সিলেট ও মৌলভীবাজারের সীমান্ত ঘেঁষা অঞ্চলে বৈরী আবহাওয়া ও টানা বৃষ্টিপাত উপেক্ষা করেই রাজপথে নিজেদের শক্ত অবস্থান বজায় রেখেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ও সমর্থকেরা। পুলিশি বাধা, একের পর এক ব্যারিকেড ও প্রতিকূল আবহাওয়াকে তোয়াক্কা না করে হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলায় অবস্থিত দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্থান রশিদপুর গ্যাসক্ষেত্র এলাকার প্রধান রাস্তায় অবস্থান নেন তারা। তুমুল বৃষ্টির মধ্যে খোলা আকাশের নিচে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের এমন অবস্থানকে কেন্দ্র করে পুরো ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ও সংলগ্ন এলাকায় থমথমে রাজনৈতিক পরিবেশ এবং তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার পূর্বাপর তথ্য থেকে জানা যায়, আজ বুধবার (২৯ জুলাই) বিকেলে মৌলভীবাজার সার্কিট হাউস থেকে এনসিপির একটি সুসজ্জিত বহর হবিগঞ্জের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। বিকেলে সাড়ে ৪টা থেকে ৫টার দিকে রাজপথ ধরে অগ্রসর হওয়ার সময় শ্রীমঙ্গলের ঐতিহাসিক চা কন্যা ভাস্কর্যের সামনে পৌঁছালে বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য কাঁটাতার ও শক্তিশালী ব্যারিকেড দিয়ে পুরো রাস্তা অবরুদ্ধ করে ফেলে। এ সময় এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, কেন্দ্রীয় নেত্রী ডা. মাহমুদা জাহান মিতু, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, মুখ্য সমন্বায়ক নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহসহ অন্যান্য শীর্ষ নেতাকর্মী গাড়ি থেকে নেমে আসেন এবং রাস্তা আটকে দেওয়ার আইনি ভিত্তি জানতে চান।
পুলিশের এমন কঠোর ও বাধার অবস্থানের কারণে সেখানে এনসিপি নেতাদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দীর্ঘসময় তীব্র বাকবিতণ্ডা, তর্কাতর্কি ও ধস্তাধস্তি চলে। একপর্যায়ে শ্রীমঙ্গলে পুলিশের দেওয়া প্রথম ব্যারিকেড সফলভাবে ভেঙে ফেলে এনসিপির বিশাল গাড়িবহর হবিগঞ্জের অভিমুখে আবারও সামনের দিকে দ্রুত অগ্রসর হতে থাকে। তবে সামনে এগোতে এগোতে শ্রীমঙ্গল ও হবিগঞ্জের সীমানাবর্তী বাহুবল উপজেলার রশিদপুর গ্যাসক্ষেত্র এলাকায় পৌঁছালে সেখানে পুনরায় বাধা ও পরিস্থিতির মুখোমুখি হন তারা। একই সময়ে মুষলধারে প্রবল বৃষ্টি শুরু হলেও এনসিপির নেতাকর্মীরা পিছু না হেঁটে ওই স্থানেই রাস্তার ওপর বসে পড়ে নিজেদের সুদৃঢ় অবস্থান ঘোষণা করেন।
এই উদ্ভূত রাজনৈতিক সংঘাতের পেছনের প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গতকাল মঙ্গলবার হবিগঞ্জ জেলা শহরে এনসিপির একটি পূর্বনির্ধারিত পদযাত্রা ও সমাবেশ শেষ হওয়ার পর স্থানীয় বিএনপির অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে এনসিপির নেতৃবৃন্দের এক রক্তক্ষয়ী ও সহিংস সংঘর্ষ বেঁধে যায়। সংঘর্ষ চলাকালে ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। হামলায় এনসিপির অন্যতম প্রধান সংগঠক সারজিস আলমসহ বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতা গুরুতর আহত হন। এ ছাড়া এনসিপির গাড়িবহরে ব্যাপক হামলা চালিয়ে বেশ কয়েকটি ব্যক্তিগত ও দলীয় গাড়ি ভাঙচুর করা হয় বলে দলটির পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়।
হামলা, ভাঙচুর ও নেতাকর্মীদের ওপর আঘাতের প্রতিবাদে ঘটনার পরপরই মঙ্গলবার রাতে এনসিপির নীতি নির্ধারণী মহল থেকে আজ বুধবার হবিগঞ্জে এক বিশাল ও কঠোর প্রতিবাদ সমাবেশের নতুন কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে এনসিপির এই পাল্টা কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে একই দিনে হবিগঞ্জ জেলা যুবদলের পক্ষ থেকেও সমান্তরাল সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়। দুটি বিপরীতমুখী রাজনৈতিক শক্তির একই দিনে একই শহরে পাল্টা সমাবেশকে ঘিরে পুরো অঞ্চলে চরম আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও সহিংস সংঘাতের প্রবল আশঙ্কা দেখা দেয়।
উদ্ভূত এই সংঘাতময় ও উত্তপ্ত পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আজ হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে হবিগঞ্জ পৌর এলাকাজুড়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। জেলা প্রশাসনের এমন কড়াকড়ি ও সার্বিক বাধার মধ্যেই নিজেদের অধিকার ও কর্মসূচির প্রতি শক্ত অবস্থান বজায় রাখতে প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও বাহুবলের রশিদপুর গ্যাসক্ষেত্রের সামনের রাজপথে অবস্থান নিয়ে নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করে চলেছেন এনসিপির কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতৃত্ব ও বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী।