ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই: ড. আবদুল মঈন খান স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নেই: মীর শাহে আলম দুপুরের মধ্যেই বিদ্যুৎ পাচ্ছে বাংলাদেশ: কমবে লোডশেডিং এমপিও শিক্ষকদের নির্বাচন ভাগ্য নির্ধারণ করবে ইসি: মীর শাহে আলম সরকারি কেনাকাটায় পুকুরচুরি ঠেকাতে আসছে অভিন্ন একক দরতালিকা সাগর-রুনি হত্যার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ তারুণ্য না অভিজ্ঞতা: ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব চয়নে জটিল হিসাব-নিকাশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জের রিট খারিজ হাইকোর্টে ইন্দোনেশিয়ায় ২৪০ যাত্রী নিয়ে জাহাজ নিখোঁজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, আটক ২

বগুড়ায় ১৯ মাসে ৯৩ জনের এইচআইভি শনাক্ত, আক্রান্তদের বেশিরভাগই পুরুষ


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ২৮ জুলাই, ২০২৬ সময় : ৮:৩১ পিএম

বগুড়ায় এইচআইভি সংক্রমণের বর্তমান চিত্র জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছে। বিগত ১৯ মাসে ২ হাজার ১৬৪ জন ব্যক্তির নমুনা পরীক্ষা করে ৯৩ জনের শরীরে এইচআইভি ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, নারীর তুলনায় পুরুষের সংখ্যাই উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। একই সময়ের ব্যবধানে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আটজন মৃত্যুবরণ করেছেন, যার মধ্যে কেবল শেষ সাত মাসেই প্রাণ হারিয়েছেন তিনজন

শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালের এইচটিসি (এইচআইভি টেস্টিং অ্যান্ড কাউন্সেলিং) সেন্টারের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, গত ১৯ মাসে এখানে নমুনা পরীক্ষা করিয়েছেন ২ হাজার ১৬৪ জন রোগী। পরীক্ষা শেষে ৯৩ জন ব্যক্তির শরীরে এইচআইভি পজিটিভ ধরা পড়ে। এর মধ্যে পুরুষ ৮১ জন, নারী ১০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর সদস্য দুজন। শতাংশের হিসাবে মোট শনাক্ত রোগীর প্রায় ৮৭ শতাংশই পুরুষ প্রজাতিভুক্ত। শুধু বগুড়া জেলার বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন ৯২ জন। এছাড়া এই দীর্ঘ সময়ে সেন্টারে এইচআইভি রোগী সন্দেহে নাম নিবন্ধিত করেছেন মোট ৫৯৭ জন ব্যক্তি। চিকিৎসাসেবকদের ভাষ্য মতে, নতুন রোগী শনাক্তকরণের পাশাপাশি নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ ও চিকিৎসাগত তদারকির আওতায় আসা রোগীর সংখ্যাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এইচআইভি সংক্রমণের প্রধানতম কারণগুলোর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিয়ন্ত্রিত যৌন সম্পর্ক অন্যতম। বিশেষত পুরুষে পুরুষে যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে ছড়ানো সংক্রমণ নিয়ে চিকিৎসা মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি পেশাদার যৌনকর্মীদের মাধ্যমে আক্রান্ত হওয়া, অপরীক্ষিত বা অনিরাপদ রক্ত গ্রহণ করা এবং ব্যবহৃত ইনজেকশনের সুঁই বা সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তির মাঝে ভাগাভাগি করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ থেকে এইচআইভি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে

শজিমেক হাসপাতালের এইচটিসি সেন্টারে প্রত্যহ গড়ে প্রায় ১০ থেকে ১৫ জন নতুন মানুষ এইচআইভি পরীক্ষার তাগিদে নমুনা জমা দিয়ে থাকেন। পরীক্ষার ফলাফলে পজিটিভ এলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে তাত্ক্ষণিকভাবে বিশেষ কাউন্সেলিং সেবার আওতায় আনা হয়। তাঁদের আশ্বস্ত করে জানানো হয় যে, এইচআইভি পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য কোনো ব্যাধি না হলেও নিয়মিত চিকিৎসার মধ্যে থাকা এবং সময়মতো ওষুধ সেবনের মাধ্যমে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে রেখে স্বাভাবিক জীবন অতিবাহিত করা সম্ভব। এই কেন্দ্রে পরীক্ষা ও কাউন্সেলিংয়ের পাশাপাশি পজিটিভ আক্রান্তদের বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহের সুব্যবস্থা রয়েছে। রংপুর বিভাগের জেলাগুলো ছাড়াও বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে এইচআইভি পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য বগুড়ার শজিমেক হাসপাতাল, সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এইচটিসি সেন্টার সেবা প্রদান করে আসছে

চিকিৎসকদের পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, শনাক্তদের একটি বড় অংশই তরুণ এবং কর্মক্ষম গোষ্ঠীর সদস্য। অসচেতনতা ও অরক্ষিত দৈহিক সম্পর্কের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মাঝে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদারের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি কেন্দ্রটিতে এইচআইভি পরীক্ষা করাতে আসা এক দম্পতি জানান, ফলাফলে তাঁদের দুজনের শরীরেই এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। তবে চিকিৎসকদের তথ্য মতে, স্ত্রীর শরীরে ভাইরাসের তীব্রতা বেশি এবং স্বামীর শরীরে তুলনামূলক কম। আক্রান্তের খবর জানার পর পরিবারটি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। সামাজিকভাবে অবহেলার ভয়ে নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে চিকিৎসকদের নির্দেশিত পন্থায় নিয়মিত সেবার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান তাঁরা। আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি সামাজিক বৈষম্য দূর করার ওপরও জোর দেন এই দম্পতি

রোগীদের ক্ষেত্রে মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিংয়ের গুরুত্ব অত্যন্ত অপরিসীম। দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা নেওয়া ৫৫ বছর বয়সী এক এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি জানান, ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণায় তিনি নিজেকে অপরাধী মনে করতেন এবং আত্মহত্যার কথাও ভাবতেন। পরবর্তীতে এইচটিসি সেন্টারের ধারাবাহিক মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শের মাধ্যমে তিনি স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ফিরে এসেছেন

সেন্টারের কাউন্সেলর আব্দুস সালাম জানান, শনাক্ত হওয়ার পর অনেকে চরম হতাশায় ভেঙে পড়েন এবং সমাজ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেন। সঠিক মানসিক সমর্থন এবং নিয়মিত ওষুধ গ্রহণের দিকনির্দেশনা দিয়ে তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে ধরে রাখা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে ডা. মো. সুলতান ইবনে সাঈদ উল্লেখ করেন, অরক্ষিত যৌন সম্পর্ক ছাড়াও সংক্রমিত মায়ের গর্ভধারণ, সন্তান প্রসব অথবা স্তন্যপানের মাধ্যমে শিশু আক্রান্ত হতে পারে। সঠিক সুরক্ষামূলক পদ্ধতি ব্যবহার, একজন বিশ্বস্ত সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্ক সীমাবদ্ধ রাখা, নিরাপদ রক্ত গ্রহণ এবং চিকিৎসা পরামর্শ মানলে এই ভাইরাসের ঝুঁকি বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। সামাজিক কুসংস্কার দূর করে সময়মতো চিকিৎসার আওতায় আনলে এইচআইভি সংক্রমণ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ চিকিৎসকগণ


এ সম্পর্কিত আরো খবর