ন স্থানে তাদের একসঙ্গে দেখা যায়। ভিডিওটি প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
ঘটনার পর সাতক্ষীরার শ্যামনগর প্রেস ক্লাব চত্বরে ‘সর্বস্তরের ওলামায়ে কেরাম ও তৌহিদি জনতা’র ব্যানারে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বক্তারা গাজী নজরুল ইসলামের এমপি পদ থেকে পদত্যাগের দাবি জানান।
এদিকে, ওবায়দুর রহমানের বিভিন্ন অভিযোগও প্রকাশ্যে এসেছে। তার দাবি, মরিয়াম বেগমের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি গোপন রাখার জন্য মরিয়ামের বাবা মাসুম বিল্লাহকে ঠিকাদারি লাইসেন্স করে দিয়ে সরকারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। এমনকি ভবিষ্যতে আর্থিকভাবে লাভবান করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।
ওবায়দুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, টাকার আশায় মরিয়ামের পরিবারের পক্ষ থেকে ওই সম্পর্কে আপত্তি করা হয়নি। তিনি আরও দাবি করেন, পারিবারিক সূত্রে তার সঙ্গে মরিয়ামের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। একইভাবে গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গেও মরিয়ামের পরিবারের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে।
তার বক্তব্যে আরও উঠে আসে, সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হওয়ার কিছুদিন পর মাসুম বিল্লাহর নামে ‘মাসুম এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি প্রথম শ্রেণির ঠিকাদারি লাইসেন্স করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, মাসুম বিল্লাহর কাজ ছিল দরপত্র জমা দেওয়া, আর সরকারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিতেন গাজী নজরুল ইসলাম।
ওবায়দুর রহমান আরও দাবি করেন, মাসুম বিল্লাহ ঠিকাদারি কাজ সম্পর্কে তেমন অভিজ্ঞ ছিলেন না। পরে তাকে এসব দেখাশোনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি বলেন, খেজুরের ব্যবসা ছেড়ে দরপত্রের বিষয়গুলো দেখভাল করতে শুরু করেন। তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে সাতক্ষীরার দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে মোট পাঁচটি কাজের জন্য দরপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে একটি ছিল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) এবং বাকি চারটি ছিল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পের।
এছাড়া মরিয়ামকে জাতীয় সংসদে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন ওবায়দুর রহমান। তার ভাষ্য, মরিয়ামকে সংসদে চাকরি দেওয়ার কথা বলা হতো এবং তার বাবাকে বড় বড় সরকারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। এসব প্রতিশ্রুতি দিয়েই পুরো বিষয়টি পরিচালিত হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এদিকে ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা চললেও অভিযোগগুলোর বিষয়ে গাজী নজরুল ইসলামের পক্ষ থেকে নতুন কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রকাশ্যে আসা ভিডিও এবং বিভিন্ন অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা সিদ্ধান্ত এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
ভিডিও প্রকাশ, মামলা, গ্রেপ্তার এবং পাল্টাপাল্টি অভিযোগের ঘটনায় বিষয়টি এখন জনমনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা এবং সংশ্লিষ্টদের দায় নির্ধারণ হবে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই।