ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই: ড. আবদুল মঈন খান স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নেই: মীর শাহে আলম দুপুরের মধ্যেই বিদ্যুৎ পাচ্ছে বাংলাদেশ: কমবে লোডশেডিং এমপিও শিক্ষকদের নির্বাচন ভাগ্য নির্ধারণ করবে ইসি: মীর শাহে আলম সরকারি কেনাকাটায় পুকুরচুরি ঠেকাতে আসছে অভিন্ন একক দরতালিকা সাগর-রুনি হত্যার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ তারুণ্য না অভিজ্ঞতা: ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব চয়নে জটিল হিসাব-নিকাশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জের রিট খারিজ হাইকোর্টে ইন্দোনেশিয়ায় ২৪০ যাত্রী নিয়ে জাহাজ নিখোঁজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, আটক ২

ময়মনসিংহের শ্রমিকের হাটে প্রতিদিন জীবিকার লড়াই


  • আপলোড সময় : বুধবার ২৯ জুলাই, ২০২৬ সময় : ৩:৫৩ পিএম

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায় প্রতিদিন ভোরে বসে এক ব্যতিক্রমধর্মী হাট। এটি কোনো পণ্য বা পশুর বাজার নয়, বরং শ্রমের বাজার। এখানে শতাধিক দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, রাজমিস্ত্রি ও বিভিন্ন পেশার শ্রমজীবী মানুষ নিজেদের শ্রম বিক্রির আশায় জড়ো হন। দিনের শুরুতেই কাজ পাওয়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা এসব মানুষের জীবনের বাস্তবতা দেশের অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের কঠিন চিত্র তুলে ধরে।

প্রতিদিন সকাল ৭টার দিকে ত্রিশাল উপজেলা মহিলা কলেজ মোড়ে একে একে শ্রমিকরা এসে জড়ো হতে থাকেন। কারও হাতে কোদাল, কারও হাতে বেলচা, আবার কেউ খালি হাতেই অপেক্ষা করেন। সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত চলে শ্রমিক বাছাইয়ের এই প্রক্রিয়া। এ সময় বিভিন্ন ঠিকাদার, বাড়ির মালিক কিংবা শ্রমিক প্রয়োজন এমন ব্যক্তিরা এসে দরদাম করে প্রয়োজনীয় শ্রমিক নিয়ে যান। স্থানীয়দের কাছে এটি পরিচিত ‘শ্রমিকের হাট’ নামে।

একই ধরনের চিত্র দেখা যায় ময়মনসিংহ নগরীর চরপাড়া মোড়েও। ভোর থেকেই সেখানে কাজের আশায় অপেক্ষা করেন অসংখ্য দিনমজুর। ভাগ্য ভালো হলে কাজ জোটে, আর কাজ না মিললে হতাশ হয়ে খালি হাতেই বাড়ি ফিরতে হয়।

ত্রিশালের আমিরাবাড়ি এলাকার নির্মাণশ্রমিক মো. বাবুল মিয়া জানান, প্রতিদিনই তিনি কাজের আশায় এই হাটে আসেন। তবে প্রতিদিন কাজ পাওয়া যায় না। বর্তমানে সাধারণ শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে থাকলেও কাজের নিশ্চয়তা নেই। ফলে আয়ের বিষয়টি পুরোপুরি ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে।

শ্রমিকদের ভাষ্য, বর্ষা মৌসুমে নির্মাণকাজ কমে যাওয়ায় কাজের সুযোগও কমে যায়। অন্যদিকে ধান কাটা কিংবা বোরো মৌসুমে কৃষিশ্রমিকের চাহিদা বাড়লে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। তবে বছরের বেশির ভাগ সময়ই কাজের অনিশ্চয়তা তাদের পিছু ছাড়ে না।

দিনমজুরদের অনেকেই বলেন, তাদের আয় পুরোপুরি দৈনিক কাজের ওপর নির্ভরশীল। এক দিন কাজ না পেলে সেই দিনের খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ে। সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে অনেক সময় ধারদেনার আশ্রয় নিতে হয়।

শ্রমিক আবদুল কুদ্দুস বলেন, তাদের কোনো মাসিক বেতন নেই। যে দিন কাজ পাওয়া যায়, সে দিনই আয় হয় এবং সেই অর্থেই সংসার চলে। কাজ না থাকলে ধার করে পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে হয়।

আরেক শ্রমিক জসিম উদ্দিন জানান, প্রতিদিন সকালেই সবাই আশা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। যার ভাগ্যে কাজ জোটে, তিনি কর্মস্থলে চলে যান। আর যারা কাজ পান না, তাদের হতাশা নিয়েই বাড়ি ফিরতে হয়।

প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে ঠিকাদার, বাড়ির মালিক ও ব্যবসায়ীরা প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রমিক নিতে আসেন। কাজের ধরন ও দক্ষতার ভিত্তিতে মজুরি নির্ধারণ করা হয়। অভিজ্ঞ ও দক্ষ শ্রমিকদের পারিশ্রমিক তুলনামূলক বেশি হলেও সাধারণ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যেই দরদাম শেষ হয়।

শ্রমিক নিতে আসা ত্রিশাল পৌর এলাকার বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বাড়ির নির্মাণকাজের জন্য মাঝেমধ্যে এখান থেকে শ্রমিক নিয়ে যান। একই স্থানে অনেক শ্রমিক পাওয়া যায় বলে সময়ও বাঁচে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রমিক বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে।

স্থানীয় ঠিকাদার শাহীন মিয়া জানান, ভালো ও দক্ষ শ্রমিক পেতে হলে তুলনামূলক বেশি মজুরি দিতে হয়। তবে আগের তুলনায় বর্তমানে নির্মাণকাজ কিছুটা কমে যাওয়ায় শ্রমবাজারও মন্দাভাবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

এই শ্রমিকদের মধ্যে কারও বয়স ২০ বছর, আবার কেউ ৬০ বছরের কাছাকাছি। বয়সের ভার কিংবা শারীরিক কষ্ট কোনো কিছুই তাদের জীবনসংগ্রাম থামাতে পারেনি। পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানের লেখাপড়া, চিকিৎসা কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর জন্য প্রতিদিনই ভোরে এসে দাঁড়াতে হয় এই শ্রমের হাটে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের শ্রমিকের হাট দেশের অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে। এখানে কাজ করা অধিকাংশ মানুষের নেই স্থায়ী চাকরি, নির্দিষ্ট আয় কিংবা সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। ফলে প্রতিটি দিনই তাদের কাছে নতুন করে জীবিকার সংগ্রাম।

সকাল গড়িয়ে সূর্য ওপরে উঠতেই ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যায় শ্রমিকের এই হাট। যারা কাজ পান, তারা ছুটে যান নির্মাণস্থল, কৃষিজমি কিংবা মাটি কাটার কাজে। আর যাদের ভাগ্যে সেদিন কোনো কাজ জোটে না, তারা নীরবে বাড়ির পথে ফিরে যান। পরদিন আবার নতুন আশায়, নতুন প্রত্যাশা নিয়ে একই স্থানে দাঁড়ানোর অপেক্ষায় থাকেন তারা।


এ সম্পর্কিত আরো খবর