একটি খুন, একটি সিসিটিভি ফুটেজ—আর তার হাত ধরেই উন্মোচিত হলো চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক ভয়ংকর অধ্যায়ের জট। গত ১৩ জুন পাহাড়তলীতে খুন হন মাকসুদুল হক চৌধুরী। ঘটনার পরই তদন্তে নামে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ আর সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে একে একে বেরিয়ে আসতে থাকে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের নাম। গত ২২ জুলাই গ্রেপ্তার হন মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মো. মিঠু, যিনি এলাকায় পরিচিত 'ধামা ইলিয়াছ' নামে। কুখ্যাত সন্ত্রাসী রায়হানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এই সহযোগীর নামে খুন, অস্ত্র ও চাঁদাবাজিসহ মোট ২১টি মামলা রয়েছে।
গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হতেই চোরচক্র ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের জট খুলতে শুরু করে। ধামা ইলিয়াছের দেওয়া চাঞ্চল্যকর তথ্যেই বেরিয়ে আসে অস্ত্রাগারের মজুদ ও অন্যান্য সহযোগীদের অবস্থান। সেই সূত্রের ভিত্তিতে গত ২৯ জুলাই যশোরের ঝুমঝুমপুরে এক নাটকীয় অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযানে ধরা পড়েন চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয় তার সহযোগী আল ইসলাম আলিফ ওরফে তমাল, মো. শামীম ও মো. সাফায়েত হোসেনকে। এক খুনের তদন্ত দিয়ে শুরু হলেও এ নিয়ে গ্রেপ্তারের সংখ্যা দাঁড়ায় পাঁচে।
চট্টগ্রাম নগরী, ফটিকছড়ি ও রাঙ্গুনিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে যার নাম শুনলেই সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তো, সেই বহুল আলোচিত ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজিসহ ১৩টি গুরুতর মামলা রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, চট্টগ্রাম নগরী, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া অঞ্চলে সংঘটিত একাধিক হত্যাকাণ্ডেও তার প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতার তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
তবে অভিযানের চমক তখনও বাকি ছিল। গ্রেপ্তারকৃতদের দ্বিতীয় দফায় দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরে ফটিকছড়ির এক পরিত্যক্ত বাড়িতে নজরদারি বাড়ায় পুলিশ। আজ বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) ভোর সাড়ে ৩টায় উপজেলার কাঞ্চননগরের মানিকপুর গ্রামের ওই পরিত্যক্ত বাড়িতে বিশেষ অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি দেশীয় এলজি এবং বেশ কিছু দেশীয় মারাত্মক অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় অস্ত্র আইনে পৃথক একটি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, "সন্ত্রাস, অবৈধ অস্ত্র ও সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশের অবস্থান স্পষ্ট 'জিরো টলারেন্স'। অপরাধী যত শক্তিশালী বা প্রভাবশালীই হোক না কেন, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।" পলাতক অন্যান্য সহযোগীদের গ্রেপ্তার, অস্ত্রের মূল উৎস, অর্থায়নকারী ও পুরো চক্রের নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
একটি খুনের সিসিটিভি ফুটেজ থেকে শুরু হওয়া এই তদন্ত শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রাম কাঁপানো এক সন্ত্রাসী বাহিনীর গোপন অস্ত্রাগার ও নেটওয়ার্ক গুড়িয়ে দিয়েছে।