ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
‘ট্রফি চোর’ অপবাদ মাথায় নিয়ে শান্ত মেজাজে মাঠ ছাড়লেন নাকভি ২৩ বছরের খরা কাটল না আমেরিকার, ইউএস ওপেনের ট্রফি জভেরেভের হাতে পুরুষদের পর মেয়েরাও বর্জন করল নাকভিকে, দুবাইতে আবারও ট্রফি নাটক রাজধানীর বেসরকারি হাসপাতালে শিশু মৃত্যুর পর তুলকালাম বিশ্বের দূষিত বায়ুর তালিকায় শীর্ষে সিঙ্গাপুর সিটি,ঢাকা ষষ্ঠ আসিফ মাহমুদের আমলের সব নিয়োগ ও পদোন্নতির নথি এখন দুদকে পঞ্চগড়ে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ: আহত ১৫, ২ ঘণ্টা মহাসড়ক অবরুদ্ধ অল্পের জন্য বাঁচলেন আন্তর্জাতিক নেতারা ৩৬ ঘণ্টা পর নিহত বাংলাদেশি যুবকের মরদেহ ফেরত দিলো বিএসএফ শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ

চার দশক পর ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন

বাংলাদেশে গড়ে উঠছে প্রথম রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্র


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ২৮ জুলাই, ২০২৬ সময় : ১২:০৮ পিএম

প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় অতিক্রম করলেও মহাকাশ গবেষণা কিংবা বিশ্ব মহাকাশ অর্থনীতিতে এখন পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত কোনো সাফল্য দৃশ্যমান করতে পারেনি বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান (স্পারসো)। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত যেখানে মহাকাশ গবেষণা খাতে বৈশ্বিক মানচিত্রে বহুদূর এগিয়ে গেছে, সেখানে প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো বা অবকাঠামোর তীব্র অভাব, বৈজ্ঞানিক সংকট এবং গবেষণা কার্যক্রমে পিছিয়ে থাকায় বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে এ খাতে বিশেষ কিছু করতে পারেনি। দেশের মহাকাশ গবেষণার গতি এখনো অত্যন্ত মন্থর। তবে দীর্ঘ বিলম্বের পর প্রথমবারের মতো নিজস্ব রকেট ও স্যাটেলাইট উৎপাদন, আধুনিক রকেট উৎক্ষেপণকেন্দ্র এবং স্পেস ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক স্থাপনের বড় ধরনের যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে স্পারসো কর্তৃপক্ষ। এর অংশ হিসেবে রকেট উৎক্ষেপণকেন্দ্র ও স্পেস ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক নির্মাণের লক্ষ্যে একটি বিস্তৃত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকল্প পরিচালনা করা হচ্ছে, যা আগামী দুই মাসের মধ্যে স্পারসোর কাছে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে সংশ্লিষ্ট পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের। এই সমীক্ষা প্রতিবেদন পাওয়ার পর সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে দেশের প্রথম রকেট উৎক্ষেপণ স্টেশন ও স্পেস ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক নির্মাণের জন্য মূল স্থান।

স্পারসোর দায়িত্বশীল সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, দেশের প্রথম এই সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার জন্য দেশীয় অভিজ্ঞ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান—ডেভেলপমেন্ট ডিজাইন কনসালট্যান্টস লিমিটেডের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। পরিচালিত এই সমীক্ষায় মূলত তিনটি প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে। এগুলো হলো—রকেট উৎপাদন ও উৎক্ষেপণ কেন্দ্র স্থাপন, স্যাটেলাইট উৎপাদনশিল্প প্রতিষ্ঠা এবং অ্যাসেম্বলি, ইন্টিগ্রেশন অ্যান্ড টেস্ট ল্যাবরেটরি নির্মাণের পাশাপাশি একটি আধুনিক স্পেস ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক তৈরি করা। স্পারসোর মতে, মূলত এই অবকাঠামো বাস্তবায়নের মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদে নিজস্ব মহাকাশ সক্ষমতা অর্জন, বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন এবং বৈশ্বিক মহাকাশ বিজ্ঞানের দরবারে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার পাশাপাশি বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক মহাকাশ অর্থনীতিতে যুক্ত হওয়ার শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হবে।

স্পারসোর জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানীরা জানান, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার সামরিক ও বেসামরিক রকেট উৎক্ষেপণ করা হচ্ছে। যদি উৎক্ষেপণের প্রতি ইউনিটে গড়ে মাত্র এক লাখ ডলারও আয় করা যায়, তবে প্রতি হাজার রকেটের ক্ষেত্রে বিলিয়ন ডলার উপার্জনের এক বিরাট বাণিজ্যিক সম্ভাবনা উন্মোচিত হবে। সেদিক বিবেচনায় বাংলাদেশে একটি আন্তঃদেশীয় স্পেস পোর্ট বা রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্র নির্মাণ করা সম্ভব হলে দেশীয় চাহিদার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অন্যান্য দেশের রকেট উৎক্ষেপণ সেবা প্রদান করেও প্রতি বছর শত কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ আয় করা সম্ভব হবে।

এ বিষয়ে স্পারসোর সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ শরীফ জানান, চুক্তিবদ্ধ পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটির চলতি বছরের জুনের মধ্যে প্রকল্পের প্রাথমিক নকশাসহ পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা ছিল। তবে কাজটির সুনির্দিষ্ট সূক্ষ্মতার খাতিরে তারা চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিতে আরও দুই মাস অতিরিক্ত সময় চেয়ে নিয়েছে এবং বর্তমানে সেই প্রতিবেদন তৈরির কাজ পুরোদমে চলমান রয়েছে। মেট্রোরেল এবং আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো দেশের অন্যতম মেগা অবকাঠামো প্রকল্পে সফলভাবে কাজ করার সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে দায়িত্বপ্রাপ্ত এই প্রতিষ্ঠানের। যেহেতু মহাকাশ গবেষণার প্রযুক্তিগত খাতটি বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একেবারেই নতুন ও জটিল, তাই আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. আতিকুজ্জামানকে এই বিশেষ সমীক্ষা প্রকল্পে নেতৃত্বের দায়িত্বে রাখা হয়েছে।

জানা গেছে, এই সম্ভাব্যতার চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর রকেট উৎক্ষেপণ স্টেশনের জন্য ভৌগোলিক সুবিধার কারণে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের পটুয়াখালী জেলার মনোরম সমুদ্র উপকূলীয় এলাকাকে প্রাথমিকভাবে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিশেষায়িত স্যাটেলাইট কারখানার স্থান নির্ধারণের জন্য শরীয়তপুর ও গাজীপুরসহ দেশের বেশ কয়েকটি কৌশলগত স্থানে বিশেষ জরিপকাজ পরিচালিত হচ্ছে। সমন্বিত জরিপ পর্ব শেষ হলে স্পারসো চূড়ান্ত স্থান নির্বাচনের লক্ষ্যে বিকল্প কয়েকটি স্থান বেছে নিয়ে সরকারের কাছে জমা দেবে। পরবর্তীতে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে চূড়ান্ত স্থান অনুমোদন পাবে। সার্বিক বিবেচেনায় শরীয়তপুর, পটুয়াখালী, গাজীপুর ও খুলনার মতো বাণিজ্যিক ও ভৌগোলিক বেল্টগুলোকে সরকারের কাছে সুপারিশ করবে সংস্থাটি।

প্রযুক্তিগত ভৌগোলিক সুবিধা ব্যাখ্যা করে স্পারসোর কর্মকর্তারা জানান, পৃথিবীর পরাশক্তি রাশিয়া নিজেদের দেশে অত্যাধুনিক রকেট তৈরি করলেও উৎক্ষেপণের সামরিক ও অর্থনৈতিক সুবিধার্থে তাদের পার্শ্ববর্তী কাজাখস্তানে যেতে হয়। কারণ বিষুবরেখা বরাবরের ভৌগোলিক অবস্থান থেকে রকেট উৎক্ষেপণ করা হলে পৃথিবীর নিজস্ব ঘূর্ণন বেগের সুবিধা পাওয়া যায়, যা জ্বালানি খরচ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে আনে। একইভাবে ইউরোপ মহাদেশের অনেক দেশের প্রযুক্তি ও পর্যাপ্ত নিজস্ব উৎক্ষেপণ সুবিধা থাকার পরও তারা জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয় কমাতে ভারতের মাটি ব্যবহার করে রকেট পাঠায়, আর ফ্রান্স উৎক্ষেপণের জন্য চলে যায় আফ্রিকার মাটিতে। বাংলাদেশে এমন একটি আন্তর্জাতিক মানের রকেট উৎক্ষেপণ স্টেশন তৈরি হলে বৈশ্বিক অবস্থানগত কারণে অন্য দেশগুলো সহজেই বাংলাদেশের সুবিধা ব্যবহার করতে উন্মুখ হবে। কারণ বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে বিষুবরেখার অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় রকেট উৎক্ষেপণে প্রয়োজনীয় জ্বালানি খরচ অনেকাংশে হ্রাস পাবে। দক্ষিণ প্রান্তে সুবিশাল বঙ্গোপসাগরের উন্মুক্ত উপস্থিতি ভৌগোলিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা দেবে এবং পটুয়াখালী উৎক্ষেপণ বেল্ট হিসেবে দারুণ উপযোগী।

প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক অগ্রগতির বিষয়ে স্পারসোর সদস্য (প্রযুক্তি) ড. মো. মাহমুদুর রহমান জানান, মহাকাশ গবেষণায় নতুন গতি ফেরাতে রকেট উৎক্ষেপণের একটি বিস্তৃত প্রকল্প সম্প্রতি সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে চূড়ান্ত সবুজ সংকেত মিললে থমকে থাকা মহাকাশ খাতে আশার সঞ্চার হবে। এছাড়া স্থানভিত্তিক উচ্চ রেজল্যুশনের একটি নিজস্ব গ্রাউন্ড স্টেশন স্থাপনের কাজ বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, যার জন্য খুব শিগগিরই আন্তর্জাতিক প্রকিউরমেন্ট বা সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় যাওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা রুবেল কান্তি দে মহাকাশ খাতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে জানান, দেশীয় রকেট ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্যাটেলাইট প্রযুক্তির অবকাঠামোগত উন্নয়নে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। দেশের স্বার্থে মহাকাশ গবেষণার যুগোপযোগী মানোন্নয়নে এসব প্রস্তাবিত প্রকল্প গুরুত্বের সঙ্গে বাস্তবায়নের জোরালো আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। সরকারের কাছে পাঠানো এই মেগা তালিকার মধ্যে নিজস্ব রকেট উৎক্ষেপণ, সরাসরি উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট তৈরি এবং একটি বিশেষায়িত স্পেস ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক গড়ে তোলার মতো আধুনিক কর্মকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা বিশ্বের একটি সার্বভৌম দেশের আধুনিক মহাকাশ গবেষণা সংস্থা সাধারণত পরিচালনা করে থাকে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর